”তোমারও হত না প্রথমেই যদি দিয়ে দিতে। অযথা বাধা দিতে গেলে। ওই রকম জায়গায়, অস্ত্র হাতে তিনটে লোকের সঙ্গে কি কিছু করা যায়?”
রত্না মিইয়ে পড়েছে। তর্ক করল না, কর্কশ রুক্ষ ভাষায় তাকে বিদ্ধ করল না। রাস্তা পার হবার সময় বরং সাবধানে দুধারে তাকিয়ে সন্দীপের বাহু টেনে থামাল। একটা মিনি বাস!
যা ছিল তাই দিয়ে বালাটা করিয়েছিলুম। গয়নাগুলোতো ফেরত পাইনি। শুনছি বাবা বিষয় সম্পত্তি ব্যবসা ভাগ করে দিচ্ছে ভাইয়েদের, হয়তো কিছু দিয়ে যাবেন….”
”তোমার বিয়ে করা উচিত ছিল।” ওরা জনবহুল রাস্তায় এসে পড়েছে। রত্না মাথা ঝুঁকিয়ে, পথচারীদের কাটিয়ে সন্তর্পণে হাঁটছে। অস্ফুটে একবার কী বলল, সন্দীপ মুখ নামিয়ে শুনল: ”এ সবই প্রায়শ্চিত্ত।”
মিনি বাসে পাশাপাশি বসার জায়গা পেল। ভাড়া দেবার জন্য পকেট থেকে ব্যাগ বার করতে গিয়ে ফ্যাকাশে মুখে সে রত্নার দিকে তাকাল। ওর মুঠোয় পাঁচ টাকার নোটটা ধরা। এই প্রথম রত্না তার ভাড়া দিচ্ছে।
এবার তার খেয়াল হল, ছাপিয়ে দেবার জন্য পারচেজিং কনট্রোলারের দেওয়া লেখাটা আর ছবিটা ব্যাগে ছিল। অবশ্য অসুবিধার কিছু নেই, ব্যাপারটা তার মনেই আছে। শুধু মেয়েটার নামটা একবার জিজ্ঞাসা করে নিতে হবে আর ছবিটা…ভালো ব্লক হবে না, অন্য আর একটা দিন, এই রকম কিছু একটা বলতে হবে।
”আজকেই ডাক্তার দেখাও…আর বোলো মেট্রোরেলের গর্তে পড়তে পড়তে বেঁচে গেছ।”
রত্না শুনল কিনা বোঝা গেল না। মুখে অভিব্যক্তি নেই। শূন্য দৃষ্টি সামনের লোকটির মাথায় নিবদ্ধ। এখন আর কথা না বলাই ভালো। তার নিজেরও বলতে ইচ্ছে করছে না।
বাড়ির কাছাকাছি আসতেই সন্দীপের মনে হল, কিছু একটা হয়েছে। অন্য দিনের থেকে রাস্তায় লোক বেশি, ছোটো কয়েকটা জটলা। উচ্চচস্বরে কথা এবং উত্তেজিত ভঙ্গি। রেলিংয়ের ধারে যুবকরা অন্য দিনের মতো তাকে উপেক্ষা করল না। মুখ ঘুরিয়ে তাকাল এবং গলা নামিয়ে ফেলল। তার মনে হল, তাদের বাড়ি নিয়ে কিছু ঘটেছে।
মুরারির দোকানের ভিতরে ভিড়। সে রাস্তায় দাঁড়িয়েই চা দিতে বলল মুরারিকে। আবার সেও কৌতূহলী হয়ে পড়েছে।
”একটু বেশি ভিড় যেন!”
”আর বলবেন না, একটু আগেই ঝামেলা হয়ে গেল।”
মুরারির বিন্দুমাত্র উদ্বিগ্নমনে হচ্ছে না। ঝামেলা যেন তাকে লাভবানই করেছে খদ্দের সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়ে। বোমা, পাইপগান বা ছোরায় এখানে বিস্ময় সঞ্চার করা যায় না। তাহলে বোধহয় অন্য কিছু। সুহাসকে নিয়ে কি?
”কী হয়েছে? এ পাড়া-ওপাড়া বোমাবাজি?”
মুরারি অন্য খদ্দেরদের আগে তাকেই চা দিল। খাতিরটা ভোলেনি।
”কি দিনকালই হচ্ছে, মাঠের ব্যাপার ঘর পর্যন্ত টেনে এনে কী লাভ বলুন? খেলায় হার-জিত-ড্র-তো হবেই। তাই বলে দল বেঁধে বাড়িতে এসে ইঁট ছোঁড়া, মা বোন মাসি তুলে খিস্তি করা…”
”মানুকে নিয়ে?”
মুরারি শুধু মাথা নাড়ল।
”হ্যাঁ, ড্র হয়েছে। মানুদা আজ পেনাল্টি মিস করেছে, ভাবা যায় না!…শেষে কিনা…ভাবা যায় না, ভাইটাল একটা পয়েন্ট আমাদের গেল।”
. সন্দীপের পাশে দাঁড়িয়েছিল কিশোরটি। কথা বলার জন্য উদগ্রীব দেখাচ্ছে। মুরারি নিজের কাজে ব্যস্ত। একটা পুলিশ ভ্যান মন্থর গতিতে টহল দিয়ে গেল।
”ছেলেগুলো কেউ ওপারের নয়। একটাকে আমি চিনি নকশাল করত, যদু ভটচাজ লেনের দিকে থাকে। এক পয়েন্ট এখন লস করা মানে…ওরা বলছে মানুদা ঘুষ খেয়েছে। এটা একদম বাজে কথা। কিন্তু কে ওদের বোঝাবে? এক পয়েন্ট যাওয়া মানে লীগ থেকে বেরিয়ে যাওয়া।”
কিশোরটিকে বিষণ্ণ দেখাচ্ছে। মানুর অজস্র ভক্তের একজন কিন্তু এখন ওর জীবন-মরণ সমস্যা। একটা পয়েন্ট। কে যেন এদের নামকরণ করেছে ‘প্যাঙা।’
”আপনাদের নিচে যে থাকে, টাকমাথা বেঁটে, মোটাসোটা লোকটা…”
মুরারি মুখ না ফিরিয়ে ডেকচি থেকে মাংসের টুকরো বাছতে বাছতে বলল, ”ওনার কাকা, মানুদারও।”
”জানি,” একটুও অপ্রতিভ না হয়ে ও বিরক্ত উদ্ধত ভঙ্গিতে মুরারিকে অগ্রাহ্য করল। ”একটা রড নিয়ে বেরিয়ে এসে ওদের তেড়ে গেল।…ওরা ডেঞ্জারাস ছেলে, রড-ফডে কি ওরা ভয় পায়! ওনার রডেই ওনার মাথা ফাটিয়ে দিল।”
”কাকার!’….এখন কোথায়?”
চায়ের আধ ভর্তি কাপ সে নামিয়ে রাখল বালতির পাশে।
”হসপিটালে যেতে রাজি হলেন না। ডাক্তারখানায় আমিই নিয়ে গেলুম।” মুরারি তলানি চা রাস্তায় ফেলে বালতির জলে কাপ ডুবিয়ে দিল। ”ভালোই ফেটেছে, আটটা টিচ করতে হল। মাথায় সোজা পড়লে আর বাঁচতে হত না।…কি কাণ্ড বলুন তো, সোজা বসিয়ে দিল! শাসন-বারণ নেই, ভদ্রতা সভ্যতা বোধ নেই, শুধু মারো আর মারো…বাড়িতে ইঁট ছুঁড়বে, গালাগাল দেবে আর কেউ বারণ করলেই তাকে পিটোবে? য়্যা, শালাদের ধরে ধরে গুলি করা দরকার…”
মুরারির স্বর ও ভঙ্গি যান্ত্রিক, কথাগুলোও বহুযুগ আগের কোনো প্রচলিত ধারণা ও অভ্যাসের জের টেনে যেন মুখস্থ বলল।
সদর দরজা বন্ধ। কাকার জানলার পাল্লার জোড়ের ফাঁক দিয়ে আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে। মানুদের বারান্দা অন্ধকার, জানলাগুলো বন্ধ। পানুর ঘরের আলো বারান্দায়।
কড়া নাড়ার শব্দে মানুর বাচ্চচা চাকর বারান্দা থেকে সন্তর্পণে উঁকি দিল।
দরজা খুলে দিয়ে প্রায় ছুটেই ছেলেটা দোতলায় উঠে গেল। সিঁড়ির আলোটা জ্বলছে। কাকার ঘরের দরজা বন্ধ। সে টোকা দিল।
