প্রণবেশের উচ্ছ্বাস অকৃত্রিমই মনে হল। গুলোদা স্মিত মুখে হাত তুলে নমস্কার করল। বাসিঘামের টোকো গন্ধ আসছে। দেয়ালে আঁটা ছোট্ট পাখাটার দিকে সে তাকাল। তাই দেখে প্রণবেশ দাঁড়িয়ে উঠে পাখার গায়ে লাগানো একটা বোতাম টিপল। পাখাটা এধার ওধার মাথা নাড়ানো শুরু করল। বাইরের থেকে টাইপের শব্দ আসছে।
”আমার কথা কেন মনে পড়ল?”
”বউ নিয়ে কথা হচ্ছিল, নানান ধরনের, এক সময় ফিগার নিয়ে কথা উঠল তখন…”
আর একবার তার মাথার মধ্যে ঝাঁ করে উঠল। অলকার ক্ষীণ ভাঙাচুরো দেহ যে অজানা এক আড্ডার আলোচ্য বিষয় হতে পারে এটা তাকে যত না অবাক করছে তার থেকেও বেশি, সম্পর্কে ও প্রণবেশের বোন হয়। অলকার প্রতি সে মায়া বোধ করল। দেহটার জন্য ও দায়ী নয় এবং নিজেকে সরিয়ে গুটিয়ে রাখার মানসিকতা গড়ে উঠেছে অনাকর্ষণীয় দেহের জন্যই যে এটা বোঝা যায়। কিন্তু প্রণবেশ সেটা উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করবে কেন?
তার অপ্রতিভ মুখ ও হঠাৎ গাম্ভীর্যে প্রণবেশ বিন্দুমাত্রও বিব্রত হল না। ফুৎকারে উড়িয়ে দেবার ব্যাপারের মতো ভঙ্গিতে বলল, ”বউদের ফিগারের সঙ্গে স্বামীদের হ্যাপি হওয়ার কোনো সম্পর্ক আছে কিনা তাই নিয়েই শুরু হয়েছিল। তখন বলেছিলুম আমার এক বন্ধু আছে সে তো দিব্যি দিন কাটিয়ে যাচ্ছে যদিও তার বউয়ের ফিগারটিগারের বালাই নেই…অলকা তো হপ্তায় ছ’দিনই বাইরে থাকে তোর কোনো অসুবিধা হয়?”
সন্দীপ বিনা চেষ্টাতেই মুখে হাসি ফোটাল এবং মাথা নাড়ল। মাইল দৌড়ে বিজয়ীর মতো উজ্জ্বল মুখে প্রণবেশ মাথা দুলিয়ে চোখ টিপল গুলোদাকে।
”তারপর আর কী খবর বল।”
”ভালো খবর, ওটা নিয়ে কথা বলেছি।”
”প্রণবেশ ভ্রূ কোঁচকাল। সে গুলোদার দিকে একবার তাকিয়ে বলল, ”সেই সাপ্লাইয়ের ব্যাপারটা।”
”ওহঃ, বলেছিস, কী হল।”
”বোধহয় হবে, তোকে দেখা করতে বলেছে, তবে বাড়িতে রাত আটটার পর।”
”ফাইন। কত খাওয়াতে হবে সেরকম কিছু হিন্টস দিল? কবে যাব?”
”না, যে-কোনো দিন।”
”মেয়েছেলে দিতে হবে? সে ব্যবস্থাও আছে।”
প্রণবেশ আবার গুলোদার দিকে তাকিয়ে হাসল। ভাবখানা, এ তো অতি সহজ সামান্য ব্যাপার।
”জানি না।”
”তোর দরকার?”
আবার মাথার মধ্যে মৃদু ভূমিকম্প ঘটল। হঠাৎই তার মনে হল বড় সামান্য, উদ্দেশ্যহীন জীব হয়ে সে বেঁচে রয়েছে। নিজের অবস্থা নিয়ে সন্তুষ্ট পরিচিতিহীন একটা ন্যাদামারা। তার একটা পরিচয় দরকার, মানুর মতো বা প্রণবেশের মতো না হোক বেপরোয়া, প্রবল জীবনযাপনের শব্দ দিয়ে চারপাশকে সচকিত করে তোলা দরকার। সে অসন্তুষ্ট, এটা দেখাবার সাহস যে তার আছে সেটা এবার বলা দরকার। সে অসন্তুষ্ট, এটা দেখাবার সাহস যে তার আছে সেটা এবার বলা দরকার। কয়েক মিনিটেই একজনের সারাজীবনের আয় ডাকাতি করে নিচ্ছে বাচ্চচা ছেলেরা, ধরা পড়ছে কি পড়ছে না আর সে কিনা গোটা জীবনেও হাত-পা ছুঁড়তে পারল না!
”কি রে, এত কী ভাবছিস, লজ্জা করছে বলতে?…আরে গুলোদাই তো ভরসা…ঘরটর চাই তো বল, সব আমার খরচ। একবার তোদের কোম্পানিতে সেঁধোই তো।”
”তুই কি দালালি দিতে চাস?”
”অ্যাই দ্যাখো, রেগে গেলি তো! বন্ধুর জন্য বন্ধু করে না! গুলোদা একটু ব্যবস্থা করো, সাবুকে ডাকো, অরুণ আছে না চলে গেছে?”
”চলে গেছে, দাও আমাকেই দাও এনে দিচ্ছে।”
”ওর কাছে কালকের ক’টা টাকা আছে…সাবু!”
প্রণবেশ গলা চড়াতেই টাইপের শব্দ থেমে গেল। দরজা ঠেলে সাবু ঢুকল আর সন্দীপ ফিকে একটা সুগন্ধ পেল।
”সন্দীপ এসেছে, একটু খাওয়ার ব্যবস্থা করো। কালকের টাকা কিছু আছে?”
”একত্রিশ টাকা… ঝাড়ুদারকে আজ দুটাকা দিয়েছি।”
পরিচয় করিয়ে দেওয়ার দরকারই মনে করল না, হয়তো তার সম্পর্কে প্রণবেশ অনেকবার বলেছে। ওর সম্পর্কে প্রণবেশ তাকে কী বলেছে সেটা নিশ্চয় ও জানে না। সে যথাসম্ভব আড়চোখে পাশে দাঁড়ানো সাবুর মুখ দেখার চেষ্টা করল। সিঁথিতে সিঁথিতে চিহ্ন অস্পট, দীর্ঘ পল্লবের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসা চাহনিতে কোনো ভাব নেই। বেশির ভাগ সময় অলকার চোখ এই রকমই থাকে, বীতস্পৃহ, নিরুৎসুক। তবে সাবুর এটা ইচ্ছাকৃত, সাময়িক, বাইরের লোকের সামনে।
”কী খাবি, রাম না হুইস্কি?…ওহ বীয়ার ছাড়া তোর তো অন্য কিছু চলে না।”
”না বীয়ার খাব না, রাম আনা।”
”গুড। গুলোদা তা হলে রাম…আর চাইনিজ না তন্দুরি?”
প্রণবেশ সকলের দিকে একবার তাকাল।
”তন্দুরি চিকেনই ভালো।”
গুলোদা অনুমোদনের জন্য তার দিকে তাকাতেই সে মাথা হেলাল। তার খিদে পাচ্ছে। প্রণবেশ ড্রয়ার থেকে ব্যাগ বার করে সাবুর দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল।
”একশোতেই হবে, আমার কাছে তো…”
”থাক তোমার কাছে। গ্লাসগুলো বার করো, প্লেট ধুয়ে নিয়ো।”
দুটো একশো টাকার নোট নিয়ে গুলোদা বেরিয়ে গেল এবং সাবুও।
”লোকটা করে কী?”
”টুকটাক এটা সেটা, দালালি, আমার মালও কিছু কিছু বেচে তবে মেইন ইনকাম ঘর ভাড়া দিয়ে। বনেদি আমলের বিরাট বাড়ি, শরিকও প্রচুর। গুলোদার অংশ বাড়ির পেছন দিকে একটা সরু গলিতে ওর সদর। যাওয়া আসায় লোকের নজরে পড়ার ভয় নেই কিন্তু পরিচিতরা না বললে ঘর দেয় না, রোজই খদ্দের থাকে।”
”ভালো ইনকাম করে।”
”তোকে কিন্তু তখন এমনিই ঠাট্টা করে বলেছিলুম, তুই যে চটে যাবি…”
”মোটেই চটিনি বরং বলব ভাবছিলুম ওর ঠিকানাটা নিয়ে রাখব।”
