”কে?”
”আমি…সানু।”
দরজা খুলতে সময় লাগল, বোধহয় শুয়েছিলেন। মাথার ব্যান্ডেজটা সাদা হেলমেটের মতো দেখাছে। চোখে ক্লান্তি। কুঁজো হয়ে দুর্বল ভঙ্গিতে উনি বিছানায় ফিরে গেলেন।
বালিশটায় ধীরে ধীরে মাথা রাখার সময় মুখ দিয়ে কাতর শব্দ বেরল। কয়েকঘণ্টা আগে রত্নার গলা থেকে এমন শব্দই বেরিয়েছিল।
”যন্ত্রণা হচ্ছে?”
উনি উত্তর না দিয়ে বাঁ হাতটা আড়াআড়ি ভ্রূর উপর রেখে চোখ ঢেকে সামান্য হাঁ করে রইলেন। কিছু দেখতে চান না এবং সম্ভবত বছর তিরিশ কিছু দেখেনওনি। তাহলে রড নিয়ে বেরোতেন না।
”কিছু ওষুধ দিয়েছে কি, ট্যাবলেট? ব্যথা কিন্তু হবে…আনব?”
”থাক আমার কিচ্ছু হয়নি।”
প্রায় ফিসফিসিয়ে বললেন। হাতটা নামান নি। বোধহয় খালিগায়েই রড হাতে বেরিয়েছিলেন, কানের গোড়ায়, বাহু আর বুকের লোমে রক্তের ছিটে লেগে।
ছত্রিশ বছর আগে যবন-নিধন করার সময়ও নিশ্চয় লেগেছিল। সন্দীপের সহানুভূতি সামান্য কঠিন হয়ে উঠল।
”খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা..পানুকে বরং বলি।”
হাতটা তুললেন আপত্তি জানিয়ে। চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। স্থিরদৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। সুস্পষ্ট ব্যঙ্গ ঠোঁটের কোণে মোচড় দিয়ে রয়েছে।
বেঁচে থাকার কোনো প্রয়োজন আছে? আমি জানতুম, দেশটা এই রকমই হবে, এই পথেই যাবে। এরপর দেখব অকারণে শুধুই সময় কাটাবার জন্য একজন আর একজনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে…বাপ ছেলের উপর, স্ত্রী স্বামীর উপর…নখ দিয়ে ছিঁড়বে, বঁটি দিয়ে কাঁটবে…কিসসু নেই এদেশে, না চরিত্র না বিবেক, কিসসু নেই।”
ক্লান্তি অথবা ঘৃণা, কোনো একটা কারণ ওকে নীরব করল। মানুষটি কখনো অন্যের দয়া গ্রহণ করেননি, ভাবালুতাকে প্রশ্রয় দেননি। বছরের পর বছর কঠিনভাবে জীবনযাপন করে হয়তো এখন বুঝতে পারছেন শুধু লোহার টুকরো হাতে নিয়ে তেড়ে বেরিয়ে দেশটাকে মনোমতো করা যায় না।
কাকাকে এখন বলা যাবে না: যারা আপনাকে মারল তাদের বয়সে আপনিও ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরীহ মানুষদের খুন করেছিলেন ধর্মের দোহাই দিয়ে। বীর গণ্য হয়েছিলেন। ত্রাতারূপে খাতির পেয়েছিলেন অল্প কয়েক দিনের জন্য এবং অচিরেই জানতে পেরেছিলেন আপনি সময়ের স্রোতের ধাক্কায় ভেসে চলে গেছেন। আজ এসব কথা বলে লাভ কী!
ওর স্মৃতি কি এখনও কর্মঠ আছে?
”আমার সম্পর্কে কাউকে কিছু ভাবতে হবে না।”
”আপনার এখন নিজের হাতে রান্না করাটা বোধ হয় উচিত নয়। বাণীকে বলে…”
”আমার সম্পর্কে ভেবে অযথা সময় নষ্ট করবে না। আমি জানি তুমি কী ভাবছ।”
”কী ভাবছি আমি!”
”আমার খাওয়ার সমস্যা নিশ্চয় নয়।…না আমি অনুতপ্ত নই। ব্যস, এইটুকু শুধু জেনে রেখো। কটা ছেলে মিলে ঘিরে ধরে মাথা ফাটালেই যে ডিগবাজি খেয়ে বলব ‘পাপের প্রায়শ্চিত্ত হল’, তা আমি করব না। পাপ আমি করিনি। আমি বিশ্বাসী।”
এই রকম কিছু একটা বিশ্বাস যদি বত্নার বা তার থাকত! প্রায়শ্চিত্তের চিন্তা থেকে রেহাই পাওয়ার মতো সুখ আর কীসে? অলকা কি তাকে কোনোদিন কাঠগড়ায় তুলে বলবে: ‘এই লোকটা ব্যভিচারী’ এবং রত্না: ‘এই লোকটা ন্যাদামারা’ এবং প্রণবেশ: ‘এই লোকটা নিজেকে নিয়ে সন্তুষ্ট!’
উঠে বসলেন এবং মাথায় যন্ত্রণা আছে এমন কোনো আভাস তার মুখে ফুটল না। এক দৃষ্টে সামনে শ্রীকৃষ্ণের ছবির দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করলেন, ‘আজও আমি পারি।”
”কী পারেন?”
”রক্ষার জন্য এগিয়ে যেতে। মানু বাড়ি নেই, তাহলেও ওরা মারতে এসেছিল তাই লোহাটা হাতে নিয়েছিলাম। একদিন মানু আমায় গালাগাল অপমান করে ও-ঘরের তালা ভাঙতে গেছল, সেদিন ওকে মারতেও লোহাটা হাতে নিয়েছিলাম। আমার এই অদ্ভুত ব্যাপারটার অর্থ বার করতে পার?…ঘোড়ারগাড়িতে চেপে একটা পরিবার পালচ্ছিল, আমি আর চারজন মিলে ধরলুম, পাঁচ মিনিটে কাজ শেষ করে চলে গেলুম। তারপর দেখি খালি গাড়ি নিয়ে ঘোড়াটা টেনে বেড়াচ্ছে। মায়া হল, লাগাম খুলে ছেড়ে দিলুম। রংটা বাদামির ওপর সাদা ছোপ, সুন্দর কেশর। ঘুরে বেড়াত রাস্তায়, রাত্রে এই ঘর থেকে শুনতে পেতুম নালের শব্দ…খপ খপ খপ। এমন অভ্যস্ত হয়ে গেলুম শব্দটার সঙ্গে যে প্রতীক্ষা করতুম কখন ও যাবে এখান দিয়ে। তারপর ঘোড়াটা একদিন মরে গেল। কেউ আর খেতে দিত না, কঙ্কালসার হয়ে গেছল। কিন্তু ওর শব্দটা রোজ রাতে আমার মাথার মধ্য দিয়ে হেঁটে যেত। কেন?”
”এবার ঘুমোন, এটাই এখন দরকার। ঘুমের জন্য ডাক্তার কি কিছু দিয়েছে?”
”ঘোড়ার হাঁটার সেই শব্দটা মাঝে মাঝে মাথায় আসে। কী করা যায়?”
অসহায় শিশুর মতো তাকিয়ে। মায়া হচ্ছে তার কিন্তু সে নিজেও ক্লান্ত বোধ করছে। হাসি একটা কাজ দিয়েছে। পানুকে বোঝাতে হবে সুহাস নির্দোষ, নিঃশেষিত, ক্ষমার যোগ্য! একটা বাজে কাজ কিন্তু দুবার সে হাসির হাতটা আজ চেপে ধরেছিল আন্তরিক আবেগে।
রত্নার ঘাড়ের উপর একটা লোক চেপে বসে ওর মুখটা মাটিতে ঘষড়াচ্ছে আর একজন পাছায় লাথি মারছে। বাধা দিতে সে এক ইঞ্চিও নড়েনি। তখন বোধহয়, এখন মনে হচ্ছে, লাথির শব্দে ‘খপ খপ খপ’-এর মতই কানে লেগেছিল। বহু বছর পর সে কি পানুর ছেলেকে বলবে, ‘কী করা যায়?’
সে উঠে দাঁড়াল।
”ওরা বলছিল মানু ঘুষ খেয়েছে। এটা কি সত্যি? সম্ভব কি এই বাড়ির ছেলের পক্ষে?
