”ওর ধুতিটা খুলে দিন।”
”তাহলে চেঁচাবে।”
”তাহলে আপনার লুঙ্গিটা খুলুন, চটপট, খুলুন খুলুন।”
অবিশ্বাস্য দ্রুততায় ছোকরা নিজের কোমর থেকে বেল্ট খুলে প্যান্টটা গোড়ালি পর্যন্ত নামল হ্যাঁচকাটানে। ছোরাটা হাতছাড়া করেনি।
”খুলুন, লজ্জার কি আছে, প্রাণের থেকে কি লজ্জা বড়?”
ছোরাটা গুলোদার পেটের দিকে এগোল, কিন্তু হিংস্রভাবে নয়। ছোকরা রক্তপাত চায় না।
”মেয়েরা রয়েছে আর কিনা ওদের সামনেই…”
”জাঙ্গিয়া পরে আছি তো।”
দুটো পা থেকে প্যান্টটা ছাড়িয়ে ছোকরা এক টানে গুলোদার লুঙ্গিটা খুলে দিল। ওর পাঞ্জাবির দৈর্ঘ তাদের অস্বস্তি থেকে রক্ষা করল। সন্দীপের মনে হচ্ছে সে একটা হাসির ফিল্ম দেখছে। চরিত্রগুলো ঊনবিংশ শতাব্দীর কোনো প্রহসন থেকে সংগ্রহ করা। যুক্তি এবং পারম্পর্যের খেই সে পাচ্ছে না।
লুঙ্গিটা পরেই ছোকরা গেঞ্জিটা খুলে ফেলল। গুলোদাকে ইশারা করল পাঞ্জাবিটা খুলতে, তারপর মেঝে থেকে প্যান্ট তুলে পকেটে হাত ঢোকাল এবং একটা সোনার হার বার করল।
”প্যান্টটা পরে নিন গুলোদা।”
সন্দীপ মৃদু স্বরে বলল। ছোকরা তখন রত্নার মুখের দিকে তাকিয়ে। আস্তে আস্তে চোখটা সরু হয়ে এল। দ্রুত চিন্তা করছে। সকলের চোখ ওর মুখে চিন্তার ধরনটা আন্দাজ করতে।
”আপনাদের কারুর কোনো ক্ষতি করব না। আমি এখান থেকে বেরিয়ে যাব ওরা আসার আগেই। একা বেরোব না, দিদি আমার সঙ্গে যাবে।”
”এই ছোরা, হার এসব সঙ্গে নিয়ে বেরোবে? তারপর রাস্তায় যদি ধরে আর এগুলো যদি সঙ্গে পায়..কী হবে জান?”
সন্দীপ কথা শেষে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল। সমস্যার গুরুত্ব বোঝানোই তার উদ্দেশ্য।
পাঞ্জাবিটা পরতে পরতে ছোকরা বলল, ”সেজন্যই তো উনি যাবেন। হারটা ব্যাগে রাখুন, ছোরাটা আমার কাছে থাকবে। বড় রাস্তা পর্যন্ত শুধু উনি আমার সঙ্গে যাবেন। নিন ব্যাগে রাখুন এটা। কেউ চেঁচাবেন না, বাড়ির বাইরে যাবেন না, তাহলে কিন্তু শেষ করে দোব।”
”কী ভাবে?”
বেঁটে লোকটি এইবার তার নীরবতা ভাঙল বিস্ময় চেপে রাখতে না পেরে।
”দেখবেন কী ভাবে করি।”
পাঞ্জাবি তুলে ছোরাটা লুঙ্গিতে গুঁজল। ওর স্বরে অনিশ্চয়তা। ছোরাটা হাতছাড়া করতে চায় না কেননা ওটা বাদ দিলে ওর কোনো অস্তিত্বই থাকে না। কিন্তু সত্যিই যদি পথে ওদের ধরে? রত্নার কী হবে? সে উদ্বিগ্ন হয়ে তাকাল। কিন্তু রত্না অনুত্তেজিত ধীরভাবে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ”চলো।”
”আমরা তাহলে কখন বেরোব?”
বেঁটে লোকটি ফিসফিস করল মেয়েটির ঘাড়ের উপর দিয়ে ঝুঁকে। ভয় থেকে বেরিয়ে এসেছে এতক্ষণে।
রত্নাই সদরের দিকে প্রথমে এগিয়ে গেল। ছোকরা ইতস্তত করে অনুসরণ করল।
”দরজাটা বন্ধ করে আসবেন না?”
বেঁটে লোকটি বলল গুলোদাকে। খালি গায়ে কালো প্যান্টে ওকে বিমর্ষ দেখাচ্ছে। হয়তো জীবনে প্রথম প্যান্ট পরল।
”না খোলা থাক।”
”গুণ্ডাটা পালাতে পারবে তো? দেরি হলে খুব মুশকিলে পড়ে যাব। অনেক দূর যেতে হবে।”
কেউ জবাব দিল না ওর কথায়। গেঞ্জিটা কুড়িয়ে গুলোদা ভিতরে চলে গেল। মেয়েটি একইভাবে বসে, কুঁজো হয়ে মেঝের দিকে তাকিয়ে। ঘাড়ের কাছে শিরদাঁড়ার গাঁট ফুলে উঠেছে, আঙুলের নখের, মধ্যে ময়লা, চটিতে কাদামাখা।
”এবার তো আমরা বেরোতে পারি।”
”হ্যাঁ, যান আপনারা।”
বেঁটে লোকটি উঠে দাঁড়ানো মাত্রই দূর থেকে প্রচণ্ড একটা হল্লা মতো ফেটে দেওয়াল ভেদ করে ঘরে ঢুকল।
”কী হল, য়্যাঁ কি হল…ধরা পড়ল নাকি?”
আশপাশের বাড়ি থেকে লোক বেরোনর আওয়াজ ওরা শুনতে পাচ্ছে। সন্দীপ জানলাটা খুলে দাঁড়াল।
”পেয়েছে, ব্যাটাকে পেয়েছে।”
”মার মার, একেবারে মেরে ফেলে দে…কোনো মায়াদয়া নয়, ব্যাটা গুণ্ডা ডাকাত…”
”অ শিবু যাসনি রে…”
”কী হল কী? ধরেছে নাকি?”
সন্দীপ জানলার গরাদ ধরে দাঁড়িয়ে। ঠিক এইরকম একটা অবস্থা তার শরীরে হয়েছিল সেদিন কুকুরগুলোকে এড়িয়ে আসতে দেখে। বাইরের অন্ধকার চুঁইয়ে চুঁইয়ে তার ভিতরে ঢুকছে। ভ্যাপসা বাসি গন্ধ।
”আমি যাচ্ছি।”
”মুখ ফিরিয়ে সে দেখল বেঁটে লোকটি গুলোদাকে পাশ কাটিয়ে প্রায় দৌড়েই সদরের দিকে চলে গেল।
মেয়েটি উঠে দাঁড়িয়েছে। দিশাহারার মতো তাদের দুজনের দিকে তাকিয়ে রোয়াকে এসে দাঁড়াল। ওর নিষ্প্রাণ চোখে ভয় ফুটে উঠেছে।
”মনে হচ্ছে ধরেছে?”
”আমারও তাই মনে হচ্ছে।”
”সঙ্গের ওনার কী হল, সেটা তো…”
”দেখি। ভালোই করেছেন প্যান্টটা ছেড়ে এসে। কাল প্রণবেশের কাছে যেতে পারি। এখন আপনি বাড়িতেই থাকুন।”
পা বাড়াবার আগে সে দেয়ালের ছবিটা এবং ইজিচেয়ারে বৃদ্ধের দিকে তাকাল। চোখের পাতা খোলা। নির্নিমেষে তার দিকেই চেয়ে রয়েছে। চাউনিতে শূন্যতা। মনে হল অনেকক্ষণ ধরেই তাকিয়ে। তার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।
গলিটা সরু থেকে ক্রমশ চওড়া হচ্ছে আর লোকের সংখ্যাও বাড়ছে। ছাদে, জানলায়, বারান্দায় আবছা বোঝা যায় মাথাগুলো। উত্তেজিত কথা, জটলা কিছুই তার মনে কৌতূহল জাগাচ্ছে না। সব থেকে বড় কথা সে নিজে ব্যস্ত নয়।
রত্না অবশেষে একজনের উপর শোধ নিতে পেরেছে। তার কোনো সন্দেহ নেই, কিছু একটা ও করেছে। শান্ত স্থির পায়ে যখন ও সদরের দিকে যাচ্ছিল তখনই তার মনে হয়েছিল, কিছু একটা ঘটবে।
”আরে সেই মহিলা চেঁচিয়ে উঠলেন বলেই তো ওরা ধরল।”
