প্রথমেই যে শব্দ হল তাতে বিনয়ের সঙ্গে চাপা একটা অপরাধীভাব তার কানে বাজল। খানিকটা ভয়-ভয় ধরনের ব্যাপারও যেন রয়েছে! একটু স্ফূর্তি চাপল্য থাকলে ভালো হয়, এই ভেবে সে এমন কয়েকটা আওয়াজ কড়া থেকে বার করল যাতে রত্না চাপা ধমক দিল, ”তুমি কি মিনিবাস চালাচ্ছ নাকি?”
সে অন্ধকার রাস্তার দুধারে তাকাল। এত সরু একটা রিকশাও যেতে পারবে না। গর্ত আর ঢিবিতে ভরা। বাঁকের পরই দেয়ালে একচাপড়া ঝাপসা আলো সামনের বাড়ির হারিকেনের। কোথাও সাড়াশব্দ নেই, পাঁচিলের ধারে চাঁপা গাছটায় পাখিদের ঝাপটানি ছাড়া।
নিঃশব্দে দরজার একটা পাল্লা খুলে গেল এবং প্রথমেই কেরোসিন বাতি হাতে গুলোদার জিজ্ঞাসু মুখটি বেরিয়ে এল। ওর পরনে সবুজ লুঙ্গি সাদা পাঞ্জাবি। রত্না সরে এল সন্দীপের পিছনে।
”অ, আপনি, আসুন আসুন।”
গুলোদা হাসিমুখে আপ্যায়নের ঢঙে সরে দাঁড়াল পথ দেবার জন্য। তার মনে হল রত্নাকে দেখার জন্যই মাথাটা কাত করেছিল। বাতির কাচে ভূষি, সেটাকে তুলে ধরে দ্বিতীয়বার বলল, ”ভেতরে আসুন। ছেলে বলেছিল আজ আসবেন। ভেবেছিলুম একটা দেরি করেই হয়তো…” দরজাটায় খিল দিয়ে গুলোদা গলা নামিয়ে বলল, ”ইতিমধ্যে আর একটা পার্টি এসে গেছে, ফেরাতে পারলাম না…নানান ব্যাপারে উবগার করে…চটালে মুশকিল, বুঝতেই তো পারছেন করেকম্মে চালাতে হয়তো…ওদের বসিয়ে দিয়েছি, ততক্ষণ আপনারা ভেতরের ঘরে একটু ওয়েট করুন, অসুবিধের কিছু নেই, শুধু এই লোডশেডিংয়ে গরমটা একটু লাগবে, এইমাত্র আধঘণ্টাও হয়নি কারেন্ট গেল…ওদের বেশিক্ষণ অবশ্য থাকার কথা নয়।
বাতিটা তুলে গুলোদা এগোল। বাড়ির বাইরের দেয়ালের মতই ভিতরের অবস্থা। স্যাঁতসেঁতে, ভ্যাপসা আর একটা গন্ধ যা দীর্ঘকাল বন্ধ প্যাঁটরা খুললেই পাওয়া যায়। সদর থেকেই বাঁ দিকে ঘুরে গেছে যে সরু দালান তার প্রথমেই একটা বন্ধ দরজা। গুলোদা দরজাটার দিকে সামান্য মুখ ফেরাতেই সন্দীপের মনে হল এটাই বোধহয় সেই ঘর।
তারপর একধাপ নেমে টানা একটা রোয়াক। বাঁ দিকে উঠোন, কলঘর এবং নিচু পাঁচিল এবং বাইরে ছোটো দরজা। এটা দিয়ে রাস্তায় বেরোন যায় না। খোলা রয়েছে দরজাটা। রোয়াকের শেষ প্রান্তে খোলা জানলা। সেখানে রোয়াকটা চওড়া হয়ে গেছে। জানলা দিয়ে হাওয়া আসছে না কেননা দেয়ালে কুলুঙ্গিতে মোমবাতির শিখা নিষ্কম্প। জানলার ধারে দেয়াল ঘেঁষে একটা হাতলওলা বেঞ্চ যার ঠেস দেওয়ার কাঠের একটা বাতা ভাঙা।
রোয়াক থেকে ডানদিকে একটা সরু ফালি, দড়িতে রঙিন নকশা কাটা পর্দা ঝুলছে। ওদিকে নিশ্চয় গুলোদার পরিবার থাকে। ট্রানজিস্টার থেকে ক্ষীণ স্বরে নাটকীয় কথোপকথন ভেসে আসছে।
”আপনারা এই বেঞ্চে বসুন আমি একটু চায়ের কথা বলে আসি, না না অসুবিধে কিছু হবে না…হঠাৎ এসে পড়েছে, না বলতে পারলুম না, এখুনি হয়ে যাবে..বাতিটা আমি নিয়ে যাচ্ছি, আজই হ্যারিকেনের চিমনিটা ভেঙেছে…ওহ উনি আমার বাবা।”
একধারে ইজিচেয়ারে চোখ বুজিয়ে রয়েছে এক বৃদ্ধ। ধবধবে সাদা বাবরি চুল আর দাড়ি এবং গাত্রচর্ম ঘোর কালো। ময়লা ফতুয়া আর ধুতি। নাক টিকালো।
‘আপিম খেয়ে আছেন, এই সময়টায় রোজই…তাতে আপনাদের কোনো অসুবিধে হবে না, এখন ঘণ্টা দুই এভাবেই থাকবেন।”
গুলোদা পর্দার আড়ালে অদৃশ্য হতেই এতক্ষণ চুপ করে থাকা রত্না নীচু স্বরে বলল, ”ঠিক রবীন্দ্রনাথ। যদি পাশ থেকে দ্যাখো। কেমন স্ট্যাচুর মতো হয়ে রয়েছে।”
”কালো রবীন্দ্রনাথ।”
”রবীন্দ্রনাথের কাঁধ আরও চওড়া। তবে চুলটুল ঠিক আছে, দাড়ির সাইজটাও। নাকটা বোধহয় একটু উঁচু হওয়া দরকার।”
দুজনেই গুলোদার বাবাকে খুটিয়ে দেখল। সে বিশেষ করে লক্ষ করল না যদি দেখা যায়!
”খুব খাতির দেখাচ্ছে, ব্যাপার কী?”
”প্রণবেশের অনুগৃহীত তাই, খাতিরটা আমাদেরকে নয়।”
”বড্ড গরম..ওই বন্ধ ঘরটাই মনে হল।”
”আমারও তাই মনে হচ্ছে।”
”পাখা আছে তো?”
”লোডশেডিং।”
”দেয়াল একটা ছবি, দেখেছ?”
তিন হাত লম্বা একটা অয়েল পেইন্টিং যেটা এই প্রায়ান্ধকারে দেয়ালের সঙ্গে প্রায় মিশে রয়েছে। ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত, ধুতি পরা কৃষ্ণবর্ণ এক পুরুষ, মেরুদণ্ড সিধে রেখে চেয়ারে বসে। পৈতে এবং চোখ দুটিই শুধু জ্বলজ্বলে সাদা। জানুতে একটি হাত এবং হাতে ধরা একটি বই। নাসিকা তীক্ষ্ন। গুলোদারই কোনো পূর্বপুরুষ সম্পত্তি ভাগাভাগিতে এই দেয়ালে এসে পড়েছে।
সন্দীপ কী যেন একটা মিল খুঁজে পেল তার কাকার সঙ্গে। সম্ভবত চোখ দুটোয়। সেদিনের পর কাকার সঙ্গে আর দেখা হয়নি। বাণী কদিন মুখ ভার করে তাকে ভাত দিয়ে গেছল, কথা বলেনি। মানুদের দরজায় তালা, ওরা কোথায় গেছে তা একমাত্র বাণীরই জানার কথা।
”ব্যাপার কী, ওরা কোথায়?”
অবশেষে সেই প্রথম কথা বলে। বাণী যেন এই বরফগলার অপেক্ষায়ই ছিল।
”সেদিন এক বিধবা এসে কি যাচ্ছেতাই গালাগালিই না মাকে দিয়ে গেল। ওর মেয়েকে ঠাকুরপো বিয়ে করবে বলে…সেকি খারাপ খারাপ কথা। মা কেঁদে ফেলেছিল। যাবার সময় বলে গেল, আবার আসবে, রোজ এসে পাড়ার লোক জড়ো করে রাস্তা থেকে চেঁচাবে। কি কাণ্ড বলুন তো! আপনার ভাই-ই মাকে বলল এখান থেকে কিছুদিনের জন্য চলে যেতে।”
”আর এসেছিল?”
”না।”
বারান্দা থেকে সে পানুকে কাগজ পড়তে দেখে, কিন্তু ওর সঙ্গে আর কথা হয়নি। বাণীর হাত দিয়ে সে ছবিটা পাঠিয়ে দিয়েছে, নিশ্চয় ছাপাবে। নিজের ভাইকে সে চেনে।
