”ছুটছিল নাকি?”
”না না, ছুটবে কেন। ছোরা দেখিয়ে একটা ছিনতাই করে আবার গলির মধ্যেই আর একটা..কী সাহস ভাবুন তো, এই আধঘণ্টাও হয়নি, তার মধ্যেই দু-দুটো..হ্যাঁ হ্যাঁ এই ব্যাটাই…”
”আগের কেসটায় ছোরা মারেনি মশাই, যত বাজে গুজব…গলা থেকে হার ছিনিয়ে নিয়েছে।”
”পুলিশ তো তখন এসেছিল। আর এখন বাবুদের টিকিটির দেখা নেই।”
সন্দীপ ভিড় ঠেলে, পাশ কাটিয়ে অন্ধকারে এগোতে এগোতে এক জায়গায় থমকে পড়তে বাধ্য হল। সামনেই রাস্তার কিছুটা ফাঁকা, তারপর আবার ভিড়, বাঁদর খেলার সময় যেমনটি হয়। দু-তিনজনের হাতে হ্যারিকেন।
সবাই দেখছে এবং স্থানটুকু অতিক্রম করার সময় সে দেখল, বাড়ির দেয়াল ঘেঁষে উবুড় হয়ে থাকা একটি দেহ। সাদা পাঞ্জাবির একটা ফালি শরীরে দড়ির মতো জড়ানো। সবুজ লুঙ্গি নর্দমার কাছে পড়ে। হাতটা মুচড়ে পেটের নীচে, মুখ ফেরানো, চোখে সেই শূন্যতা যা একটু আগেই সে দেখে এল। মাথা থেকে কপাল বেয়ে নাকের কোল দিয়ে রাস্তায় পড়েছে রক্ত। এখনও বোধহয় চুঁইয়ে পড়ছে। মুখটা কুঁকড়ে রয়েছে। যন্ত্রণা পাচ্ছিল।
”কোনো চান্সই পায়নি লড়ার, ছোরাটা বার করবে কি…একসঙ্গে চারজন ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।”
”কারা পড়ল?”
”তা বলতে পারব না ভাই, যা অন্ধকার!”
”যার ছিনতাই করতে গেছল সে কোথায়?”
”কে জানে কোথায়…দরকার কি তার থাকার।”
বড় রাস্তা। মোটরের হেডলাইট, বাসের ভিতরের আলো, তাকে অসার অবস্থা থেকে ফিরিয়ে আনল। কয়েকটা দোকানে আলো জ্বলছে বিদ্যুতের, কিছু বাড়িতেও।
পাতাল রেলের জন্য রাস্তা ঘেরা লোহার জাল ঘেঁষে মেয়েটি একা দাঁড়িয়েছিল। তাকে দেখেই চোখ উজ্জ্বল হয়ে আবার স্তিমিত হল।
দাঁড়িয়ে কেন, গেল কোথায় তোমার লোক?”
”জানি না।”
”থাকো কোথায়?”
”শেয়ালদা।”
”চিনে যেতে পারবে?”
মাথা নাড়ল।
”কাছে পয়সা আছে?”
”না।”
”তোমাকে কিছু দেয়নি?”
”না, বলেছিল দশ টাকা দেবে।”
সন্দীপ দু টাকার একটা নোট এগিয়ে ধরল। মেয়েটি দ্বিধাভরে লোকটির দিকে তাকিয়ে অবশেষে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
”লজ্জা করে লাভ নেই। এখানেই দাঁড়াও শেয়ালদার দোতলা বাস পাবে।”
ওর হাত ধরে নোটটা তালুতে রেখে সে উলটো দিকে হাঁটতে শুরু করল।
কতক্ষণ ধরে সে হেঁটেছে তা খেয়ালে রাখেনি, কোনদিকে হাঁটছে তারও হুঁশ ছিল না। এক সময় যে লোডশেডিং এলাকা পেরিয়ে গেছে এটুকু বোধ ছিল। এক সময় তার মনে হল জায়গাটা তার চেনা। দোকান, বাড়ি, গাছ, সাইনবোর্ড, গাড়িবারান্দার নীচের বাসিন্দাদের কখনো কোনো এক সময় যেন দেখেছে। সম্ভবত স্কুলে পড়ার সময় যখন নানান রাস্তায় সে একা ঘুরে বেড়াত।
”আচ্ছা, তাহলে ওই কথাই রইল…পরশু। এখন আমি যাচ্ছি, দেরি হয়ে গেছে।”
. সে পিছন ফিরে দেখতে পেল পানুকে। চীনা পাঞ্জাবি রেস্তরাঁ থেকে এইমাত্র ওরা বেরিয়েছে। সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে হাসি, বিভু আর যে লোকটি, সেই সম্ভবত সুহাস। ওকে আর বিধ্বস্ত, অসহায় দেখাচ্ছে না। খাড়া দেহ, দুটি বসা গাল এবং ঝকঝকে চোখ ওকে আগের থেকেও যেন প্রখর করেছে। পানু ছুটে রাস্তা পার হল বাস ধরার জন্য। অফিস যাবে।
বিভুর কাঁধে রেখে সুহাস হাঁটছে। এককদম পিছনে হাসি। সুহাস হাত নেড়ে কিছু একটা বোঝাচ্ছে। বিভু মুখ তুলে শুনছে, দৃশ্যটি সন্দীপের বড় ভালো লাগল।
ছোটবাবু
ছোটবাবু – মতি নন্দী – উপন্যাস
এক
ঘটনাটা প্রায়ই ঘটে।
ছুটির প্রথম ঘণ্টার পরই স্কুল ফটক থেকে প্রথমে স্রোতের মতো একটা দল বেরিয়ে আসে প্রচণ্ড কলরব তুলে। এরা একেবারেই বাচ্চচা, নিচু ক্লাসের ছাত্র। এদের অনেকের জন্য বাড়ির লোকেরা, ঝি চাকর বা মায়েরা ফটকে অপেক্ষা করে। জলের প্লাস্টিকের বোতল, বইয়ের বাক্স বা ব্যাগ তাদের হাতে তুলে দিয়ে বাচ্চচারা বাড়ির দিকে রওনা হয় সমানে বকবক করতে করতে।
এরা বেরিয়ে যাবার পর দ্বিতীয় ঘণ্টা বাজে। এবার হইচই করে বেরিয়ে আসে আর একটু বড়ো আকারের ছেলেরা। এরা তর্ক করে উঁচু গলায়, কখনো হাতাহাতিও করে তর্কের মীমাংসা ঘটাতে। কেউ অশ্লীল গালি দেয়, কেউ চুপচাপ গম্ভীর হয়ে পথ চলে।
স্কুলের ঘণ্টা তৃতীয়বার বাজলে বেরিয়ে আসে উঁচু ক্লাসের দীর্ঘকায় ছাত্ররা। থুতনিতে হালকা দীর্ঘ রোম, গোঁফের অস্পষ্ট কালো রেখা। অনেকেরই হাতে ঘড়ি বা চোখে চশমা। বেশিরভাগই ট্রাউজার্স পরা। দু-তিনজনের ছোটো ছোটো দলে ভাগ হয়ে বা একলাই হাঁটে। যার বাড়ি দূরে সে বাস স্টপে দাঁড়িয়ে থাকে। কিশোরী বা তরুণীদের দেখলে এদের অনেকেই সামনে তাকিয়ে কাঠের মতো হয়ে যায়। কেউ কেউ বেপরোয়ার মতো তাকায়।
তৃতীয়ের পর আর কোনো ঘণ্টা বাজে না। আর কেউ বেরিয়ে আসে না শুধু একজন ছাড়া। সে ছোটো ছোটো দ্রুতপায়ে বইয়ের সুটকেসটি হাতে নিয়ে বাড়িগুলোর ধার ঘেঁষে, যেন কেউ তাকে না দেখতে পায় এমন একটা তাড়া-খাওয়া বেড়ালের মতো হেঁটে যাচ্ছে। অথচ রাস্তায় তখন খুব লোকজন থাকে না।
কপাল ও কানের উপর ঝুলে আছে কোঁকড়া চুল। ঘন ভ্রূর নিচে গোলাকার বড়ো বড়ো চোখদুটি দিয়ে কখনো ভয়ে কখনো কৌতূহলে ইতস্ততঃ তাকাচ্ছে। একসঙ্গে দু-তিনজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেই মন্থর হয়ে যাচ্ছে। সন্তর্পণে, নিশ্বাস চেপে, চোখ নামিয়ে তাদের পার হয়ে আবার দ্রুত হাঁটছে। জামার মধ্যে থলথলে চর্বির নড়াচড়া হাঁটার সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে উঠছে। ওর কাঁধ বুক পেট কোমর সমানভাবে বর্তুলাকার। বস্তুত ওর ঊর্ধ্বাঙ্গ অনেকটা কাপড়ে আচ্ছাদিত ঢোলকের মতো দেখাচ্ছে। সে ওদের দিকে না তাকিয়েই বুঝতে পারে সকলের চোখ তার দিকে। না তাকিয়েই বুঝতে পারে প্রতিটি চাহনিতে চাপা কৌতুক আর বিস্ময়।
