চিনু আজ রোজগার করার মতো বড় হয়েছে। চিনুকে আজ তার অসহায় অবস্থা থেকে উদ্ধার করার জন্য অভিনয় করতে হল। বাড়িভাড়ার দালালির কথাটা কেমন করে যেন মুখে এসে গেল। অথচ একবার মাত্র চিনু কথাটা বলেছিল, তা’ও আট ন’মাস আগে। লজ্জা ঢাকতেই অভিনয় করতে হল। কিন্তু লজ্জাটা কার। চিনুর? এতদিনে মনের মধ্যে যে ইচ্ছাটা কুঁড়ি থেকে ডালপালা নিয়ে বিরাট হয়ে উঠল সেটা যখন এককোপে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে। তার ব্যথা ঢাকতে অভিনয় করতে হল। শুধু ব্যথা নয় লজ্জাও তো ছিল। নিজের কাছে নিজের লজ্জা। চিনুর ছোটবেলার মাধবীর বয়স যেন এখনকার মাধবীকে দেখে মুচকি হাসছে। তার হাসি থামাতে মিথ্যে কথা বলতে হল। আর পাঁচটা সাধারণ মায়ের মতো সে হয়ে উঠতে পারল না। সংসারটা আর পাঁচটা সংসারের সঙ্গে তাল রেখে চলতে পারল না, হঠাৎ ধাক্কা খেয়ে টলমল করে উঠল। মাঝি হুঁশিয়ার। পাঁচজনের নানান উপদেশ, সহানুভূতি বিষ ঢেলে দেবে।
ছটফট করে উঠল মাধবী। অন্ধকারেরও জ্বালা আছে। কোথাও তলিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে। এমন কোথাও যেখানে আলো নেই, অন্ধকার নেই। মানুষজন, শব্দ, ক্ষিদে, ঘাম, গন্ধ, কিচ্ছু নেই। ঘুম চাই। আধো জাগা আধো তন্দ্রার মতো একটা কিছু। বোঝা যাবে এ সংসার চলছে কখনো জোরে সানুর মতো লাফাতে লাফাতে, কখনো দিনেশের কড়ানাড়ার মতো ঠুকঠুক করে। কিন্তু সেটা শুধু বোঝাই যাবে আর কিছু নয়। বাদ বাকি তন্দ্রার মধ্যে ঘোরপাক খাবে। বড় বড় ঢেউ এলে সেই তন্দ্রাটাই টুক করে ঢেউটাকে ডিঙ্গিয়ে পার ক’রে দেবে।
জ্বলুনি কমছে না। চিনু অবুঝ নয়। মা’র মিথ্যা কথা বলা সে নিশ্চয় ধরে ফেলেছে। আর এই মিথ্যাটা সে ভাঙল না। সেকি মাধবী লজ্জায় পড়বে বলে। চিনু তো জানে তার ওপর কতখানি ভরসা রাখত তার মা। কিন্তু আজ দুজনেই লজ্জায় পড়লুম। স্বচ্ছন্দে পাড়ি দেবার জন্য যে পাল তোলা হয়েছিল সেটা আজ ছিঁড়েখুঁড়ে গেল। আর কি আপ্রাণ চেষ্টাই না সেটাকে জোড়াতালি দিয়ে আবার খাড়া করার জন্য! এমনি সম্পর্কই আজ সংসারে, মানুষে মানুষে। কিন্তু ধরা তো দুজনেই পড়েছি! চিনুও কেবল অভিনয় করে গেল। যেমন হওয়া উচিত ছিল তা’ হয়নি। কেমন বাঁকা পথ ধরে যেন সবাই চলেছে। সবাই নিজেকে লুকোতে ব্যস্ত। আর তাই করতেই জীবন ভোর হয়ে গেল। তা হলে এমন করে বেঁচে থাকার দরকারটা কি!
দরকার না থাকলে সব মানুষই তো জীবন ঘুচিয়ে দিত। কিন্তু দিচ্ছে কই! একটা দুটো মানুষ আত্মহত্যা করে মরে। অসহ্য হলে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে যায়। দাশেদের ভাড়াটেরা তাদের বৌয়ের কাণ্ডকারখানা দেখে লজ্জায় উঠে গেল পাড়া ছেড়ে। সবাই বলল বৌটা মরেছে। আসলে বেঁচেই গেল। জীবনের খাত বদল করল। ঝুঁকি নিল। হয়তো বাঁচার অর্থ খুঁজে পাবে। নাও পেতে পারে। কিন্তু এমন করে বাঁচার থেকে মরে দেখানো অনেক ভাল। এইটেই আসল কথা। সংসারের কথা ভাবলে, সানু, চিনুর কথা ভাবলেই মনটা কেমন গলে গলে পড়ে, ওদের দুঃখ, লজ্জাগুলোকে তাড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করে। এই ইচ্ছেটাই সাহস যোগায় ওদের ভালবাসি বলেই না বেঁচে আছি!
তাহলে দোষ কোথায় চিনুর! যারা বলে চিনু সংসারের জন্য না, পরিশ্রম করে না, তারা কি সাহায্য করবে, টাকা পয়সা যোগাবে, উঁকি দিয়েও দেখবে না। তা হলে চিনু কি এমন অন্যায় করেছে রেস খেলে। এই টাকায় দু’চার দিনের তো সংসার খরচ মিটবে। চিনু চেষ্টা করেছে সংসারের জন্য, তার সাধ্যমত। সেও ভালবাসে। এইটেই তো বড় কথা। চিনু যেমন করেই হোক বাঁচার চেষ্টা করছে।
হঠাৎ কপালের ওপর হাতের ছোঁয়া পেয়ে চমকে উঠল মাধবী।
-পড়তে বসিস নি?
-তোমার অসুখ করেছে?
ভাল লাগল মাধবীর সানুর জিজ্ঞাসার ভঙ্গিটুকু। ছেলেমেয়েরা তেমন করে ভাল মন্দের খোঁজ নেয় না, ব্যস্ত হয় না তার শরীর খারাপ হলে। ওদের সঙ্গে সম্পর্কটুকু রাক্ষুসে বালির মত সংসার শুষে নিয়েছে। সানুর জিজ্ঞাসা যেন বালির তলা থেকে খুঁড়ে আনল ভালবাসা। কল কল ক’রে ভ’রে উঠছে মন।
-আমি আর বাঁচব না রে, এবার মরে যাব।
-না।
-না কেন! আমি মরলে তো তোরই ভাল, রোজ রোজ আর পড়তে বসতে বলবে না কেউ।
-আমি রোজ পড়ব।
সানুকে দুহাতে বুকের ওপর টেনে নিল মাধবী। কাঁপছে ওর শরীর। গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল মাধবী।
-খুব মন দিয়ে পড়বি। যত পরীক্ষা আছে সব কটা পাশ করবি। পাশ না করলে চাকরি পাওয়া যায় না। দেখেছিস তো ও বাড়ির অরুণদা কতোবড় চাকরি করে। ওর চেয়েও বড় চাকরি করবি, কেমন?
-হুঁ।
-চাকরি করে কি করবি?
সাড়া দিল না সানু।
-যদি তোর এক হাজার টাকা মাইনে হয়! এই ভাড়া বাড়িতেই থাকবি, না বাড়ি করবি?
সানু এবারও চুপ।
-তখন মা’র কথা ভুলে যাবিতো!
মাধবীর বুকে মুখ গুঁজে একটা শব্দ করল সানু।
-আঃ ধামসাচ্ছিস কেন, বল না, মনে থাকবেতো তখন। নাকি সাহেব হয়ে যাবি।
-মা আমি চিড়িয়াখানায় যাব।
মুখের ডগায় সাজানো কথাটা অপ্রস্তুত হয়ে আটকে গেল মাধবীর। সানু আবার পয়সার কথা তুলল।
-তোর বাবা এলে চেয়ে নিস।
-তুমি চেয়ে দাও।
সানুর নিশ্বাস পড়ল মাধবীর মুখে। মাংস ফোঁপরা ক’রে হাড় পর্যন্ত পৌঁছল যেন নিশ্বাস। যন্ত্রণায় ঝলসানো মাংসের মত চোখের কোল কুঁচকে উঠল। সানু থুতনি ধ’রে টানাটানি শুরু করল।
