”অনু, অনুপ্রভা…না না অনুপ্রিয়া বোধহয়, আমরা তো অনু অনু বলেই ডাকি, একদমই কি বোঝা যাচ্ছে না?”
”যাচ্ছে, তবু শিওর হওয়াই ভালো, ভুল নাম বেরিয়ে গেলে…”
”আমি আজই গিয়ে জেনে আসব।”
”আর একটা ফোটোও আনবেন। যেটা দিয়েছেন, আমার ভাই বলল, ছাপায় ভালো আসবে না, কালোর অংশটা বড় বেশি জ্যাবড়া হয়ে যাবে।”
”বেশ। আজই যাব।”
মনে হচ্ছে লোকটি যেন খুশিই হয়েছে শালীর বাড়িতে যাবার অজুহাত পেয়ে।
”আমার বন্ধুটির কিছু কি করা যায়?”
ঠিক এই সময়ে আবার কথাটা পাড়ার যে কি তাৎপর্য লোকটাকে সেটা স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেওয়া দরকার। শালীর মেয়ের সংগীত প্রতিভার খবর ছাপানোর জন্য মূল্য ধরে দিতে হবে, এটা জানুক। পনেরো সেকেন্ডের বেশি নিশ্চয় লাগবে না। কথাটা বলতে। এত কম সময়ে কোনো ডাকাতি কি সম্ভব?
”বলছিল আপনার সঙ্গে একটু দেখা করবে, আমি বলেছি অফিসে তো খুব ব্যস্ত থাকেন, বাড়ি গিয়ে দেখা করাই ভালো।”
”হ্যাঁ হ্যাঁ, অফিসে এত ঝামেলা যে…বলবেন আটটার পরই যেন যায়…শুনলুম আপনি আজ নাকি একটা ব্যাঙ্ক ডাকাতিতে পড়েছিলেন!”
”এমন কিছু নয়, সামান্যই।”
”কোনো ক্যাজুয়ালটি হয়নি?”
”না না, টেলিফোনের তার ছেঁড়ার জন্য শুধু ভোজালিটা একবার…তাছাড়া ভেরি পিসফুলি কাজ হয়েছে।”
”কত নিয়েছে…অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে জানা সম্ভব নয়। হিসেব করতে কিছুক্ষণ সময় লাগবে…আচ্ছা ডিটেইলে পরে শুনব, ছবি আর নাম কালই দোব আর বলে দেবেন আটটার পর।”
ঘড়িটা হাতে থাকলে সময় দেখে রাখত এই কথাবার্তার জন্য কতটা সময় গেল, সম্ভবত দুমিনিট। প্রণবেশ কতটাকা লাভ করবে এই দু মিনিটের জন্য? আজই ওর অফিসে গিয়ে জানিয়ে এলে মন্দ হবে না। সন্দীপ সময় দেখার জন্য হাত তুলেই নামিয়ে নিল। জানি নেই, তবু ভুল করায় অভ্যাস, সে বিরক্ত হয়ে এটা ভাবতেই রত্নাকে মনে পড়ল।
নিশ্চয় আজ ও অফিসে আসবে না। যা চোট পেয়েছে হয়তো কয়েকদিনই আসবে না। সন্দীপের মনে গত সন্ধ্যার কয়েকটা দৃশ্য দ্রুত ভেসে উঠল। দৃশ্যগুলো তাকে অবাক করল প্রচণ্ডতার এবং বোধরহিত কাজের জন্য। রত্না অযথা বাধা দিল, এজন্য হয়তো খুনও হতে পারত।
আজ এবং গতকাল সে নিষ্ক্রিয় থেকেছে, কোনো ঘটনাতেই জড়ায়নি। তবু এক ধরনের চাঞ্চল্য বা সাহস তার মধ্যে নিশ্চয় জন্মেছে নয়তো এমন স্বচ্ছন্দে পারচেজিং কন্ট্রোলারকে মিথ্যা কথা বলল কী করে যে প্রণবেশকে সে বাড়ি গিয়ে দেখা করতে বলেছে! লোকটা ঘুষ খায় সবাই জানে, কিন্তু মুখোমুখি সেটা জানিয়ে দেওয়ার সাহস হঠাৎই যেন এসে গেল। সেও কি ডেসপ্যারেট হয়ে যাচ্ছে?
টেলিফোনটার কাছে পৌঁছতেই পিছন থেকে অফিসেরই একজন ডাকল, ”সন্দীপবাবু কাল নাকি আপনাদের বাড়ি অ্যাটাক হয়েছিল?”
”কে বলল?”
”এসব খবর ঠিকই কানে আসে, অত বড়ো ফুটবলারের বাড়িতে কিছু হলে সঙ্গে সঙ্গে রটে যায়।”
”তা কী কী খবর আপনার কানে এল”?
”রেগে যাচ্ছেন কেন, কাকার মাথা ফেটেছে এটুকুও জানি। আরে শুভদীপ মিত্তির লাউ শাক দিয়ে না পুঁইশাক দিয়ে ভাত খেয়েছে তাও হাজারখানেক লোক খবর রাখে।”
ঘরের দক্ষিণ প্রান্তে তারা বসে, কদাচিৎ কথা হয়। গত পাঁচবছরে দশটি বাক্য বড়জোর বিনিময় হয়েছে। হঠাৎ অযাচিত কথা এবং ঈষৎ বাঁকা স্বরে বলায় তার মাথা গরম হয়ে উঠেছে।
”কাল আপনার ভাই বাড়ি ফেরেনি রাতে।”
”হবে, আমি খোঁজ রাখি না।”
”কোথায় ছিল জানেন?”
কৌতূহলী হল সন্দীপ। মানু সম্পর্কে তার কোনো আবেগ নেই তবে গল্প শুনতে কার না ভালো লাগে।
”জানি না, কোথায় ছিল?”
”আমাদের পাড়ায় একটা বাড়িতে, প্রায়ই ওখানে রাতে থাকে। মা আর মেয়ে..মেয়েটি এখন প্রেগনান্ট, শুভদীপ মেন্টাল ট্রাবলের মধ্যে, যদি বেরিয়ে আসতে না পারে তাহলে ওর কেরিয়ার শেষ। এসব আপনি বোধহয় জানতেন না?”
”না তো।”
”আপনার মাকে চিঠি দিয়ে সবই জানিয়েছে মেয়েটির মা, বিয়ে দেবার জন্য চাপও দিয়েছে।”
”আমি এসব জানতুম না, জানতে চাইও না। আমরা আলাদা থাকি কাজেই…”
”তাও জানি।”
কতদূর পর্যন্ত জানে বাইরের লোকেরা তাদের পারিবারিক সম্পর্ক? মানুর খ্যাতি তার বা পানুর ব্যক্তিগত জীবনকে একদমই স্পর্শ করে না বটে কিন্তু হাজার হাজার কৌতূহল, খবরাখবর রাখার চেষ্টা তাদের ব্যক্তিগত জীবনের উপরতল থেকে কতটা চুঁইয়ে নেমেছে সেটা জানা দরকার। সাবধান হতে হবে।
”মা কি জবাব দিয়েছে?”
”কিছুই দেননি। তবে…”
লোকটি দুপা এগিয়ে তার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে মুখ ঝুঁকিয়ে ফিসফিস করল, ”খাণ্ডার মেয়েমানুষ, আপনাদের বাড়িতে গিয়ে ঝামেলা পাকাবার মতলবে আছে। আমার বউ ওদের বাড়ি মাঝেমধ্যে যায়, তার কাছেই শোনা, বিয়ে দিয়ে ছাড়বে নয়তো কোর্টে যাবে। এটা জানিয়ে দেবেন আপনার মাকে।”
মানু কোথায় ফ্ল্যাট কিনেছে, ওরা বাড়ি ছেড়ে সেখানে চলে যাবে আর তার মূলে বোধহয় এই কারণটাই। ওর বিয়ের জন্য চেষ্টা হওয়ার পিছনেও এই কারণ। কিন্তু সন্দীপের এটা ব্যক্তিগত বিপদ নয় এজন্য সে উদ্বেগ বোধ করল না। ব্যাঙ্ক ডাকাতির মতো এটাও একটা সিনেমা।
”মানু কী বলছে?”
”বোধহয় রাজি নয় আবার রাজিও। বুঝলেন না মেয়েটা খুব সেক্সি আর খেলাটেলা করে যারা তারা তো খুব গরম ধরনের হয়, ছাড়তেও চায় না আবার বিয়ে করার মতো ঘরও নয়, ফাঁপড়ে পড়েছে।”
