প্রণবেশের মুখ থেকে হালকা ভাব অন্তর্হিত হয়ে বিস্ময় এবং মুহূর্তেই সেটা আন্তরিকতায় চলে গেল।
”সিরিয়াসলি?’
”নিশ্চয়, কেন তোর কি সন্দেহ হচ্ছে, আমি কি যেতে পারি না?”
”ব্যবসা করে খাই, কিছুতেই আর অবাক হই না, কাকে নিয়ে যাবি?”
”আছে।”
গলায় অস্বাভাবিক জোর এসে গেল ”আছে” বলার সময়। তার নিজের কানেও এটা লেগেছে। প্রণবেশ একদৃষ্টে তাকিয়ে সম্ভবত তাকে বোঝার চেষ্টা করছে। কী বুঝতে চায়? ও কি ভাবছে এটা কৃত্রিম সাহস? অপ্রয়োজনীয়, গুরুত্বহীন লালসা?
”তোর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব, অদ্ভুত ধরনের মেয়ে, স্বামী ছেড়ে বাপের বাড়িতে আছে। অ্যাথলীট ছিল।”
”কী নাম?”
”রত্না গড়াই।”
”গুলোদার ওখানে যাবে?”
”নিশ্চয়।”
আবার বোধহয় গলায় জোর এল ”নিশ্চয়” বলার সময়। সে প্রণবেশের মুখের দিকে তাকিয়ে অস্বস্তি বোধ করল। মুখে ভাবান্তর ঘটেনি।
”তুই কালকেই গিয়ে দেখা কর। ওর শালীর মেয়ের ছবি ছাপিয়ে দেব বলেছি আমার ভাইয়ের পত্রিকায়, ফাংশনে গান গেয়েছে।”
”দেখা যখন করতে বলেছে, জেনে রাখবি কাজ আমি পেয়েই গেছি।…সাবু।”
ও যেন ডাকটার প্রত্যাশায়ই ছিল। সঙ্গে সঙ্গেই এল। হালকা ধমকের সুরে প্রণবেশ বলল, ”কী করছ এতক্ষণ ধরে, আমরা দুজনেই কি শুধু গপ্পো করে যাব, বোস এখানে। জানিস, সাবু খুব ভালো মেয়ে।”
”আমি কিন্তু আজ তাড়াতাড়ি ফিরব, শাশুড়ির জ্বর একই রকম দেখে বেরিয়েছি।”
”আরে বেশিক্ষণ আমরাও বসব না। সানুকে নামিয়ে তোমাকে পৌঁছে দেব।”
গুলোদার চেয়ারটায় সাবু বসল। সে এই প্রথম লক্ষ করল ওর রুগণ হাতে প্রচুর রোম, নখে রং, কণ্ঠার হাড় উঁচু।
”আপনার কথা অনেকবার শুনেছি।”
সে বলতে যাচ্ছিল, আপনার কথাও শুনেছি, কিন্তু তার বদলে বলল, ”আজ একটা ব্যাঙ্ক ডাকাতির মধ্যে পড়ে গেছলুম। টাকা তুলতে গেছি আর তখনই ডাকাতিটা হল।”
অতঃপর সে ডাকাতির বিবরণ দিতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর দরজা ফাঁক হয়ে গুলোদার মুখ উঁকি দিতেই সাবু উঠে পড়ল। অতি সামান্য জায়গা দুটি চেয়ারের মধ্যে, সন্দীপের উচিত ছিল একটু হেলে কাঁধ সরিয়ে রাখার। সাবুর নিতম্বের স্পর্শের থেকেও সে বেশি খুশি হল নিজের অসঙ্কোচতায়। এটাও এক ধরনের সাহসিকতা!
প্রণবেশ তাকে বাড়ির সামনে যখন নামিয়ে দিল তখন রাস্তা নির্জন হয়ে এসেছে। মুরারি বন্ধের উদ্যোগ করছে, তিনটে কুকুর দোকানের সামনে বসে। মোটর এঞ্জিনের শব্দে তারা ফিরে তাকাল। বাস স্টপে একটিমাত্র লোক। অপেক্ষায় রয়েছে। সিগারেটের দোকানটা মাঝরাত পর্যন্ত খোলা থাকবে।
পানুর ঘরের আলো বারান্দায়, মানুদের জানলাগুলো বন্ধ। গাড়ি থেকে নামার সময় পা একটু টলে গেছল মাত্র। জিভটা অবশ লাগছে।
পিছনের সীটে সাবু। জানলা দিয়ে হাত ঢুকিয়ে সন্দীপ বলল, ”গুড নাইট।”
”গুড নাইট।”
সাবু তার হাতে আলতো করে হাত ছোঁয়াতেই সে মুঠোয় চেপে ধরল।
”তুই তাহলে যাস, কালকেই, আমি চেষ্টা করব বুঝলি…তুই ভাবিসনি, হয়ে যাবেই…তোর না হলে আমি কিছুতেই সন্তুষ্ট হব না, বুঝলি সন্তুষ্ট হব না…”
”সানু চলি, গুড নাইট।”
গাড়ি থেকে হাতটা বার করার সময় সে সাবুর গালে হাত বুলোল। তারপর হাতটা নিজের গালে ছুঁইয়ে হাসল। গন্ধ শুঁকল। সাবু হাসল বোধহয়। গালটায় শুধুই চামড়া।
গাড়িটা প্রায় পঞ্চাশ মিটার গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। ভারী চোখের পাতা টেনে সে দেখতে পাচ্ছে সাবু নামল এবং সামনের দরজা খুলে প্রণবেশের পাশে গিয়ে বসল। ডান হাতে স্টিয়ারিং, বাঁ হাতে সাবুকে নিয়ে এবার গাড়ি চালাবে। সাবুও সাহসী!
সদর দরজার দিকে যেতে যেতে এখন তার রত্নাকে মনে পড়ল। গুলোদা বলেছে খুব খুশি হবে তার সেবায় লাগলে। বড় বিনয়ী, আস্ত ঘুঘু। যে-কোনোদিন যে-কোনো সময় সে যেতে পারে।
দরজায় টোকা দেওয়ার বদলে কিল বসাল, পরপর চারটে। কোনো সাড়া এল না উপর থেকে। আলো জ্বালিয়ে কি পানুরা ঘুমিয়ে পড়েছে? মানুর চাকরটা গেল কোথায়?
সে আবার কিল মারল কয়েকটা। সামনের বাড়ির জানলা ফাঁক করে কেউ দেখছে। সে ঘুরে তাকাতেই পাল্লাটা বন্ধ হয়ে গেল।
”কে?”
পানুর গলা। বোধহয় মন দিয়ে নভেল লিখছিল। তাছাড়া আলো জ্বেলে করবে কি! কুকুরগুলো ছুটোছুটি করছে খেলাচ্ছলে। তাদের একটা হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। ভঙ্গিতে সন্দেহের ভাবই বেশি। বারকয়েক ফোঁৎ-ফোঁৎ নাকে শব্দ করে তার দিকে এগিয়ে আসতেই অন্য দুটিও ছুটে এল এবং চাপা গজরানি শুরু করল।
সন্দীপ ভয় পায় কুকুরকে, বিশেষ করে রাস্তার কুকুরকে। ছোটোবেলায় দেখেছিল তাদের চাকরের পায়ের ডিমে পাগলা কুকুরে কামড়েছিল। ছিঁড়ে তুলে নিয়েছিল মাংস। চোদ্দটা ইঞ্জেকসন নেবার পর ওর নাভির চারপাশ শক্ত হয়ে গেছল। ব্যথায় হাঁটতে পারত না। প্রতিবারই ধস্তাধস্তি করে ওকে শোয়াতে হত ইঞ্জেকশন নেবার জন্য।
ঘাড়ের কাছে সিরসির করছে। দরজায় পিঠ লাগিয়ে সে নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে। শরীরটা শক্ত হয়ে উঠেছে, আঙুলগুলো বাঁকানো। তার হাত দুটো মুখের সামনে। একটা কুকুর মাড়ি বার করে বিশ্রি চোখে তাকিয়ে। ওখান থেকে একলাফেই তার টুঁটি ধরতে পারে। ভয় তার দেহ বেয়ে ওঠা-নামা করছে। পানুর এত দেরি হচ্ছে কেন দরজা খুলতে? শুনতে পায়নি? ঘুমিয়ে পড়েছে? ইচ্ছে করে দেরি করছে?…রাসকেল।
