কিন্তু মার সঙ্গে কথা বলা মানে এই উষ্ণতাকে নষ্ট করা। তাহলে আর কার কাছে যাওয়া? রত্না সম্ভবত অফিসে আসবে না। কেউ তার জন্য আশা করে নেই, কেউ না। কারুর কাছে গেলেই সে ভাববে ব্যাপারটা কী! লোকটা কী চায়? এই গরমে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানোও সম্ভব নয়।
সন্দেহ নেই এই কলকাতা তার বাল্যের, কৈশোরের শহর যেখানে চারদিক থেকে জীবনটাকে ঘিরে ধরে আটকে দেওয়া, যেখানে করার মতো একটিই কাজ শুধু পারা যায়, একঘেঁয়েমিকে লালন।
সন্দীপ ঘরে এসে বিছানায় শুয়ে পাশবালিশ জড়িয়ে ধরল। কিছুক্ষণ সে ঘুমোবে। ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলতে হবে অফিস যাওয়ার আগে। অলকা প্রশ্ন করার সুযোগ পাবার আগেই সে হাতঘড়ি কিনে ফেলতে চায়।
সে ঘণ্টাদুয়েক ঘুমিয়েছিল। তখনই বাণী ভাত রেখে গেছে। স্নান খাওয়া সেরে চেক লেখার সময় টাকার অঙ্কটা নিয়ে বিব্রত হল। হুবহু আগের ঘড়ির মতো একটা কিনতে এখন কত টাকা লাগবে, সে সম্পর্কে তার ধারণাই নেই। প্রায় দশবছর আগে বোধহয় দুশো দশ টাকার মতো পড়েছিল। এখন তাহলে কত হবে! সে চারশো টাকা লিখতে গিয়ে পাঁচশো লিখল।
প্রভাতের সেলুনের পাশেই ব্যাঙ্কের দরজা। ঢুকেই বাঁ দিকে কাউন্টারের সারি। ছোটো শাখা, কর্মচারী জনাকুড়ি।
দরজার কাছ থেকেই সে তুমুল ঝগড়া-চিৎকারের আওয়াজ পেল। বিদ্যুৎ নেই, আলো পাখা বন্ধ। কর্মচারীরা কাজ করবে না জানিয়ে বসে আছে। কাউন্টারের বাইরে অন্তত পনেরোটি লোক একসঙ্গে মারমুখো হয়ে চেঁচাচ্ছে।
”আমরা কিছু জানি না মশাই, ম্যানেজারকে গিয়ে যা বলার বলুন, বলেইছি তো আলো না হলে আমরা কাজ করব না।”
”কেন এই আলোতে কি কাজ করা যায় না?”
”না যায় না, টাকা নিয়ে আমাদের কাজ করতে হয়, যদি এধার ওধার হয়ে যায় আমার পকেট থেকে দিতে হবে…কেন আমি রিস্ক নোব? তখন আপনি এসে কি আমার হয়ে টাকা দেবেন?”
”দয়া করে একটু উপকার করুন না দাদা, আমার ছেলে আজ বোমবাই যাবে ইন্টারভিউ দিতে, টাকা না হলেই নয়।”
”আপনি ম্যানেজারকে বলুন…ছ’মাস ধরে আমরা আলোর ব্যবস্থা করতে বলছি। হচ্ছে, হবে, হেড অফিসের স্যাংশন আসেনি, এইসব বাহানায় দিন কাবার হয়েছে। আজ আমরা বদ্ধপরিকর কোনো কাজ করব না। গড়িয়াহাট ব্রাঞ্চে মশাই লোডশেডিংয়ের সময় একজন দুশো টাকা ওভার পেমেন্ট করে ফেলেছে…বুঝি আপনাদের…”
”ঘোড়ার ডিম বোঝেন।”
সন্দীপ কোলাপসিবল দরজার কাছেই দাঁড়িয়েছিল। দেখল মাঝবয়সি স্থূলকায় একটি লোক কাউন্টারের শিক দু হাতে ধরে চিৎকার করে উঠল।
”বাজে অজুহাতে, ছুতোয় আপনারা কাজ বন্ধ করে কত লোকের সর্বনাশ করছেন জানেন? এই আলোয় আলবাত কাজ করা যায়। ম্যানেজার কোথায়?”
”পিটিয়ে চামড়া তুলে নিলে তবেই…”
”কে পেটাবে, কই দেখি…”
কাউন্টারের ভিতর থেকে বলিষ্ঠ এক যুবা লাফিয়ে উঠে বাইরে আসার জন্য এগোতেই সহকর্মীরা তাকে ধরে ফেলল।
”কুণ্ডু থাক থাক, ঝামেলা করে লাভ নেই।”
”চামড়া তুলবে বলল আর চুপ করে তা হজম করব?”
ভিতরে মৃদু একটা ধস্তাধস্তি এবং ”ছেড়ে দে, কেমন চামড়া তোলে দেখব”, বারংবার তর্জনের সঙ্গে সঙ্গে কাউন্টারের বাইরের জনতা থেকে, ”আসুক না, পিটিয়ে লাশ ফেলব”, পালটা হুংকারের মধ্যেই সন্দীপ দেয়াল ঘড়িতে দেখল দুটো বাজতে বারো। আর অপেক্ষা করে লাভ নেই, আজ আর টাকা তোলা যাবে না, এই সিদ্ধান্তে সে পৌঁছল।
”দাদা আমার ছেলেটা আজ…”
”যে যেখানে আছেন থাকুন, নড়বেন না।”
সন্দীপ লক্ষই করেনি, তার পাশ দিয়েই এরা কখন ঢুকেছে। রিভলভারটা সামান্য ডাইনে বাঁয়ে নাড়ে যুবকটি, পরনে কালো প্যান্ট, সাদা গেঞ্জি শার্ট দোহারা গৌরবর্ণ, যার মুখের নিম্নাংশ সাদা রুমালে ঢাকা। মুহূর্তে নীরবতা গ্রাস করল ঘরটিকে। প্রত্যেকটি লোকের চোখ বিস্ময়ে বিস্ফারিত। দেহগুলি টানটান। কেউ ঠোঁট চাটছে, কারুর কণ্ঠনালি ঘন ঘন ওঠানামা করছে। ফিসফিসিয়ে শুধু একজন বলল, ”ডাকাত পড়েছে।”
জনাচারেক ছেলে, প্রত্যেকেরই মুখের নিম্নাংশ রুমালে ঢাকা, হাতে রিভলভার, কাউন্টারের ভিতরে চলে গেছে। টেবিলগুলোর মধ্যে যেটি বড়ো এবং একটু তফাতে, তার পিছনে বসা লোকটিকে একজন টেনে তুলল। বোধহয় ক্যাশিয়ার বা অ্যাকাউন্টট্যান্ট।
”সিট থেকে উঠবেন না, যাঁরা দাঁড়িয়ে আছেন বসে পড়ুন, কেউ বুদ্ধিমান হতে যাবেন না।”
দম দেওয়া পুতুলের মতো দাঁড়ানো লোকেরা বসে পড়ল। ভোজালি দিয়ে একজন ঘরের একমাত্র টেলিফোনটির তার ছিঁড়ে দিল।
”টেবলে হাত আর মাথা ঠেকিয়ে রাখুন, চটপট।”
সন্দীপের পাঁজরে খোঁচা লাগল। কোলাপসিবল গেটের সামনে দাঁড়ানো ছেলেটি রিভলভারের নল দিয়ে খুঁচিয়ে তাকে ইশারা করল অন্যান্যদের সঙ্গে গিয়ে দাঁড়াতে। সন্দীপ দেখল ছেলেটির থুতনিতে কিছু রোম, নাকের নিচে গোঁফের রেখা। একমাত্র এরই মুখ ঢাকা নয়।
”এক জায়গায় হোন, ঘুরে দেয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়ান…চটপট।”
একটা ব্যস্ততা দেখা দিল। লম্বা জায়গাটার এককোণে যাবার জন্য ঠেলাঠেলি পড়ে গেল। সন্দীপও দেওয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে ওদের সঙ্গে দাঁড়াল। চোখের সামনে পড়ল হাতে লেখা ব্যাঙ্ক ইউনিয়নের একটা বিবর্ণ পোস্টার যাতে সাত দফা দাবির তালিকা, তার পাশেই ছাপা রঙিন পোস্টার তাতে স্বল্প সঞ্চয়ের জন্য দুটো পরিকল্পনার বিবরণ। দুটো পোস্টার পড়তে পড়তেই সে আড়চোখে দেখল পাশের লোকটি ঠকঠক করে কাঁপছে।
