”আচ্ছা ভীতু তো মশাই, বাড়ি যান বাড়ি যান।…মলয় ক্লাব থেকে লাঠি নিয়ে আয় সব বাড়ি সার্চ করব, তুই আর অশোক এখানে দাঁড়াবি, জটা, নরু আর কানাইকে খবর দিবি, ওরা জগদ্ধাত্রী ভাণ্ডারের সামনে আড্ডা দিচ্ছে। শালাকে পেলে হয় একবার।”
পাথরের চোখ নিয়ে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে দুজন দাঁড়িয়ে। হতবুদ্ধিকর পরিস্থিতি আবার একটা এসেছে। ওরা সব বাড়ি সার্চ করবে, এ বাড়িতেও ঢুকবে। অবশ্য তাদের দেখে নিশ্চয় ভাববে না ছুরি নিয়ে কোনো কাজ তারা করতে পারে, তবুও।
”আবার কী অবস্থায় পড়া গেল।”
”তুমিই তো এখানে আমাকে আনলে।”
”হ্যাঁ এনেছি তাতে কী হয়েছে?”
”চেঁচিও না জন্তুর মতো।”
”সে একটা কুৎসিত শব্দ উচ্চচারণ করতে গিয়ে থেমে গেল। ”জন্তু’ শব্দটা তাকে ফিরিয়ে দেবার জন্য যেন ও উপেক্ষা করছিল। রত্নার মুখে প্রত্যয়ের ছাপ। কিছু একটা সাফল্য যেন পেয়েছে।
”এখানে ততক্ষণ বসুন, একদম বেরোবার চেষ্টা এখন করবেন না।”
ওরা ফিরে তাকাল। বাতি হাতে গুলোদা, তার পিছনে একটি লোক। বেঁটে, অবিন্যস্ত ঝাঁকড়া চুল, অসম্ভব ফর্সা, গাল দুটি শিশুদের মতো ফোলা, আতঙ্কে ভরে আছে মোটা ফ্রেমের চশমার কাচ। বুশশার্টের বোতাম পরানোর সময় হয়নি অথবা ভুলে গেছে। ঘন কালো লোমে বুক ভরা ।
লোকটির পিছনেই একটি মেয়ে। হাত এবং পা রুগণ, বুক সমতল। রঙিন ময়লা ফ্রকটা লোলচর্মের মতো ঝুলছে হাঁটু ছাড়িয়ে। দেহের চামড়া অপুষ্টিতে পাণ্ডুর, খসখসে। মাংসহীন চোয়াল, চোখে নিস্তেজ ঘোলাটে চাহনি। দোকানে উলটে রাখা পাঁঠার মাথায় এমন চোখ দেখা যায়। লম্বা সরু কাঠামোটা সামান্য ঝোঁকানো।
”আপনারা এদের সঙ্গে বসুন। জিজ্ঞেস করে যদি বলবেন বন্ধুর বাড়িতে এসেছি। আর আপনারা।” গুলোদা রত্না ও সন্দীপকে উদ্দেশ্য করে বলল, ”বলবেন স্বামী-স্ত্রী আর এটি আপনার শালী। ঘাবড়াবেন না, কোনো ভয় নেই। বাইরে এখন ভিড়ভাট্টা, নতুন লোক দেখলেই মুখের দিকে তাকাচ্ছে তাই, ব্যাপারটা বুঝতেই তো পারছেন, এখন আর বার করছি না আপনাদের। টের পেলে বদনাম হয়ে যাবে বাড়ির। আমি সদরে যাচ্ছি।”
”একটা সিগারেট হবে?”
”দিচ্ছি, জামার বোতাম দিন।”
গুলোদা বেঁটে লোকটিকে সিগারেট দিয়ে মোমবাতিটা তুলে এনে ধরিয়ে দিতেই লোকটি জোরে জোরে টানতে থাকল।
বেঞ্চে সন্দীপের পাশে ওরা দুজন বসেছে। কথা বলার মতো মনের অবস্থা কারুরই নেই। জানলা দিয়ে উত্তেজিত কণ্ঠস্বরে আক্রোশ, দর্প, হুমকি এবং চলাফেরার শব্দ আসছে। মানুষ শিকারে ওরা বেরিয়েছে। ওদের সংখ্যাটা যেন বাড়ছে।
সন্দীপ গুলোদার দিকে তাকিয়েছিল। নতুন একটা মোমবাতি কুলুঙ্গি থেকে বার করে ধরিয়ে বসিয়ে দিচ্ছে।
”ছেলেটা কোচিংয়ে পড়তে গেছে। নইলে এইসব হুজ্জতে জড়িয়ে পড়ত।”
গুলোদাকে বাতি হাতে সদরের দিকে যেতে যেতে থমকে এবং একপা পিছু হটতে দেখে সন্দীপ সিধে হয়ে বসল। কিছু একটা হয়েছে নইলে চোয়ালটা অত ঝুলে যাবে কেন! রোমহর্ষক কোনো দৃশ্যে যেন ওর চোখ আটকে গেছে।
বেড়ালের মতো লাফ দিয়ে উঠোন থেকে একজন রোয়াকে উঠল। কালো প্যান্ট, খয়েরি গেঞ্জি, ছিপছিপে গড়ন।
”একদম চুপ।”
গুলোদার কাঁধ ধরে ঘুরিয়ে পিঠে ধাক্কা দিয়ে ঠেলে দিল তাদের দিকে।
”একটা আওয়াজ বার করলে পুরো ঢুকিয়ে টেনে দোব।”
সন্দীপ অল্প আলোতেই দেখতে পেল প্রায় একবিঘৎ ইস্পাত ফলা গুলোদার তলপেটে লাগানো।
”চলো ওখানে।”
প্রথমে ও তাদের দেখতে পায়নি। সতর্ক চোখে চারধার দেখতে দেখতে হঠাৎ চোখ পড়তেই বিমূঢ় হয়ে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। দ্রুত কী যেন একটা হিসেব কষে নিল তাদের চারজনকে লক্ষ করতে করতে। ঝাঁপিয়ে পড়ার বা বাধাদানের সম্ভাবনা কতটুকু হয়তো সেটাই মেপে নিল। শুধু সুদীপের দিকেই একটু বেশিক্ষণ তাকিয়েছে।
”জানলাটা খোলা কেন?”
বন্ধ করার জন্য এগিয়েও থেমে পড়ল।
”এই খুকি তুমি গিয়ে বন্ধ করো, চালাকি করবে না…দেখতে পাচ্ছ হাতে…”
মেয়েটি উঠে দাঁড়াতেই সন্দীপ অবাক হল ওর দৈর্ঘ্যে। এত লম্বা সে ঠাওর করতে পারেনি। জানলা বন্ধ করে ও বেঞ্চে বসল। ওর ফ্রক থেকে একটা গন্ধ আসছে যেটা বাণীর কাপড়ে পাওয়া যায়। বেঁটে লোকটির হাত থেকে সিগারেট পড়ে গেছে। ফ্যালফ্যাল করে সবার মুখে তাকাচ্ছে। রত্নার চোখে পলক পড়ছে না। কিছু একটা ভাবছে, রগের কাছটায় দপদপাচ্ছে।
”ওরা বাড়ি বাড়ি সার্চ করবে।”
গুলোদা মরণাপন্নের শেষ উক্তির মতো বলল।
”ওরা দেখেছে কালো প্যান্ট পরা একজনকে।”
সন্দীপ বলল শুধু একটা খবর জানাবার জন্য সাদামাটা করে।
”আমিও শুনেছি। নড়াচড়া, আওয়াজ টাওয়াজ একদম নয়, যে যেমন তেমনি বসে থাকুন…আমার একটা কাপড় চাই, ধুতি।”
”ঘর থেকে আনতে হবে।”
”ঘরেফরে যাওয়া চলবে না, কে আছে ঘরে?”
”বউ। এদিকে এই সময় আসে না।”
ছোকরার বছর বাইশ-চব্বিশ বয়স। গালে আবছা কয়েকটা গর্ত, বসন্ত হয়েছিল ছোটোবেলায়। মানু যেভাবে সাজায় সেইরকম ঢঙে চুল। ময়দানে এইভাবেই ছোরাটা তার শরীরে ঠেকানো ছিল, গুলোদা ঠিক তার মতই এখন দাঁড়িয়ে। ছোকরার মধ্যে ব্যস্ততাটাই বেশি, ওকে প্রাণ বাঁচাতে হবে। এখন কি ও ছোরাটা পেটে ঢোকাবার ঝুঁকি নেবে যদি গুলোদা ঝাঁপিয়ে পড়ে? কিন্তু কেউ ঝাঁপাবেই বা কেন!
তার মুখে পাতলা হাসি ফুটে উঠেছিল। ছোকরা তাই দেখে মুখ কঠিন করল। আর চোখে কালো রবীন্দ্রনাথের দিকে দু-তিনবার তাকাল। চোখ বন্ধ করে একইভাবে আফিংয়ের মৌতাতে বুঁদ হয়ে রয়েছে বৃদ্ধ।
