কিন্তু ধরিয়ে দেওয়ার কাজটা সত্যিই কি সুহাসের? পানুরও কি তাগিদ ছিল না হাসির কাছাকাছি থাকার, বারবার ওকে দেখার, ওর দৃষ্টির সামনে থেকে সুহাসকে আড়ালে রাখার…হাসিকে জিতে নেওয়ার? সেজন্য জেল থেকে বেরিয়ে আসার দরকার ছিল, বিনিময়ে পুলিশকে কিছু দিয়ে।
ছেলে দুটোর সঙ্গে পানুর ভালোই আলাপ ছিল…ক্লাব ঘর থেকেই ওরা ভোর রাতে ধরা পড়ে…কে জানত ওরা দুজন ওখানে থাকবে…চাবি থাকত পানুর কাছে। পাড়ায় সৎ উপকারী ভালো ছেলে হিসাবে পানুর নাম আছে, সুহাসের নেই।
তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার মনে হল পানুর মুখ থেকে রক্ত সরে যাচ্ছে, চামড়া শুকিয়ে মড়মড়ে হয়ে ঝরে পড়ছে, কঙ্কালের ছায়া নেমেছে।
নিজেকে তার দোষী মনে হতে শুরু করল। ‘যদি বেরিয়ে না আসতিস’ কথাটা বলা উচিত হয়নি। আসলে হাসির জন্য এই কথাবার্তা বলার কাজটা নেওয়াই ভুল হয়েছে। পানু তার বাইরের নির্বিকার ভাবটা বজায় রেখে যাচ্ছে। পায়ের উপর অন্য পা অলস ভাবে পড়ে রয়েছে। মুখে কোনো ভাবান্তর নেই। কিন্তু তার মনে পড়ে না, নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে একটা লোকের এই রকম অমানবিক চেষ্টা এত কাছ থেকে কখনো দেখেছে।
তার সন্দেহ হচ্ছে, হিংস্র হয়ে ওঠার মতো একটা আবেগ যেন এখন পানুর মধ্যে ওথলাচ্ছে। এটা তার প্রত্যাশায় কখনোই ছিল না। আর আবেগটা যেন তাকেও ছুঁয়ে যাচ্ছে বিশেষ করে সেটাকে দাবিয়ে রাখায় পানুর সাফল্যের জন্য।
”তুই তো হাসিকে তারপরও বিয়ে করতে কিংবা দুজনে অন্য কোথাও গিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মতো থাকতে পারতিস। তা না করে…অবশ্য আমিই বলেছিলুম বিয়ে করতে, কিন্তু তুই রাজি হলি কেন?”
পানুর যথেষ্ট বয়স, বুদ্ধিও পরিণত। ওর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মতো কথা বলা যায়, এক সময় তারা বলতও।
”ও সুহাসকেই চায়…এটা আমি তখন জানতুম না।”
জানলে কী করত? জেলেই থাকত? কিন্তু জেলের থেকে কি এখন ওর দাম্পত্য জীবন বেশি স্বাচ্ছন্দ্যের হয়েছে? বেচারা বাণী।
”ও কি সত্যি সত্যি তোমায় বলেছে সুহাসকে যেন ক্ষমা করি?”
সন্দীপ মাথা হেলাল। চোয়ালের অবাধ্যতায় কথা বলতে যেন অসুবিধা হচ্ছে এমনভাবে পানু বলল, ”বিভুর সামনে, পাড়ার লোকেদের সামনে সুহাসের সঙ্গে হেসে, হাত ধরে কথা বলতে হবে?”
ওর চোখের দিকে তাকাবার সাহস তার হল না। হাসি এই রকমই চায়, বোধহয় সুহাসই এটা ওর মাথায় ঢুকিয়েছে। ধূর্ত ফন্দিবাজ, অসুস্থ একটা জানোয়ার গুড়ি দিয়ে বাধ্য হয়েছে গর্তে ফিরে আসতে, বউয়ের কাছে ভান করছে অনুতাপ অনুশোচনা। বউকে আশ্রয় দিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করছে আর নিজের ছেলের সঙ্গে জানা-পরিচয় হবার আগেই ফন্দি আঁটছে কী করে বাইরে চারদিকে নিজেকে নির্দোষ দেখানো যায়।
. হাসি যথেষ্ট বুদ্ধিমতী, নিশ্চয়ই বুঝেছে স্বামী তাকে দিয়ে কী করাতে চায়, তবু সে ক্ষমা করে দিতে বলছে। কিন্তু ওকি ওটা বোঝে না, সুহাস বদলাবার লোক নয়, তাকে আবার কেঁচে গণ্ডুষ করতে হবে? ওর কোনো ধারণা আছে কি, ছেলে আর এই রকমের স্বামী নিয়ে ভবিষ্যৎ জীবনটা কী দাঁড়াবে?
”কবে যেতে হবে, সে সব কিছু বলেছে?”
”না, যে-কোনো দিন গেলেই হবে।”
”ব্যাপারটা আর কাউকে বলেছ?”
”না।”
অস্বস্তিকর সময়টা পেরিয়ে গেছে। আপনা থেকেই তার একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। এখন পানু আর তার বিবেকের উপরই ব্যাপারটা ছাড়া রয়েছে।
কিছুক্ষণ তারা নীরবে রইল। তার মনে হচ্ছে এখন পানু যেন ধীরে ধীরে উদ্বেগের চাপ থেকে বেরিয়ে আসছে তার সামনে। পা মৃদু নাড়ছে। মুখটা আকার হারিয়ে টসটসে, সারা অবয়বে কোমলতা, অজ্ঞেয়তা।
”বেশ দেখা করব।” অবশেষে নীচু স্বরে বলল।
কার সঙ্গে দেখা করবে সেটা আর সে জিজ্ঞাসা করল না। রাজি হয়েছে যখন, সুহাসের সঙ্গেও নিশ্চয় দেখা করবে।
সে বিষাদ অনুভব করল। এইমাত্র সে, কেন এবং কীসের জন্য তা না জেনেই এমন একটা লোকের ঘাড়ে যন্ত্রণা তুলেছিল যে তার ভাই। এইমাত্র সে আবিষ্কার করল যে লোকটিকে বরাবরই সমস্যাবিহীন এবং প্রলোভনমুক্ত হিসাবে গণ্য করে এসেছে সে লোকটি দুর্বল এবং মুহূর্তের জন্য যে-কোনো কাজই করে ফেলতে পারে।
পানু আত্মরক্ষার্থে এই বারান্দায় তার সঙ্গে কাটানো সময়টাকে নিশ্চয় ধরে রেখে দেবে সারা জীবন। মধ্যস্থের ভূমিকাটা মন্দ নয়, কোনো আঁচই গায়ে লাগে না। কিন্তু যতবার এই আবেগের লড়াইটা ওর মনে পড়বে, ততবারই ও শুধু তাকেই ভাববে, হাসিকে নয়।
দরজার দিকে পানু এগিয়েছে। সে স্বতঃস্ফূর্ত দাঁড়িয়ে উঠে হাত বাড়িয়ে ওর কনুইটা ধরল কেননা কিছু কথা তার ঠোঁটে এসে গেছে।
”পানু।”
”বলো।”
”তুই যে আমার ভাই, আমার ভালো লাগছে এটা ভাবতে।”
অবাক বিমূঢ় হয়ে পানু তাকিয়ে রইল। আশাই করেনি তার দাদা এতটা বিচলিত হয়ে উঠবে।
”এ কথা বলছ কেন?”
”এটা আমার মনে হল। এই প্রথম আমার সত্যিই মনে হল আমার একটা ভাই আছে।”
খাপছাড়াভাবে ও হাসল। কিছু একটা বলার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে, মাথাটা বার দুই নেড়ে চলে গেল।
সে আবার মোড়ায় বসল। খবরের কাগজটা তুলে চোখ বোলাতে বোলাতে সারাদিনটা কীভাবে কাটাবে তাই নিয়ে বিদঘুটে কিছু চিন্তা তার মাথায় এল, যেমন দোতলায় গিয়ে মা’র সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলা, মোটমাট কোনো একজনের সান্নিধ্য, তাকে উদ্দেশ্য করে কেউ কিছু বলছে এমন একটা স্বর শুনতে পাওয়া, এই ধরনের কিছু এখন তার পেতে ইচ্ছে করছে। কেননা এইমাত্র কোন মন্ত্রবলে, কিছুক্ষণের জন্য হঠাৎ তার সঙ্গে একটা প্রাণের যোগাযোগ ঘটে যাওয়ার অভিজ্ঞতা সে পেয়েছে। যত সামান্যই হোক, তার ফলে যে উষ্ণতা নিজের মধ্যে অনুভব করছে সেটা ধরে রাখতে চায় সে।
