রত্না সন্তর্পণে তার হাতের আঙুল চেপে ধরল। এটা ভালোবাসা প্রকাশের জন্য না তার সাহসিকতাকে তারিফ জানাতে, সে বুঝে উঠতে পারল না। টেলিফোনে ও অনুত্তেজিত গলায় বলেছিল, ”জায়গা পেয়েছ বুঝি, কোথায়?”
গুলোদা দু হাতে দুটো কাপ নিয়ে কিঞ্চিৎ বিব্রত মুখে এল। হাতটা তুলতে গিয়ে রত্নার বোধহয় ব্যথা করল, অন্য হাত বাড়িয়ে কাপ নিল।
”দেখুন তো চিনি ঠিক হয়েছে কিনা। বউ আবার চিনি কম খায়।”
চুমুক দিয়ে সে মাথা নেড়ে বোঝাল মিষ্টি ঠিকই হয়েছে। চায়ে ভাতের ফ্যানের স্বাদ।
”ওরা এখুনি…কটা বাজে, ওহ ঘড়িটড়ি খুলে এসেছেন, আমার এখানে ওসব ভয় নেই তবে যা দিনকাল সব পাড়াতেই তো ছিনতাই রাহাজানি…আমারও ঘড়ি নেই। দরকার কি, এত লোকের হাতে রয়েছে জিগ্যেস করে নিলেই হয়। আপনারা বসুন।”
গুলোদা অদৃশ্য হতেই সে উঠে জানলায় গিয়ে চাটুকু বাইরে ফেলে দিল।
”আমারটাও।”
রত্নার কাপটা ভরাই রয়েছে। জানলা থেকে সে বাইরের কিছুই প্রায় দেখতে পেল না। খানিকটা জমি, একটা চালাঘরের আভাস, বাইরের পাঁচিল, একটা বাড়ির দেয়াল ছাড়া অন্ধকারে কিছু বোঝার উপায় নেই। ঘরে মুখ ফিরিয়ে দেখল রত্না তাকিয়ে আছে কালো রবীন্দ্রনাথের দিকে। বৃদ্ধ একইভাবে হেলান দিয়ে। ওর এই চোখ বুজে অনড় হয়ে থাকাটা সারা জায়গা জুড়ে সরীসৃপের মতো পিছলে বেড়াচ্ছে। বৃদ্ধ চোখ খুলে এখন যদি কথা বলে ওঠে, ”তোমরা কে?”
রত্নার দৃঢ় চওড়া কাঁধ এবং বাহুর সবলতা, চিবুক, পুরু ঠোঁট, কপালের ঘাম, চুল ইত্যাদি তাকে এবার উত্তেজিত করছে। এই জন্যই আসা, নাকি অন্য কিছু প্রমাণ করতে?
ওর কাঁধে ঠোঁট চেপে ধরে সে মৃদু কাপড় দিতেই রত্না কাঁধ ঝাড়া দিয়ে বলল, ”কে দেখে ফেলবে।”
”ওর দেহে মৃদু সুগন্ধ। একই গন্ধ সাবুর থেকেও পেয়েছে। হঠাৎই মনে হল রত্নার বদলে সাবু এখন যদি থাকত!
”এভাবে বসে থাকতে হবে জানলে পরে আসতুম।”
”রেগুলারই তা হলে খদ্দের হয়। নেয় কত করে? জায়গাটা অবশ্য খুবই বাজে, কত নেয়? রেট এখানে বোধহয় ঘণ্টা পিছু?”
”কিচ্ছু জানি না। পরে জেনে নেওয়া যায়।”
”নিয়ো তো।”
”কেন, আসবে নাকি কাউকে নিয়ে।”
রত্না মুখের কাছে মুখ এনে চাপাসুরে বলল, ”এই রকম একটা রোজগারের ব্যবস্থা তো করা যায়। হেসেখেলে মাসে পাঁচ-ছশো তো হবেই।”
”কী করে?”
”গড়ে রোজ দুটো কিংবা একটাও যদি পাই…তা পেয়ে যাব মনে হয়, দুজনে যদি চেষ্টা করি…তোমার প্রণবেশ তো হেল্প করতে পারে, এই লোকটাকে না দিয়ে খদ্দের যদি আমাদের কাছে পাঠায়…তুমি জেনে নাও না কী রেটে টাকা নেয়। ঘরের ব্যবস্থা আমি করব।”
”তুমি কি পাগল হলে! এখন তুমি এইসব ভাবছ?”
”কেন, ভাবলে ক্ষতি কী? তুমি বড় গেঁতো।”
”তুমি একটা জন্তু।”
”থাক থাক খুব হয়েছে। এসব করে কি সারা জীবন চলবে নাকি? আমার শরীর যদ্দিন আছে তদ্দিনই তো তোমার প্রেম।”
”ঝিয়ের মতো কথা বলছ। শরীর ছাড়া আর তোমার আছেটা কি?”
”তোমারই বা কি আছে? লম্বা লম্বা কথা তো খুব বলো, তোমার জন্য আমার বালাটা গেল।”
”আমার জন্য! …তুমি কি নাবালিকা, ফুসলে নিয়ে গিয়ে বসেছিলুম?”
রত্না মুখ ঘুরিয়ে নিল। সে রাগে হাত মুঠো করে রয়েছে। চোখে একটা হালকা কুয়াশার মতো কিন্তু ঝাঁঝালো আস্তরণ পড়েছে। মোমবাতির শিখাটা এই প্রথম কেঁপে উঠল। বাতাস আসছে জানলা দিয়ে। সে জানলায় গিয়ে দাঁড়াল। অতি মূল্যবান এই বাতাসটুকু।
দূরে ক্ষীণভাবে একটা সমবেত চিৎকার হচ্ছে। আগুন লাগলে বা চাপা দিয়ে পালানো গাড়িকে তাড়া করার সময় এমন একটা হল্লা শোনা যায়। তার মনে হল চিৎকারটা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে, দ্রুত ছুটে আসছে।
সে ঘরের ভিতরে তাকাল। রত্না তাকিয়ে তার দিকে, কৌতূহল এবং জিজ্ঞাসা ওর চোখে। কোলে রাখা চামড়ার ব্যাগটা দু হাতে চেপে ধরে রয়েছে।
”কীসের চেঁচামেচি?”
”বুঝতে পারছি না।”
তখনই একটা ভারী কিছু উপর থেকে মাটিতে পড়ার শব্দ হল জানলার অদূরে পাঁচিলের কাছে।
”কী যেন একটা গোলমাল হয়েছে।”
রত্না উঠে এসে জানলায় উঁকি দিল। ঠিক তখনই গলিতে একসঙ্গে চার-পাঁচটি গলায় উত্তেজিত কথা শোনা গেল। অনেক পায়ে ছোটাছুটি হচ্ছে। দরজা খোলার শব্দ।
”এইদিকে এইদিকে এসেছে…আমি পায়ের শব্দ শুনেছি..চর্ট মার। সত্যি শুনছি।”
”ধ্যেৎ শালার ব্যাটারিও এখন…বাড়িতে গিয়ে বল নবাব টর্চটা দিতে।”
”ওদিকে আর গিয়ে কী হবে, পালিয়েই গেছে, কজন ছিলরে?”
”তিনজন। দুটো পালিয়েছে হরি ভটচাজ লেনের দিকে। আর এক ব্যাটা এটায় ঢুকেছে, আমি শিওর এদিকেই এসেছে..কালো প্যান্ট। এগলিতে আর যাবে কোথায় এখানেই তো শেষ।”
”ছুরি মেরেছে যখন তখন ওটা সঙ্গেই আছে। বোমাও নিশ্চয় এক-আধটা রেখেছে। নিতে পেরেছে কিছু? টাকা না গয়না নিয়েছে?”
”মেয়েছেলের কাছে টাকা কোথায় মশাই গয়নাই তো থাকবে। কিছু নিয়েছে কিনা জানি না, আমি তো চিৎকার শুনেই চেস করেছি।”
”যাকগে, পুলিশে বুঝবে ওসব..বিনু, নন্টু বাড়ি আয়..পড়তে পড়তে উঠে আসা, এই এক জ্বালা…ছেড়ে দাও ভাই, খোঁজাখুজি করে কোনো লাভ নেই, অন্ধকারে গয়না পরে বেরোনর ফল ভোগ করুক…ছুরিটা কি হাতে মেরেছে?”
”আরে মশাই ছেড়ে দোব কেন, পাড়ায় এসে ছিনতাই করে বেরিয়ে যাবে আর আমরা কোনো অ্যাকশান নোব না?”
