কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল। মানুর জন্য দুঃখে ওরা কেউই গভীরভাবে কাতর নয়। এই ভাইটিকে তারা রক্তের সম্পর্কে গড়া স্বাভাবিক অনুভূতির গণ্ডিতে কখনোই সহজভাবে পায়নি বা সেও আসেনি।
”ও কি খুব ভালো খেলে?”
”জানি না, আমি কখনো দেখিনি। তবে অনেক তো ভক্ত আছে।”
”হ্যাঁ, কাল তো সেই ভক্তরাই…কাল আমার সঙ্গে হাসির দেখা হয়েছে।”
পানুর স্বচ্ছন্দভাবটা মৃদু থেকে মৃদু হতে হতে নিভে গেল। একটু কৌতূহলে তাকিয়ে রইল যেন হঠাৎ এই কথাটা বলার পিছনে কোনো উদ্দেশ্য আছে কিনা বুঝে নিতে চায়।
”তোমার কাছে কি এসেছিল?”
”কাল টিফিনে যাচ্ছিলাম ওদের এম্পোরিয়ামের সামনে দিয়ে, ও তখন বেরোচ্ছিল।”
মনে হচ্ছে পানু বিশ্বাস করল না দেখাটা হঠাৎ হয়েছে, হাসির অভ্যাসগুলো সবার থেকে ওরই ভালো জানা।
”তোমাকে ধরেছে কেন?” তীক্ষ্ন স্বরে ও প্রশ্নটা করল। তাহলে ও বুঝে গেছে হাসি কী চায়।
”তোর কাছে যাবার সাহস পাচ্ছে না।”
”সেইজন্যই আমায় ডেকেছে?”
”না না, এটা একটা মাত্র কারণ। ছবিটা আর লেখা আর কাকার ব্যাপারে…”
নীরবতা এল কিছুক্ষণের জন্য এবং সেটা ভরে রইল রাস্তার যানচলাচলের শব্দে।
”কী বলতে বলেছে?”
ভাইয়ের সঙ্গে নিজের পার্থক্যটা এমন স্পষ্ট ভাবে আগে সে কদাচিৎই অনুভব করেছে। এমনকি ওর গলার স্বর, যা বাল্যে কৈশোরে প্রতিদিনই শুনে এসেছে, তাও এখন মনে হচ্ছে অপরিচিত লোকের। ওকে খুঁটিয়ে সে লক্ষ করল। কোনো চেহারার মিল চোখে পড়ল না। বাইরেতে ও স্থির শান্ত। যদি কোনো অশান্তি থাকে, তাহলে সেটা রয়েছে ওর ভিতরে।
”সুহাস তো ফিরে এসে রয়েছে হাসির কাছেই।”
”হ্যাঁ।”
”শুনলুম শরীর খুব খারাপ, একদম নাকি চেনাই যায় না।”
পানু পায়ের উপর পা তুলে দিল এবং সে লক্ষ করল ওর পায়ের নখগুলো দীর্ঘ এবং তাতে ময়লা জমে।
”বেশ!” শুকনো স্বর। নিরাসক্ত থাকার জন্য ও চেষ্টা করছে।
”সুহাসের চিকিৎসার জন্য হাসিকে এখন খুব ব্যস্ত মনে হল।”
”বিভু কী বলছে তার বাবা সম্পর্কে?”
”জানি না, তবে হাসি নিশ্চয় মানিয়ে নেবে…বাপ-ছেলের মধ্যে সম্পর্কটা যাতে ভালো হয় সেই চেষ্টা তো করবেই।”
”ছেলে কি কিছু জানে না, পাড়ায় থাকে যখন কানে কি কিছু যায়নি?”
”হাসি সইয়ে দেবে আস্তে আস্তে। সেজন্যই ও চায় তুই সুহাসের সঙ্গে গিয়ে কথা বল, বিভু সেটা দেখুক, তাহলে বাপ সম্পর্কে ধারণাটা বদলাবে।”
”কী সই য়ে দেবে? বাপের অতীত কীর্তিকলাপ? আমি কথা বললেই সব ঠিক হয়ে যাবে?”
”দ্যাখ পানু, যেভাবে তুই কথা বলছিস তাতে আমার পক্ষে কিছু বলা মুশকিলের হয়ে পড়ছে। হাসিকে আমি বলেছি, ওর হয়ে তোকে অনুরোধ করব।”
”রাস্তায় দাঁড়িয়ে বলেছে?”
”প্রায় তাই-ই। অবস্থাটা সামাল দেবার জন্য ও যথেষ্ট চেষ্টা করছে, তেজি মেয়ে, ভেঙে পড়েনি। তুই ভালোই জানিস যে সবকিছু সত্ত্বেও সুহাসকে ও এখনও ভালোবাসে।”
”ও এইকথা তোমায় বলল?”
”হ্যাঁ। দু-তিনবার বলল, সারাজীবন ধরে মানুষ মাশুল গুণবে, দাম চোকাবে, মূল্য দেবে তা হতে পারে না, একটা সময় আসে যখন সব শোধ হয়ে যায়। সুহাস তার শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে।”
তার মনে হল মোটামুটি হাসির বক্তব্যটা সে বলতে পেরেছে।
”সেই জন্যই কি ফিরে এসেছে?”
গলার স্বর নীচু হলেও চিবিয়ে বলার ধরনটা এমনই আক্রমণাত্মক যে জবাবটা দ্রুত না দিয়ে সে পারল না।
”মানুষকে ক্ষমা করতে শেখ পানু। ভুলে যাস কেন মানুষ মাত্রেই দোষে গুণে…ক্ষমা মানুষের ধর্ম…”
সে নেমে গেল। এসব কী আবোল-তাবোল প্রাগৈতিহাসিক কথা সে বলতে শুরু করেছে! পানু বাচ্চচা ছেলে নয়, লেখক হবার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে।
পানু বিস্মিত চোখে তাকিয়ে যেন হঠাৎ সে তার দাদার মধ্যে অপরিচিত একটা লোককে দেখতে পেয়েছে। কিছু না বলে চোখটা আকাশের দিকে তুলে একটা বড় শ্বাস ফেলে নামাল।
”তুমি বুঝতে পারছ কি বিপদ হতে পারে?”
”কার বিপদ?”
”বিভুর কথাই ধরো। লোকে অনেক কিছু ওর বাপ সম্পর্কে বলাবলি করেছে, সেগুলো শুনেছেও। কিন্তু শোনা এক কথা আর চাক্ষুষ রক্ত-মাংসে বাপকে দেখা, তার অধঃপতন লক্ষ করা, তার পাশাপাশি দিন কাটানো সস্মূর্ণ অন্য ব্যাপার।”
”বিভু যথেষ্ট বড়ো হয়েছে।”
”হাসির কথাটাই ধরো। ভালো মন্দ যাই হোক মোটামুটি সে গত আট-দশ বছরে নিজের জীবনটাকে গুছিয়ে ফেলতে পেরেছে, আঘাত সামলে নিয়েছে। কিন্তু ছ মাস, এক বছর পর যখন সুহাস সেরে উঠবে তখন কী হবে? নিশ্চয় ভিজে বেড়ালটি হয়ে থাকবে না। আবার সেই আগের মতো ফিটফাট বাবুটি হয়ে, নিজেকে চারদিকে দেখিয়ে, বড়ো বড়ো কথা বলে বেড়াতে শুরু করবে।”
”তাহলে আর কী করা যাবে?…এক্ষেত্রে ঝঞ্ঝাট চোকাতে ওকে মরতে দেওয়াই ভালো।”
”চুপ করো।”
এবার তার পালা বিস্মিত চোখে তাকিয়ে ভাইয়ের মধ্যে অপরিচিত লোক খোঁজা।
”সুহাস তোকে সরাতেই চেয়েছিল। তোর পেটে নাকি মাঝে মাঝে এখনও ব্যথা হয়। তুই যদি তখন বেরিয়ে না আসতিস…”
”আমাকে পুলিশ ছেড়ে দিয়েছে, আমি বেরিয়ে আসিনি।”
তীব্র ঝাঁঝালো স্বরে ও যেন ধমকে উঠল, কিন্তু দাপটের অভাব রয়েছে। সন্দীপের মনে হল পানুর গলা যেন অতি অতি সামান্য কেঁপে উঠেছিল। ও জেল থেকে বেরিয়ে আসার পরই পিণ্টু আর দুলাল ধরা পড়ে। সবার ধারণা কাজটা সুহাসের, কিন্তু পাড়ায় ও ঘৃণার পাত্র ছিল।
