কুকুর তিনটে যখন হাত পাঁচেক দূরে, সে চিৎকার করে ওঠার জন্য বুকের মধ্যে বাতাস টেনেছে এবং বিলীয়মান সাহস সম্পর্কে হতাশ, তখনই খিল তোলার শব্দ পেল এবং পিঠ দিয়ে পাল্লাদুটোতে ধাক্কা দিয়ে ছিটকে খুলে দিতেই পানু ”উহঃ” বলে উঠল। ওর মুখে আঘাত করেছে একটা পাল্লা।
”এত দেরি হয় কেন দরজা খুলতে, য়্যা, কচ্ছিলি কী? এখুনি কুকুরে কামড়াচ্ছিল। এত নিড়বিড়ে ন্যাদামারা কেন?”
ভয় থেকে রেহাই পেয়েই সে অন্ধ একটা রাগের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। রাগটা এইমাত্র তৈরি হওয়া। কী বলছে সেটা তার কাছে সামান্যই ব্যাপার, রাগটাকে কত তীব্র ধারালো করে জখমের জন্য ব্যবহার করা যায় সেটাই এই মুহূর্তে সে দেখতে চায়। এখন তার মধ্যে তোলপাড় হচ্ছে আঘাত করার জন্য আবেগ।
”এত দেরি হল কেন?”
হঠাৎ সে গলা চড়িয়ে চিৎকার করে উঠল। পানুর মুখটা ঝাপসা দেখাচ্ছে, জলেভেজা কাচের ওধারে যেন দাঁড়িয়ে। আলোটা ওর পিঠে, চুল ওঠা খুলিতে, শুকনো বাহুতে এবং বসে যাওয়া গালে কতকগুলো কালো দাগ তৈরি করেছে। সন্দীপ সেই দাগগুলোর উপর তার রাগ ছুঁড়ে মারতে একই কথা আবার বলল, ”আমাকে কুকুরে কামড়াতো আর একটু হলেই…অপদার্থ, চটপট নেমে এসে দরজা খুলতে পারিস না? এইজন্যই জীবনে কিছু হল না, কিছু করতে পারলি না।”
”ওপরে যাও, আর চেঁচাতে হবে না।” পানু কপালে হাত বোলাল। ফুলে উঠেছে।
”বেশ করব চেঁচাব, আমি কেঁউকেঁউ করে কথা বলি না, এ বাড়িতে আমি ক্লিনেস্টম্যান, ক্লিন অ্যান্ড অনেস্ট…আই হ্যাভ এভরি রাইট টু শাউট!”
পানু তাকে কনুই ধরে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে নেবার চেষ্টা করল। সেই সময় দরজা খোলার শব্দ হতেই সে ঘুরে দেখল কাকা দাঁড়িয়ে তাঁর ঘরের দরজায়। মাথার ব্যান্ডেজ থেকে একটা অংশ ঘাড়ে ঝুলে রয়েছে। পাশের ঘরেই থাকেন কিন্তু আজ পর্যন্ত কখনো কাউকে দরজা খুলে দেননি। কেন দেয় না? কুকুর যদি কামড়াতো?
এই যে মূর্তিমান শিবাজী? আটচল্লিশ ইঞ্চি বুকে মালা ঝুলিয়ে ঘোড়ায় চড়ে দেশোদ্ধার করছেন। ..খপ খপ খপ খপ, আওরঙ্গজেবের সঙ্গে যুদ্ধ করে যাচ্ছেন…হুঁশ নেই রোগাপটকা ছেলেগুলো পাইপগানের নল থেকে পেদে দিচ্ছে দেশের মুখে। আমায় যে কুকুর কামড়াচ্ছিল…”
”পানু ওকে ওপরে নিয়ে যা।”
”’চেষ্টা তো করেছি। মনে হয় একা থাকলে একসময় চুপ করে যাবে।…এই প্রথম।”
”তাহলে ওপরে চলে যা তুই, ও থাক।”
কাকার দরজা বন্ধ হয়ে গল। পানু সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে যাচ্ছে। সে দেয়ালে হাত রেখে এগোতে লাগল অনুসরণ করে।
”দরজা খুলতে এতো সময় লাগে, চটপটে হতে পারিস না? কোনোদিনই পারলি না, পারলে হাসি তোর হাতছাড়া হত না…মিছিমিছি দুটো ছেলেকে মারলি।”
সে সিঁড়ির মাঝামাঝি, পানু তখন দোতলায়। তার মনে হল পানু থমকে দাঁড়িয়ে গেল। মুখ তুলে সে দেখার চেষ্টা করল। জড়িয়ে যাচ্ছে চোখ। বিশাল ঘুম তার উপর চেপে আসছে। প্রচণ্ড জল পিপাসায় জিভে টান ধরছে। পানুকে সে দেখতে পাচ্ছে না। কিন্তু তার মনে হচ্ছে ও দাঁড়িয়ে রয়েছে। অপেক্ষা করছে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য।
কিন্তু সে ভীরু নয়। তার গায়েও জোর আছে। এখনও সে কুড়ি, পঁচিশ, ত্রিশটা ডন দিতে পারে। পানুকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারে দোতলা থেকে একতলায়। তাই বলে রেয়াৎ করবে না, কোনো ক্ষমা নেই…দু দুটো ছেলেকে মেরেছে। সে এবার তৈরি বদলা নিতে।
সন্দীপ তিনতলায় পৌঁছল নির্বিবাদে। কেউ তার জন্য দাঁড়িয়ে ছিল না।
. সন্ধ্যার সময়, শেয়ার ট্যাক্সি থেকে নেমে মিনিট চারেক হেঁটে ওরা সতেরোর-বি পেল।
তখন লোডশেডিং বিদ্যুতের। চিত্তরঞ্জন অ্যাভিন্যু পশ্চিম থেকে বেরিয়ে গলিটা ক্রমশ সরু এবং প্রচুর বাঁক নিয়ে আরও সরু হয়ে এলেও অন্ধকারে তাদের অসুবিধা হয়নি। সন্দীপ দু’দিন আগে অফিস যাবার পথে বাড়িটা দেখে গেছে। তখন গুলোদা ছিল না। একটি কিশোর তাকে জানায়, ”বাবাকে বিকেলে পারেন।”
গলি থেকে একটা শাখাগলি বিশাল প্রাচীন একটা বাড়ির গা ঘেঁষে ঢুকে ইংরেজি ‘ওয়াই’ অক্ষরের মতো হয়ে দুটি বাড়ির খিড়কি দেয়ালে শেষ হয়ে গেছে।
পলেস্তরা খসা দেয়ালের নোনাধরা ইঁটগুলো, কবজা ভাঙা রংচটা জানলা দরজা, বৃষ্টি জলের ভাঙা পাইপ এবং কার্নিশের বটগাছ ইত্যাদি দেখতে দেখতে বাড়িটাকে তার মনে হয়েছিল চামড়া ওঠা দগদগে একটা প্রাগৈতিহাসিক জন্তুর শরীর। এর সদরদিক অন্য কোনো রাস্তার উপর, এটা বাড়ির পিছনের অংশ। এক সময় হয়তো রান্নাঘর, চাকরদের থাকার ঘর, গোয়াল বা আস্তাবল বা ছোটো ডোবাও হয়তো ছিল। মাথাসমান পাঁচিলের ভেঙে যাওয়া ফাঁকটা দিয়ে দেখা যায় ছোটো একটা জায়গা যেখানে মুণ্ড ও হাতভাঙা পরীমূর্তি ও ইঁটপাথরের টুকরো মাটিতে পড়ে এবং শীর্ণ বৃদ্ধ একটা চাঁপা গাছ। গুলোদার দরজা পাঁচিলের শেষেই।
অন্ধকারে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রত্না ফিসফিসিয়ে বলল, ”লোডশেডিংয়ে ভালোই হয়েছে, কেউ দেখতে পায়নি আমাদের।”
”পেলেই বা, ভয়টা কীসের, আমরা তো একজনের বাড়িতে যাচ্ছি…যেতে পারি না কি? হাতটা ঝুলিয়ে রাখা উচিত ছিল ব্যান্ডেজে।”
”বড্ড তাকায় লোকে, সেজন্য আজ খুলে রাখলুম।”
দরজার মতো কড়া দুটোও বোধহয় গত শতাব্দীর। এক একটা অন্তত এককিলো ওজনে। একটা কড়া ধরে সে ভাবল কতজোরে নাড়া উচিত। বিনীত, উৎসুক অথচ খুবই পরিচিত এমন একটা আওয়াজ বার করা দরকার, আশপাশে কেউ যেন কৌতূহলী না হয়।
