-ওমা তুমি চেয়ে দাও। আমি চাইলে বাবা দেবে না।
-আঃ জ্বালাসনি এখন, পড়াশুনো নেই নাকি তোর! পড়তে বসগে যা।
সানু চলে গেল। অন্ধকারেরও জ্বালা আছে। এখন কোথাও পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে মাধবীর।
.তখনও ঘর অন্ধকার। অফিস থেকে ফিরেই দিনেশ কপালে ভাঁজ ফেলে মাধবীর পাশে দাঁড়াল। মুখের ওপর থেকে হাত সরাল না মাধবী। বুকের কাপড় গুছিয়ে নিল।
-জ্বর হয়েছে নাকি?
-না।
-তবে শুয়ে যে?
-এমনি।
জামা কাপড় ছেড়ে লুঙ্গি পরে ঘর থেকে দিনেশ বেরোল। রমা ভাত গামলায় ঢালছিল। সানু পাশে বসে চুপ করে দেখছে।
-কি কচ্ছিস, ঢালছিস কেন ভাত?
-ইলিশ ভাতে হবে। দাদা এনেছে।
চটপট জবাব দিল সানু। রমা ভারি ব্যস্ত, তবু মুখ তুলে হাসল।
-চিনু এনেছে?
দিনেশ কাছে এসে দাঁড়াল। ভাত ঢালতে গিয়ে মেঝেয় কিছু পড়েছে। খুঁটে খুঁটে রমা তুলে রেখে গামলাটায় থালা চাপা দিল।
-চিনু কোত্থেকে পেল!
দিনেশ আবার জিজ্ঞাসা করল অনেকটা স্বগতোক্তির মত।
-সেই কানাইবাবুকে ঘর দেখে দিয়েছিল, তার জন্য আজ তিরিশটা টাকা পেয়েছে। পাঁচপো ওজন। খুব বড় একটা ডিম বেরিয়েছে।
-একটা ডিম কোথায়? হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ ডিম, তাই না বাবা।
রমার কথায় বাধা দিয়ে সানু ভুল ধরিয়ে দিল। হাসল দিনেশ।
-গুঁড়ি গুঁড়ি সুজির মত যেগুলো থাকে সেগুলোতো এক একটা ডিম। তার থেকে এক একটা মাছ হয়, তাই না?
-হুঁ।
-একটা মাছের কতো বাচ্ছা হয়, লক্ষ লক্ষ?
-দূর বোকা, অত মাছ হলে তো পুকুর ভর্তি হয়ে যাবে।
রমা এবার সানুর ত্রুটিটুকু সেরে দিল।
-ইলিশ মাছ পুকুরে হয় না, নদীতে হয়।
দিনেশ উবু হয়ে বসল। ওরা দুজন অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে। বেশ লাগছে মুখ দুটো। অনেকদিন ওরা এমন করে তাকায় না। অনেকদিন এমন করে সেও ছেলেমেয়েদের কাছে পায় না। মাধবী শুয়ে আছে কেন, সেওতো এসে কাছে বসতে পারে। চিনুটাই বা গেল কোথায়। সবাই এসে বসুক। কিছুক্ষণ হাল্কা কথাবার্তা হোক। এমন সময়তো ন’মাসে ছ’মাসে আসে।
-ভাতে কি করে কত্তে হয় জানিস? বাঙালরা জানে, ওদের দেশে মাছ হয়, নানান রকম মাছের রান্না জানে।
-আমিও জানি। আজ খেয়ে তারপর বলবে।
-জান বাবা, দিদি কোত্থেকে শিখেছে?
-আচ্ছা আচ্ছা, খুব ডেঁপোমো হয়েছে, পড়তে বসগে যা।
সানু একচুলও নড়ল না। দিনেশের ভাল লাগছে ওদের কথা। ঘাম জমেছে রমার নাকের দুপাশে। আলোতে ঝিকঝিক করছে। বিয়ের পর ক’দিন নাকছাবি পড়েছিল মাধবী। রমার নাকটিও টিকোলো। ওর মা’র মতন। চার বছর বয়সে ওর নাক বিঁধিয়েছিল মাধবী। একটা সোনার তারও ক’দিন নাকে ছিল। সেটুকুও গেছে। গেছে ভালই হয়েছে, নাকছাবি পরাও আজকাল উঠে গেছে। পথে-ঘাটে মেয়েদের গায়ে আর গয়না দেখা যায় না। যাবে কোত্থেকে, গয়না কিনতে তো পয়সা লাগে। পয়সা কোথায়? সদ্য বিয়ে হওয়া দু’চার জনকে দেখা যায় বটে হাতে, গলায় সোনা পরে ঘুরে বেড়াতে। কিন্তু বেশির ভাগেরই তো অন্য অবস্থা। দিনকাল পালটেছে। গয়না না-পরা মেয়ে দেখতে দেখতে ওইটেই চোখে সয়ে গেছে। চোখে এখন খালি হাত দেখতেই ভাল লাগে। পয়সার সঙ্গে চোখের সম্পর্কটা খুব কাছাকাছি।
অথচ বিয়ের সময় পাত্রপক্ষ এক গা গয়নার বরাদ্দ দেবেই। রুচি পালটেছে ঠিকই, তবু গয়না চাই-ই। যেজন্য ব্যাঙ্কে টাকা জমায়, সেজন্যই গয়নার চাহিদা। নইলে স্যাকরারাতো না খেয়ে মরতো। রমার বিয়ের সময়ও গয়না দিতে হবে। অত টাকা কোথায়! মহিম আজ যে পাত্রের খবরটা দিল, সেটা যদি লেগে যায়, তাহলে সবদিক দিয়েই ভাল। কিন্তু মাধবীর কি তা পছন্দ হবে?
কড়ার তেল গরম হয়ে উঠেছে। মাছ ছেড়ে দিল রমা। শব্দ হল। তেল ছিটকে গায়ে লাগল দিনেশের। জ্বালা করছে গলার কাছটা।
-ঝাল করবি না ঝোল করবি রে?
-ইলিশমাছ ভেজে রাঁধা হয় না।
-কেন?
-হয় না।
ভরপেট খাওয়ার পর ধীরে সুস্থে ঢেকুর তোলার মত রমা কথাটা উত্তর করল। হা-ভাতের মত সানু আবার জিগ্যেস করল।
-তবে সেদিন ট্যাংরা মাছ ভেজে ঝোল করলি কেন?
-সব মাছ কি এক রকম করে রান্না হয়। চিংড়ি মাছ ভেজে কি মালাইকারি করে?
রমার মনে হল সানুটা কখনো মালাইকারি খায়নি। খাবে কি করে। সে নিজেও তো দু’একবার ছাড়া খায়নি। আভার বিয়েতে মালাইকারি হয়েছিল। আভা ছোটবেলার বন্ধু! বিয়েতে কিছু একটা না দিলে মান থাকে না। মাধবী বলেছিল, গিয়ে কাজ নেই। দিনেশ চুপিচুপি একটা বই কিনে এনেছিল। তাড়াহুড়োয় খুলেও দেখেনি সে। মলাটে ছবি ছিল না বলে মনটা শুধু একবার খচ করে উঠেছিল। কিন্তু তবু, যাহোক কিছু একটা হাতে নিয়ে বিয়ে বাড়ি যাচ্ছে, এইটেই তখন যথেষ্ট ছিল। বইটাই তো সব নয়, ভালবাসাটাই বড় কথা। সামান্য জিনিসেই তো ভালবাসা বোঝান যায়। বিশ্ব তাকে ভালবাসে বলেই না এঁটো চা অনায়াসে এগিয়ে দেয়। আজ কদিন ওর সঙ্গে ভাল করে কথা বলা হয়নি। ওকে দু’খানা মাছ দিয়ে এলে হয়! ভালমন্দ খাওয়া যখন-তখন তো আর জোটে না।
-সানু তুই মালাইকারি খাসনি কোনদিন?
মাথা নাড়ল সানু।
-আচ্ছা তোকে রেঁধে খাওয়াব। বাবা এনো না একদিন। সেই নীলরঙের বড় বড় দাড়াওলা গলদা। দাড়া দিয়ে বেশ চচ্চচড়ি হয়।
তেল লেগে জ্বলছে গলাটা। ফুটন্ত তেলের মত রমার কথাগুলো। দিনেশের গলায় কড়া কড়া কতকগুলো কথা জমে উঠেছে। সংসারের এই হাল, তার ওপর আর আবদার সয় না। কথাগুলো ছেলে ভুলোন সুরে রমা বলেনি। সানু মনে করে রেখে দেবে আর প্রত্যেকদিন খ্যাচ খ্যাচ করবে। তখন একটা লজ্জা আসে মনে। লজ্জা কাটাতে গেলে তিন চার টাকা খরচ করতে হয়। একদিন মাছ খেয়ে কি এমন পুণ্যি হবে! এই যে টাকাগুলো নষ্ট করে মাছ আনল চিনু, এতে কি লাভ হ’ল। পয়সাটা অনেক কাজে লাগত।
