”না, আর যাই হোক ঘুষ খাবে না।”
মুখের উপর প্রশান্তির ছায়া ভেসে এল। উনি ধীরে ধীরে আবার বালিশে মাথা নামালেন। কোনো কাতর ধ্বনি এবার সে শুনতে পেল না।
”আমি যাচ্ছি।”
ঘরের আলোটা নিভিয়ে, দরজা ভেজিয়ে সিঁড়ির কাছে এসে তার মনে হল, গত পঁচিশ বছরে কাকা একসঙ্গে এত কথা কখনো তাকে বলেননি। বোধহয় দুর্বল হয়ে গেছেন, একা থাকতে চাইছেন না। কিন্তু জেদ আর বোকামি নিয়ে বিশ্বাস ধরে রাখতে চাইছে। মনে কোনো সন্দেহ পোষেন না, দ্বন্দ্ব নেই, সরল সিদ্ধান্তে এসে গেছেন, বেঁচে থাকার দরকার নেই।
অপরাজিত থেকে বিদায় নিতে চান। এ রকম আনডিফিটেড চ্যাম্পিয়ন তো ফুটবল লিগেই পাওয়া যায়। সেজন্য মানুরা আছে। আজ এ দল, কাল ও দল, যেখানে বেশি টাকা! কাকা বিশ্বাস বদলায়নি। হয়তো খুন, রক্ত, বীভৎসতার প্রাগৈতিহাসিক প্রবৃত্তিটা ওনার মধ্যে একটু বেশি।
তার নিজের ক্ষেত্রে কি কখনো এমন কিছু ঘটেছে? ‘ন্যাদামারা’ না হয়ে যদি ঝাঁপিয়ে পড়ত তাহলে এখন হয়তো তার এবং সম্ভবত রত্নারও লাশ পড়ে থাকত ফোর্টের র্যামপার্টে। কিংবা কয়েকটা লাথি ঘুঁষি চুপচাপ হজম করতে হত। তার নিষ্ক্রিয়তার ফলেই হিংস্রতা, রক্তপাত ঘটল না। সামান্য কিছু গচ্চচা দিতে হল মাত্র।
সারা দেশ যদি নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়? কিছু গচ্চচা দিয়ে তাহলে সুসভ্য হওয়া বা রক্ত বন্ধ করা যাবে কি?
‘না চরিত্র, না বিবেক, কিসসু নেই।’ এসব গচ্চচা তো ওনার আমলেও দেওয়া হয়েছে। চরিত্র বা বিবেক বালা কিংবা হাতঘড়ির মতই। গেছে আবার হবে। তাই নিয়ে এত কপচাবার কী আছে?
সন্দীপ লুঙ্গি পরে প্যান্ট ভাঁজ করে যখন হ্যাঙ্গারে ঝোলাচ্ছে তখন বাণীকে উঁকি দিতে দেখল দরজা থেকে।
”কী হল বলুন তো… কাকা কেমন আছেন?”
”নিচে গিয়েই তো সেটা জেনে নিতে পার।” তার রুক্ষ স্বরে বাণী কুঁকড়ে গেল। হঠাৎ তার এই রেগে ওঠার জন্য সঙ্গে সঙ্গেই সে অনুতাপ করল। আজ পর্যন্ত বাণী কাকার সঙ্গে কথা বলেনি।
”ভালোই আছে, কয়েকদিন নড়াচড়া কম করতে হবে।”
”আমি যেতাম, উনিই বারণ করলেন…বললেন, ‘যেমন কর্ম’ তেমনি ফল; এসেছে তো মানুকে অপমান করতে, দুটো চড়-চাপড় দিয়ে চলে যেত। এসব খেলতে গেলে হয়েই থাকে, তা উনি আবার রড নিয়ে কেন বেরোলেন? চুপ করে ঘরে বসে থাকলেই তো পারতেন।”
”পানু বাড়ি আছে? অফিস যায়নি?”
”কী একটা লেখা আছে তাই বিকেলেই ফিরেছেন।”
”তুমি কাল কাকার খাওয়ার ব্যবস্থা কোরো, ওর এখন শুয়ে থাকা দরকার।”
”কেন ওর তো শৈলবালা আছে, রেঁধে দেবে।”
সন্দীপ না শোনার ভান করে দেরাজে হাতড়াতে লাগল ব্যাঙ্কের পাশবইটার জন্য। হাবিজাবি তুচ্ছ কাগজে অলকা বোঝাই করে রেখেছে। যা টাকা রয়েছে তাতে সাতদিন আর চলবে না।
”মা বলছিলেন আর এ বাড়িতে থাকবেন না।”
”কোথায় যাবে?”
”ঠাকুরপো কোথায় যেন ফ্ল্যাট কিনেছে সেখানে চলে যাবেন। ওর বিয়ে দিয়ে বউ নিয়ে যাবেন ভেবেছিলেন কিন্তু আজকের এই সবের পর আর থাকতে চান না। বড়ো বড়ো দুটো ইঁট একেবারে ঘরের মধ্যে…চাকরটা খুব বেঁচে গেছে। মাথার পাশ দিয়ে গিয়ে দেয়ালে লেগেছে।”
”পানুকে বোলো আমার ওকে একটু দরকার।”
”আজই দেখা করতে বলব?”
সন্দীপ কয়েক সেকেন্ড ভেবে বলল, ”কাল।” আজ তার বড় ক্লান্ত লাগছে।
ভোর থেকে বিদ্যুৎ নেই, গাছের পাতাও নড়ছে না। ঘাম জবজবে শরীর নিয়ে বিরক্ত সন্দীপ বারান্দায় মোড়ায় বসে কাগজ পড়ছিল, তখন পানু এল। পাজামার উপর খদ্দরের পাঞ্জাবি। বুক পকেটে চশমার একটা কোণ দেখা যাচ্ছে। ও যে চশমা পরছে এটা সে জানত না, বোধহয় লেখাপড়ার সময়ই শুধু চোখে লাগায়। ভ্যাপসা গরমে গায়ে জামা রাখার জন্য সে অবাক হল না। পানুর এটা ছোটোবেলার অভ্যাস, গায়ে কিছু একটা না দিয়ে ও রাতে ঘুমোতেও পারে না। ঘর থেকে সে একটা মোড়া আনল।
”বোস, একটা ছোট্ট কাজ করে দিতে হবে। তোদের পত্রিকায় একটা ছবি আর সঙ্গে ছোট্ট একটা রিপোর্ট…যাত্রা নাটক ফাংশনের খবর যেখানে বেরোয়…আমাদের পারচেসিং কন্ট্রোলারের রিকোয়েস্ট…”
”দিও, তবে এই সংখ্যায় তো আর হবে না।”
”না, না দেরি হলে কিছু এসে যায় না। তোকে কাল-পরশু দোব।”
প্রয়োজনের কথা শেষ। আর কিছু বলার আছে কিনা জানার জন্য পানু তাকিয়ে। সে কীভাবে হাসির প্রসঙ্গ তুলবে ভেবে পাচ্ছে না।
”কাকার বেশ ভালোই লেগেছে মনে হল।”
”কেন যে এইসবের মধ্যে যায়।”
পানু বিরক্তি দেখাল। ঝগড়া বা মারপিট এমনকি চেঁচিয়ে তর্ক করলেও সহ্য করতে পারে না।
”আমিও তাই বললুম, কিন্তু কে শোনে। সেই আগের মতই রয়েছে। ভয় হয়, হঠাৎ কোনো কাণ্ডফাণ্ড কোনদিন করে বসবে।”
”কুকরি আর জানলার ভারী গরাদটা এখনও তো রেখে দিয়েছে। …ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি!”
”আজও বিশ্বাস পুষে রেখেছে, উনি এখনও দেশটাকে রক্ষা করতে পারেন…দেশের চরিত্র বিবেক ঠিকঠাক করে দিতে পারেন…অনেকবছর আগে তুই একবার বলেছিলি, কুকরিটা চুরি করে গঙ্গায় ফেলে দিবি…মনে আছে তোর?”
পানু মাথা হেলাল। মুখে হাসি। বহুবছর আগের কথা মনে পড়লে এভাবে সবাই হাসে।
”অদ্ভুত ব্যাপার! ঘুরছে তো ঘুরছেই, কুকরি আর গরাদটা মাঝখানে রেখে…একধরনের অসুখ বোধহয়, মেন্টাল কেস। মানুরও তাই।”
”কেন ওর কী হল?”
”পেনাল্টি মিস কেন করল? অফিসে শুনছিলাম, ও নাকি একটা বাজে মেয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে, হয়তো বাধ্য হবে বিয়ে করতে। মেন্টালি খুব ডিস্টার্বড। তার উপর ওর বহু টাকা, প্রায় লাখ দুয়েকের মতো ছিল সঞ্চয়িতায়, তা আর ফেরত পাবার আশা নেই। এইসবের প্রতিক্রিয়া তো খেলায় পড়বেই।”
