”এরা কি গুলি করবে?”
”কী দুঃখে বুলেট নষ্ট করবে?”
লোকটির বোকার মতো কথায় সন্দীপ বিরক্তি প্রকাশ করল। ”আপনি কি বাধা দেবেন?”
”একদমই নয়।”
”তাহলে ভয় পাচ্ছেন কেন?”
”যদি কেউ হঠকারিতা করে বসে!”
”তাহলে গুলি করবে।”
লোকটির মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সন্দীপ নিজেও যথেষ্ট উত্তেজিত তবু ক্ষীণভাবে একটা হালকা সুখ বোধ করল। চব্বিশ ঘণ্টাও হয়নি, দুটো এমন ঘটনার মধ্যে সে পড়ল যার মধ্যে মিল থাকলেও, এই মুহূর্তের ঘটনাটিকে সিনেমা দেখার মতো উপভোগ করতে পারছে, আর্থিক ক্ষতি বা দৈহিক পীড়ন হচ্ছে না। পুরো ব্যাপারটা কেমন যেন বানানো, হাস্যকর লাগছে, অথচ সত্যি।
দ্রুত চলাফেরার, অস্ফুট কয়েকটি নির্দেশ বাক্যের, চেয়ার সরানোর এবং ম্যানেজারের কাঠের দেওয়ালের ঘরটির ভিতর থেকে রুক্ষ কিছু টুকরো কথা ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। শুধু একবার ধমক শুনল, ”ভল্টের চাবি চেনেন না?…হারি আপ।”
কতক্ষণ সময় কাটল। পাঁচ, দশ, কুড়ি মিনিট? অভ্যাসবশে হাতটা তুলল, তারপর মুখ ঘুরিয়ে দেয়াল ঘড়িটা দেখার চেষ্টা করল।
”এদিকে তাকাবার কী আছে?”
ধমকটায় রূঢ়তার সঙ্গে ত্রাসও মিশে আছে। সন্দীপের মনে হল, কাল রাতেও সে এই ধরনের ভয় ওদের গলায় পেয়েছিল।
”হঠকারী হবেন না দয়া করে।”
”এ শালার ব্যাঙ্ক লুট হওয়াই উচিত।”
”ইন্সিওর করা, ব্যাঙ্কের কিছু লোকসান হবে না।”
”কত টাকা নেবে মনে হয়?”
”দু লাখ?”
”মাত্র!”
”কাল কাগজেই পেয়ে যাবেন সব কিছু।”
বিস্ময়ের ধাক্কাটা কাটিয়ে এরা স্বাভাবিক হয়ে আসছে। হালকা পায়ে ছোটার শব্দ এবং কোলাপসিবল দরজাটা খোলার এবং টেনে বন্ধ করার শব্দের সঙ্গে সঙ্গে কে বলে উঠল, ”ওরা চলে গেল।” বাইরে মোটর এঞ্জিনের শব্দ উঠল এবং দূরে চলে গেল শব্দটা।
”পুলিশে…পুলিশে খবর দিন…পাশের বাড়িতে দেখুন টেলিফোন আছে।” চিৎকার করতে করতে একটা লোক ছুটে বেরিয়ে গেল।
একসঙ্গে প্রায় চল্লিশজন লোক ব্যস্ত হয়ে পড়ল কথা বলার জন্য। সন্দীপ ঘড়িতে দেখল ঠিক দুটো। প্রায় বারোমিনিট সে দেয়ালের দিকে তাকিয়েছিল, এটা তার জীবনে প্রথম।
”আমার ছেলেটা আজ ইন্টারভিউ দিতে যাবে বোম্বাইয়ে।”
সন্দীপ কথা না বলে ভিড় কাটিয়ে বেরিয়ে এল। এবার পুলিশ আসবে, জেরা হবে। কতক্ষণ বসে থাকতে হবে কে জানে। তার কিছুই বলার বা জানানোর নেই, কিছুই সে দেখেনি, একমাত্র লম্বাটে মুখ, রোগা একটি কিশোর, যার মতো লাখখানেক এই কলকাতায় খুঁজে পাওয়া যাবে।
সেলুনের মধ্যে বেঞ্চে প্রভাত ঘুমোচ্ছে দরজার একটা পাল্লা বন্ধ করে। তার একবার ইচ্ছা হয়েছিল ওকে জাগিয়ে তুলে বলে, ”হয়েছে, এবার নিশ্চিন্ত হও।”
রাস্তা পার হয়ে সে বাস স্টপে দাঁড়াল। মুরারি তার দোকান থেকে ঝুঁকে গোলমালের কারণটা বুঝতে চেষ্টা করছে। সন্দীপ যখন বাসে উঠল তখন ঊর্ধ্বশ্বাসে একটা পুলিশের গাড়ি এসে থামল।
”আপনাদের থেকে ডাকাতদের ডিসট্যান্স কতটা ছিল।”
”সামান্যই, বড়জোর দু হাত।”
অফিসে সন্দীপের টেবিল ঘিরে জনাদশেক।
আজকের মতো কাজ শেষ, এটা সকলেই ধরে নিয়েছে। এমন রোমহর্ষক ঘটনার জ্যান্ত সাক্ষীর মুখ থেকে বিবরণ শোনার সুযোগ কদাচিৎ মেলে।
”আপনার কি ইচ্ছে করেছিল রিভলভারটা কেড়ে নিতে?”
”কী আজেবাজে বকছিস, কেউ কি তখন এসব পাগলামোতে যায়, সন্দীপদা ঠিক কিনা?
”নিশ্চয়, আমার তো ওসব মনেই হয়নি।”
”আজকালকার ছেলেরা বড় ডেয়ারডেভিল, কখন যে চালিয়ে দেবে।”
”অ্যাম্বাসাডারটার রং নিশ্চয় কালো ছিল?”
”না, হালকা নীল।”
”তাহলে ডাকাতরা স্ট্র্যাটেজি বদলেছে। কাগজে তো বরাবর গাড়ি কালো রঙেরই লেখা হয়।”
”কেন, সেদিন তো যে ডাকাতিটা হল এন্টালিতে সেটায় তো সাদা অ্যাম্বাসাডারে এসেছিল।”
”রাখুন সাদা-কালো, সন্দীপবাবু যা বলছে সেটা আগে শুনুন না…তাহলে ওদের বয়স কুড়ি-বাইশ বলে মনে হল?”
”একজনকে তো আরও কম লাগল।”
”এখন এই বয়সের ছেলেরাই এসব শুরু করেছে, সোশিও-ইকনমিক প্রব্লেম যে কোথায়..একটু রাত হলে পাড়ায় ঢুকতে ভয় করে, প্রায় রোজ ছিনতাই হচ্ছে।”
”এর থেকেও মারাত্মক মশাই গণ-পিটুনি। পড়েছেন তো, ছেলেধরা বলে ওপেন ডেলাইটে একটা লোককে পিটিয়েই মেরে ফেলল…কলকাতা শহরে!”
”রাখুন ছেলেধরা…তাহলে বলছেন সবার হাতে রিভলভার ছিল, মাত্র বারো মিনিট টাইম নিল?”
”বেশি সময় নিয়েছে, আরও পাঁচ সাত মিনিট কম হওয়া উচিত ছিল। খড়দায় চারমিনিটে ডাকাতি করেছে, এটাই এখন পর্যন্ত রেকর্ড টাইম।”
”রেকর্ড মানে কলকাতার রেকর্ড কিংবা ইন্ডিয়ার। ওয়ার্ল্ড রেকর্ড হয়েছে ভিয়েনায়, আড়াই মিনিট। প্রায় সত্তর লাখ টাকার মতো লুট করেছিল।”
”ইসস, আড়াই মিনিটে সত্তর লাখ। মিনিটে প্রায় তিরিশ লাখ।”
”খড়দায় চারমিনিটে দেড়লাখ। সারা জীবনে একজন যা আয় করে চার মিনিটে তাই করল।”
”সন্দীপবাবু কী করলেন আর জীবনে, আসুন একটা ডাকাতি-টাকাতি করি।”
”আমি আসছি।”
সন্দীপ উঠে পড়ল। মেয়েটার আর তার সংগীত গুরুর নামটা জেনে নেওয়া দরকার। ছবির কথাও বলতে হবে। টোকা দিয়েই হাতল ঘুরিয়ে পারচেজিং কন্ট্রোলারের ঘরে সে ঢুকল।
”আসুন আসুন, আপনার কথাই ভাবছিলুম। নামটা লিখে এনেছি।”
কাগজের একটা টুকরো বুক পকেট থেকে বার করল।
”আপনার শালীর মেয়ের নামটা ঠিক বুঝতে পারছি না, এমন জড়ানো লেখাটা…”
