ওরা বেশি কথার মানুষ নয়। চার-পাঁচ মিনিট সময় দিয়েছে, হয়তো এটাই ওদের রেকর্ড। কিছু একটা এবার তার করা উচিত। কিন্তু কী করতে পারে। যুদ্ধ করবে? চেঁচাবে? ছুটে পালাবে? সবকটাই নিরর্থক। তাই করে নিজের অপদার্থতা, ব্যর্থতা, অপ্রয়োজনীয়তা ঘুচবে না। একটা সরু কানাগলিতে যেন ঢুকে পড়েছে, বেরোবার রাস্তা পাচ্ছে না। এই মুহূর্তে কী ভাবনা হচ্ছে তা নিজেই জানে না। শুধু মনে হচ্ছে স্বাভাবিকত্বের সীমা সে পার হয়ে যাচ্ছে। চারপাশ অদ্ভুত অচেনা লাগলেও, একটা জগৎ যেন এখনও রয়েছে। দূর থেকে মোটরের হর্ন শোনা যাচ্ছে, রাস্তার আলো পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। কিন্তু তার ভিতরের জগৎ নিঃশব্দ, নির্জনতায় ভরাট।
ওরা চলে গেছে। উপুর হয়ে রত্না শুয়ে, ওর ফোঁপানির শব্দ সে পাচ্ছে। হাতটা কি কেটে নিয়ে গেছে?
সে সন্তর্পণে ঝুঁকে রত্নার কাঁধে তারপর বাহু দিয়ে হাতটা বুলিয়ে কবজি পর্যন্ত আনল। চটপটে রক্ত নেই, আঙুলগুলো যথাস্থানে।
”ওঠো।”
কাঁধ ধরে তোলার চেষ্টা করল।
”কত কষ্টে জমানো টাকায় বালাটা করালুম…আর কিছু রইল না আমার…সব গেল সব গেল।”
রত্না উঠে বসল। হাতড়াতে লাগল ব্যাগ খুঁজে। কাছেই পড়েছিল সেটা।
”আর এখানে নয়, চলো।”
ওরা পরস্পর কথা না বলে অন্ধকার মাঠ থেকে দ্রুত উঁচুনীচু জমিতে ঠোক্কর খেতে খেতে রাস্তায় এল। রত্নার ঠোঁটে রক্ত, গালে ঘাড়ে ধুলো, চুলে বিন্যাস নেই। সন্দীপ রুমাল দিল।
”ভালো করে মুছে নাও।”
রত্না হাত বাড়াতে গিয়ে কাতরে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল।
”শালারা হাতটা মুচড়ে বোধ হয় ভেঙে দিয়েছে।”
সন্দীপ ওর বাঁহাতের কবজিতে কালো দাগ আর রক্তের ছড় দেখতে পেল।
”কোথায় ভেঙেছে?”
”কনুই, মনে হচ্ছে ভেঙেছে…না হলে খুলে নিতে পারত না। খানকির বাচ্চচাদের একবার পাই…”
পাশ দিয়ে দুটি তরুণ তরুণী যাচ্ছিল। তারা মুখ ফিরিয়ে তাকাল। রত্না ওদের দৃষ্টি অগ্রাহ্য করে আবার বলল, ”তুমি এমন ম্যাদামারা পুরুষ….হাঁ করে মজা দেখছিলে?”
হঠাৎ গলা চড়িয়ে রত্না তাকে অপ্রতিভ করে দিল। সে আশা করছিল কিছু কথা তাকে শুনতে হবে কর্কশ অমার্জিত ভাষায় কিন্তু রাস্তার উপর নয়। তবু ভালো, পথচারী কম। চওড়া রেড রোডের দুধারে সারিবদ্ধ আলো, দ্রুতগামী গাড়ি, গাছের চওড়া কাণ্ড যে নিরাপত্তার স্বাভাবিক অনুভব ফিরিয়ে এনেছে সেটা রক্ষা করার জন্যই সে বলল, ”ছোরাটা আমার পেটে সিকি ইঞ্চি ঢোকানো ছিল।”
এই শুনে ওর হৃদয় মায়া বা করুণায় ভরে উঠবে এমন প্রত্যাশা তার নেই, একটা কৈফিয়ত দরকার তার নিষ্ক্রিয়তার জন্য।
রাগে ফুঁসছে রত্না। বাচ্চচাদের মতো ভেঙিয়ে বলল : ”সিকি ইঞ্চি ঢোকানো ছিল! ছিল তো কী হয়েছে, ঝটকা দিয়ে হাতটা চেপে ধরতে পারতে?”
”আরও দুজন ছিল।”
হনহনিয়ে রত্না হাঁটতে শুরু করল উত্তরদিকে।
”আস্তে হাঁট, রাস্তাটা ভালো নয়।”
রত্না থমকে দাঁড়িয়ে তিক্ত স্বরে বলল, ”আর নেবার আছে কি?”
হঠাৎই যেন ওর মনে পড়ল হাতের ব্যাগটাকে। খুলে ভিতরের আঙুল দিয়ে নাড়ানাড়ি করেই বিস্মিত ধ্বনি মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল।
”নোটটা পায়নি।”
একটা পাঁচ টাকার নোট ওর হাতে। সন্দীপ পকেট চাপড়ে হাসার চেষ্টা করল।
”তবু রক্ষে ফেরার সমস্যা মিটল।…পুলিশে গিয়ে কোনো লাভ নেই।”
”ভেতরে লুকোনো একটা খোপে সবসময় পাঁচ টাকা রেখেছি, কখন কী দরকার হয়…আজ হল।”
ওরা হাঁটছে পাশাপাশি। দুজনেরই বহুবার হাঁটা এই পথ অথচ সন্দীপের সম্পূর্ণ অপরিচিত মনে হচ্ছে। ল্যাম্পপোস্টগুলোর দিকে এগোবার সময় যখন নিজেদের ছায়া দেখতে পাচ্ছে না তখন তার মনে হচ্ছিল অবাস্তব ইন্দ্রিয়হীন শূন্যতার দিকে সে চলেছে। ল্যাম্পপোস্ট পেরিয়ে যাবার পর মুখ ফিরিয়ে দেখতে ইচ্ছে করছিল ছায়া অনুসরণ করছে কিনা।
এটা কি এক ধরনের নপুংসকতা? তার গভীরে কেউ তাকে হুঁশিয়ার করে দিচ্ছিল-‘বোকামি কোরো না, একটা আঙুল পর্যন্ত নাড়িও না, বেঁচে থাকাটাই প্রথম কথা’। বহু বছর ধরে লালিত অযোগ্যতা, হতাশা, নিশ্চেষ্টতা, অনিশ্চিতবোধই তাকে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল, নয়তো ‘ঝটকা দিয়ে’ সে কিছু একটা করে ফেলত। এক্ষেত্রে কেউ কি প্রাণ অবহেলা করে বাহাদুরি নিতে যাবে?
কার কাছে বাহাদুরি? অন্ধকারে কে দেখত? রত্না? জানোয়ারের মতো ওর অনুভূতি। কয়েকশো টাকার বালার জন্য এত লাঞ্ছনা নেওয়ার মানে হয় না, অযৌক্তিক। অনেকগুলো লাথি, ঘুঁষি, হাতে মোচড় নিয়েছে নির্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কি!
রত্না পিছিয়ে পড়ছে। ডান মুঠোয় ধরে আছে বাঁহাতের কনুই। ওর বৃহৎ মুখে যন্ত্রণা, অসহায়তা আর সারল্য দেখে সন্দীপ মনে মনে কুঁকড়ে গেল। তার কি কোনো অপরাধ ঘটেছে? কী করতে পারত সে?
”ভেঙেছে মনে হচ্ছে কি?”
”জানি না, তাহলে তো মট করে আওয়াজ হত!”
”ডাক্তার দেখাতে হবে…আছে কেউ পাড়ায়? মনে হচ্ছে ফুলেছে।”
”আছে।…ছোটোবেলায় ডান হাতটা বাস থেকে পড়ে গিয়ে ভেঙে ছিল আর এখন গেল…কী বলব বাড়িতে?”
রত্না মুখের দিকে তাকাল। সন্দীপ ভেবে পেল না কী বলবে। মুখ নামিয়ে নিয়ে সে হাঁটছে।
”কদিন বোধহয় অফিসেও যেতে পারব না। গায়ে ব্যথা হবে, লাথি…তোমার তো কিছুই হয়নি।”
ক্ষীণ একটা অভিযোগ যেন ওর গলায় ফুটল। কিছু না হওয়াটা কি কাপুরুষতার পরিচায়ক?
