বাড়িগুলো ঘেঁষে মিনিট দুই তিন হাঁটার পর বাঁদিকে একটা গলিতে তাকে ঢুকতে হবে। স্কুলের পাঁচ ছ’জন ছেলে প্রায়ই এখানে তার জন্যে ওতপেতে থাকে। আজও তারা ছিল। দূর থেকে সে ওদের দেখতে পায়নি কেননা ওরা গলির ভিতরের দিকে দাঁড়িয়েছিল। গলির মুখে পৌঁছে ঘুরে ঢোকামাত্র ওরা তাকে ঘিরে ফেলে। পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করে। একজন সামনে এসে গুটিগুটি এমনভাবে চলতে শুরু করে যে তার পক্ষে দ্রুত কেন ধীরে হাঁটাও অসম্ভব হয়ে পড়ল। তার গৌরবর্ণ লম্বাটে মুখটা তখন ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে এল। সে জানে এখন পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যেতে গেলেই দুজন দুপাশে এসে তার দুটি হাত চেপে ধরবে। পিছন থেকে কেউ চুল টানবে, নয়তো জুতো দিয়ে তার গোড়ালিতে ঠোক্কর মারতে থাকবে, হাঁটু দিয়ে তার পাছায় ধাক্কা মারবে।
তাই সে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল না, কোনো প্রতিবাদও নয়। সে জানে কোনো রকমের বাধা দিলেই ওরা অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দেবে। মুখে নানারকম তীক্ষ্ন বিদঘুটে শব্দ করে রাস্তার লোকেদের দৃষ্টি তার দিকে ফিরিয়ে দেবে। এই ব্যাপারটিকেই সে সবথেকে ভয় পায়। কেউ তার দিকে তাকাক এটা সে কোনোমতেই চায় না।
চুপ করে মাথা নামিয়ে সে হাঁটার চেষ্টা করে। সামনের ছেলেটি আচমকা দাঁড়িয়ে পড়ে এক পা পিছিয়ে আসে। ফলে সে ছেলেটির পিঠের উপর পড়ামাত্র ছেলেটি তার পিছনে এসে ধাক্কা দেয়। দুজনের মাঝে সে চ্যাপটা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এরপর ওরা ঘেঁষাঘেঁষি করে তাকে ঘিরে এমনভাবে হাঁটতে থাকে যে রাস্তার লোকেরা কয়েকটি ছেলের একটি জটলা ছাড়া আর কিছু বুঝতে পারে না। সেইসময় তার চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ে। জামার হাতায় চোখ মুছে সে ওদের মাঝখানে থেকে প্রায় অদৃশ্য অবস্থায় হেঁটে যেতে থাকে। অন্যমনস্ক পথিকরা ওকে তখন দেখতেই পেল না। উপরে বারান্দায় দাঁড়ানো কেউ কেউ এই বিচিত্র শোভাযাত্রা দেখে হেসে ফেলে।
দুটি বড়ো রাস্তাকে সংযোগকরা গলিটা দৈর্ঘ্যে ছোটো। আবার চওড়া বড় রাস্তায় পড়ে ওরা তাকে প্রায় ঠেলতে ঠেলতে একটা মিষ্টির দোকানের সামনে এনে দাঁড় করাল। এখানে এই সময় গরম শিঙাড়া ভাজা হয়।
”গোণ তো রে আমরা কজন?”
”সাত। ওকে নিয়ে আট।”
”ওকে বাদ দিয়ে বল। …হাঁরে, দুটো করে শিঙাড়া আর একটা করে অমৃতি, মাথাপিছু এক টাকা হবে তো?”
দলনেতা সবথেকে লম্বা ছেলেটি তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। একজন দোকানিকে ইশারা করে শিঙাড়া দিতে বলল। দোকানি হাসছিল। সে এই ব্যাপারটায় অভ্যস্ত। এই ঘটনা বহুবার ঘটেছে।
”কিগো ছোটবাবু, বন্ধুদের খাওয়াবে না?” দোকানি একগাল হাসির মধ্যেই চোখ টিপল লম্বা ছেলেটিকে। এদের মধ্যে একজন ছাড়া সবাই তার দু ক্লাস নিচে পড়ে। বাকিজন তিন ক্লাস নিচে।
”আমার কাছে অত পয়সা নেই।”
এই প্রথম সে কথা বলল। ঈষৎ তীক্ষ্ন অথচ ভরাট স্বর। আড়ালে শুনলে মনে হবে বয়স্ক কেউ যেন বলল।
”পয়সা নেই কিরে! সেই সকালে ভাত খেয়ে স্কুলে এসেছি, খিদেতে নাড়িভুঁড়ি হজম হয়ে যাচ্ছে…নে নে দিতে বল। কতদিন খাওয়াসনি বলতো?”
”লাস্ট শনিবারের পর আজ, তাইতো রে ভোলা?”
”কিগো ছোটোবাবু, দোব?” দোকানি ফুঁ দিয়ে কাগজের ঠোঙার মুখ খুলে থালায় রাখা সদ্যভাজা শিঙাড়ার দিকে হাত বাড়াল।
”আমার কাছে আজ পয়সা নেই।” সে আবার বলল। ওর চোখে কাকুতি আর ভয়। চশমাপরা একটি ছেলে ওর কোমরের চর্বি ও চামড়া দু আঙুলে চিমটি দিয়ে টেনে ধরে নির্বিকারমুখে দাঁড়িয়ে রইল।
যন্ত্রণার একটা অস্ফুট শব্দ ছাড়া আর কিছু বেরলো না ওর মুখ থেকে। ও জানে যেকোনো প্রতিবাদ দ্বিগুণ অত্যাচারের কারণ হবে।
”কত পয়সা আছে তোর কাছে?” কথাটা বলেই লম্বা ছেলেটি ওর পিছনে দাঁড়িয়ে প্যান্টের দুই পকেটে দুটি হাত ভরে দিল। তার মুঠোয় উঠে এল কাগজে মোড়া হজমি, ইরেজারের টুকরো, গাওয়া ঘিয়ের হ্যান্ডবিল, বাসের টিকিট, লুডোর সবুজ ঘুঁটি আর কিছু খুচরো পয়সা।
”সুটকেসটা খুলে দ্যাখ না।”
একজন ওর হাত থেকে সুটকেসটা নিয়ে সেটা খুলল তোলা-হাঁটুর উপর রেখে। বইখাতা হাতড়ে সে কিছুই পেল না। হতাশ হয়ে সে ডালা বন্ধ করে ফিরিয়ে দেবার সময় সুটকেসটা দিয়ে ওর পেটে গোঁতা মারল। ব্যথা লাগলেও ওর মুখে সেটা প্রকাশ পেল না।
”তাহলে?”
ওরা বিরক্ত হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তখন একজন বলল, ”ওতো ধারে খাওয়াতে পারে।”
দোকানি কথাটা শুনে বলল, ”নাও না। ছোটবাবুতো কাল স্কুলে যাওয়ার সময়ই দিয়ে দেবে। তাইতো ছোটবাবু?”
”কিরে, কাল শোধ করে দিবি তো?”
”হাঁ।”
”আরে ওর বাবা বেশ মালদার। ডেকরেটিং ব্যবসা, অনেক টাকা আছে, নিজেদের বাড়ি, চাইলেই দিয়ে দেবে তাই না রে?”
”চল চল, ভেতরে বসে খাই। তুই খাবি?
”না।”
”মাথাপিছু তাহলে এক টাকা নয় দু’টাকা কেমন? দশ দিন আর তোকে আমরা কিচ্ছু বলব না। আর শোন, কেউ যদি তোর পেছনে লাগেটাগে তাহলে আমাদের বলে দিবি।”
”তুই খুব ভালো ছেলে, কোনো ভয় নেই, আমরা আছি। যা এবার…কালকেই টাকা দিয়ে দিবি মনে থাকবে তো?”
সবাই দোকানে ঢুকে গেল। ওর চোখ থেকে ভয়ের ছায়া মিলালো না। দোকানের ভিতরে একবার তাকিয়ে ধীরে ধীরে সে বাস স্টপে এসে দাঁড়াল।
কয়েকটা বাস চলে যাবার পর তাঁর গন্তব্যের বাসটি আসতেই সে হাত তুলল। আরও পাঁচ-ছ’জন বাসে ওঠার জন্য এগিয়ে গেল। ভিড় রয়েছে। ঠেলেঠুলে ভিড়ের মধ্যেই একহাতে সুটকেস অন্যহাতে রড ধরে বাসের উঁচু পাদানিতে সে পা পৌঁছে দিতে পারছিল না। বাস ছেড়ে দিচ্ছে তখন কে একজন তাকে জাপটে সিঁড়িতে তুলে দিয়ে নিজেও উঠে পড়ল। ভিড়ের চাপে প্রায় দমবন্ধ অবস্থায় সে মুখ তুলে তাকিয়ে দেখার সুযোগ পেল না কে এই উপকারটি করল।
