আবার রত্নাকে তার মনে পড়ল। লম্বা ভারী চেহারা, বাহু, গলা, কাঁধ, ঊরুর পুরুষালি পেশী, বড়ো কিন্তু দৃঢ় স্তন ও নিতম্ব এসবই একদা প্রচুর ট্রেনিং থেকে গড়ে ওঠা। ওকে কি ”গরম ধরনের” বলা যায়? শরীরের থেকেও ভোঁতামি এবং রুচি মার্জনার অভাবের জন্যই রত্না হয়তো খোলামেলা হয়ে ওঠে। ওর খবর নেওয়া দরকার।
”আপনার ভাই টাকা দিয়ে মিটিয়ে ফেলতে চেয়েছিল, ওরা রাজি হয়নি।”
”কেন হল না?”
”ওরা বিয়ে চায়।”
হাসিকে তার মনে পড়ল। বিয়ের আগেই পেটে বিভু এসেছিল। বিয়েও হল কিন্তু কি জীবনের মধ্যে হাসি নিজেকে ঠেলে দিল? রত্নারও এইরকম একটা ঘটনা আছে। দুজনের জীবনযাপনের বা চিন্তার ধরনে কি তফাত! রত্নার জন্য কেউ কষ্টভোগ করছে না।
”আপনার ভাইয়ের জন্য তো বিয়ের চেষ্টা হচ্ছে।”
”তাও জানেন?”
”এটা অনেকেই জানে।”
”আমি একটা ফোন করব, জরুরি।”
ওদিক থেকে যে রিসিভার তুলেছে তার চাপা গলা সন্দীপ শুনতে পেল, ”রত্না গড়াইয়ের ফোন, ডেকে দিন।”
নিছকই খোঁজ নেবার জন্য ফোন করা অফিসে কোনো খবর পাঠিয়েছে কিনা। কিন্তু ও যে আজ বেরোবে এটা কল্পনার বাইরে। অন্তত পাঁচদিন শুধু বিছানাতেই শুয়ে থাকার কথা।
”হ্যালো, কে?
”সন্দীপ, কেমন আছ?”
”স্প্রেন হয়েছে, হাতটা তুলে রেখেছি গলায় ব্যান্ডেজ ঝুলিয়ে…আর বিশেষ কিছু নয়।”
”ব্যথাট্যথা?”
”একটু হয়েছে, চেয়ারে বসতে কষ্ট হচ্ছে…ওসব জায়গায় মেয়েদের কিছু লাগে না।”
সন্দীপ কল্পনায় দেখতে পেল রত্নার পাশের চেয়ারে বসা লোকটি একবার মুখ তুলে তাকাল এবং চোখ নামাবার সময় দৃষ্টিটা ঘষড়ে নিল নিতম্বে। রত্না ফোনেও মৃদুস্বরে কথা বলে না।
”এক্সরে করেছ?”
”ডাক্তার বলেছিল…অত পয়সা কোথায়?”
”সে ভাবনা আমার।”
”থাক, অত আদিখ্যেতায় দরকার নেই…আজ বেরোন হবে না, সোজা বাড়ি যাচ্ছি।”
”কেন?”
”দাদাদের হুকুম, একটু-আধটু তো মেনে চলা উচিত, ওদের গলগ্রহ হয়েই তো থাকতে হবে।”
”কাল কী বলেছ বাড়িতে?”
”যা শিখিয়ে দিয়েছিলে, পাতাল রেলের গর্তে। তাইতেই তো সন্ধ্যের আগে বাড়ি ফেরার অর্ডার জারি হয়েছে।”
”তাহলে কবে দেখা হবে? তুমি ঠিক বলছ সিরিয়াস কোনো ইনজুরি হয়নি?”
”ইনজুরির জন্য কোনো জায়গাই আর আমার শরীরে নেই।”
হঠাৎ মৃদু এবং আবেগময় হয়ে উঠল রত্নার স্বর। সন্দীপ করুণা বোধ করল। হাসি তবু একটা কিছু নিয়ে ব্যস্ত রয়েছে, জীবনটাকে আকারে আনার জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
”তাহলে কবে ফোন করব?”
”রোজ। যেদিন বুঝব সাহসী হয়েছ সেদিন বেরোব।”
রত্না ফোন রেখে দিল উত্তরের অপেক্ষা না করে। ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল সন্দীপের মাথার মধ্যে। যদি রত্না ফোনটা না রেখে দিত তাহলে সে বলত, ”ইডিয়ট, সাহস দেখিয়ে তো লাথি খেয়েছ, এই সাহসে লাভ কি?”
সাহস! সে যখন অফিস থেকে বেরোল তখন রাগটা চক্রবৃদ্ধি হারে তিনগুণ বেড়েছে। প্রচুর তর্ক মনে মনে হয়ে গেছে রত্নার সঙ্গে। সাহস যে কী ভাবে দেখাবে তার একটাও উপায় সে খুঁজে পেল না। সাহস মানে মারামারি, গায়ের জোর দেখানো, বিপদ বা মৃত্যু থেকে কাউকে উদ্ধার? হাসি সাহস দেখিয়েছে, পানু পারেনি। হাসিকে বিয়ে করার বদলে নিজে বিয়ে করে বসল দাদার প্ররোচনায়।
মানুর বিয়ে করার সাহস নেই, টাকা ঘুষ দিয়ে পিতৃত্বের দায় এড়াতে চায়।
বাণীর সাহস নেই উদাসীন অপ্রেম সহবাস দেওয়ার জন্য স্বামীকে ত্যাগ করার।
কাকার সাহস নেই নিজের বিশ্বাসকে পরীক্ষা করানোর, একতলার ঘর থেকে বেরিয়ে জানোয়ারের মতো রাস্তায় এসে চোখ মেলে তাকানোর। গুহার মধ্যে জানোয়ারের মতো জীবন কাটানোকেই আদর্শ করে প্রায়শ্চিত্তের ভান এবং তাকে স্বীকার করতে ভয় পাওয়া।
প্রত্যেকেরই একটা না একটা সমস্যা, প্রত্যেকেরই সামনে সাহস দেখাবার সুযোগ সাজানো রয়েছে অথচ তার জন্য কিছুই নেই। না সমস্যা না সাহসী প্রতিপন্নের কোনো উপায়। অলকা যদি সমস্যা তৈরি করে দেয় তাহলে সে বাঁচে কিন্তু ও এত নিস্পৃহ, এত দূরত্ব রাখে সংঘর্ষ এড়াতে!
বিতৃষ্ণা আর বিরক্তি নিয়ে সে মৌলালির মোড়ের কাছে চারতলা একটা পুরনো বাড়ির সিঁড়ির পাশে পলেস্তারা খসা দেয়ালে ছোটো ছোটো সাইন বোর্ডের মধ্যে প্রণবেশের প্রতিষ্ঠানের নামটি খুঁজে বার করল। তাকে তিনতলায় উঠতে হবে।
একটি মাঝারি ঘর, তার মধ্যেই দেয়াল ঘেঁষে প্লাইউড ও ঘষাঁকাচের দেয়ালে ঘেরা ছোটো এক ঘর। ছুটি হয়ে গেছে। দরজা থেকে সন্দীপ দেখল তিনটি টেবিলে অগোছালো কাগজপত্র, খাতা। কর্মচারীরা নেই। শুধু কোণের টেবিলে একটি স্ত্রীলোক টাইপ করে যাচ্ছে। ঈষৎ গোলমুখ, গৌরবর্ণা, শীর্ণকায়া, কপালটি ছোটো। জিজ্ঞাসু বড়ো চোখে তাকাল তার দিকে। এই বোধহয় সাবু।
”প্রণবেশ আছে কি?”
আঙুল দিয়ে ছোটো ঘরটি শুধু দেখিয়েই টাইপ শুরু করল। দরজা বন্ধ, সে শুনতে পাচ্ছে ভিতরে কথার শব্দ। দরজায় টোকা দিয়ে সে আবার তাকাল টাইপরত স্ত্রীলোকটির দিকে।
”কে?”
দরজা ঠেলতেই, তার চোখে পড়ল টেবলে মুঠো রেখে হাতা গোটানো পাঞ্জাবি পরা একটি লোককে, মুখটি চ্যাপটা, থুতনি ও ঘাড়ে চর্বির ভাঁজ, বুক পকেট ফুলে আছে কাগজের চাপে।
পাল্লাটা আর একটু খুলতে টেবলের অপর ধারে প্রণবেশকে দেখা গেল। কয়েক সেকেন্ড বিস্ময়ে থেকে সে প্রায় চেচিয়ে উঠল, ”আয় আয়, বোস। কালকেই তোর কথা কীসে যেন মনে পড়ল…হ্যাঁ মনে পড়েছে, এক জায়গায় তর্ক হচ্ছিল…চেয়ারটা টেনে নে, আমার ছোটো ব্যবসা ছোটো অফিস, একটু কষ্ট করেই বসতে হবে, গুলোদা আর একটু সরে বসুন, এ হচ্ছে আমার ছোটোবেলার বন্ধু সন্দীপ আর এই হচ্ছে গ্রেট গুলোদা, তোকে বোধহয় এর কথা একবার বলেছি।”
