”দেখলুম মেয়েটা কী জিজ্ঞেস করল, কী যেন বলে ও কাঁধ ঝাঁকাল। তারপর মেয়েটা মুখ ফিরিয়ে আমার দিকে তাকাল…ঠোঁট বেঁকিয়ে কেমন যেন তাচ্ছিল্য আর ভয় দেখাল…খুব কষ্ট হল মেয়েটার জন্য, তাই ঠিক করেছি মামলা করব, এক্সপোজ করব, ব্যাটাকে রক্ত হাগিয়ে ছাড়ব, ক’টাকা আর মাইনে পায়..ফুটুনি মেরে বেড়ানো…আমার পায়ের ওপর কুত্তাটাকে টেনে আনতে যদি না পারি তো আমি রত্না গড়াই নই…”
রত্নার গোঁয়ার চরিত্রের সঙ্গে প্রচ্ছন্ন মমতাও মিশে আছে। সন্দীপের মনে হয়েছিল ‘পুঁচকে মেয়েটা’ ঠোঁট না বাঁকালে ও উকিলের কাছে ছুটে আসত না।
শ্যামবাজারের মোড়ে শেয়ারের ট্যাক্সিতে রত্নাকে তুলে দেবার সময় ওর আঙুল সে আলতো ছুঁয়েছিল। তখন সে দুটি সিদ্ধান্ত নেয় : বাড়ি ফিরে আজ রাত থেকেই ব্যায়াম শুরু করবে আর কাল পাঁচটায় মিনিবাস স্ট্যান্ডে থাকবে।
রত্না অবশ্য মামলা করেনি। সন্দীপ পরে খোঁজ নিয়েছিল প্রফুল্লর কাছে।
”ব্যাটা একটা ঘোড়েল। নোটিস দিয়েছিলুম, একদিন কোর্টে আমার সঙ্গে দেখা করে বলল, ‘ওকে বারণ করুন মামলা করতে, না হলে অনেক কিছুই ফাঁস হয়ে যাবে, তাতে ও আর মুখ দেখাতে পারবে না। আমার সঙ্গে বিয়ের আগে কার সঙ্গে কবে কী করেছিল, কী চিঠিপত্র লিখেছিল, কোথায় গিয়ে অ্যাবোর্শন করিয়েছিল সব প্রমাণ হাতে আছে, ওর বাড়ির লোকও সব জানে। গয়নাগাঁটি, জিনিসপত্তর কিছুই ফেরত পাবে না, দোব না। ওকে বলুন আমাকে যেন ডিস্টার্ব না করে, তাহলে ওর কোনো ক্ষতি করব না।”
”রত্না গড়াইকে সব বললুম। শুনে মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ‘কী প্রমাণ আছে? সব মিথ্যে কথা, এইসব বলে ভয় দেখাচ্ছে যাতে মামলা না করি কিন্তু আমি করবই। আমি ভয় পাওয়ার মেয়ে নই, ঢের ঢের অমন পুরুষ দেখেছি’। এইসব বলে টেবলে ঘুঁষি মেরে সেই যে চলে গেল আর আসেনি।”
প্রফুল্ল হেসে বলেছিল, ”মামলার জন্য আগাম দুশো টাকা দিয়ে গেছল, ফেরত দিতে হবে। কোথাও যদি দেখতে টেখতে পাস, টাকাটা নিয়ে যেতে বলিস। চিনতে অসুবিধে হবে না যা একখানা চেহারা!”
সেইদিনই সন্ধ্যার পর আউট্রাম ঘাটে গঙ্গার পাড়ে বসে রত্নার প্রথম চুম্বন সে পেয়েছিল।
ওরা স্ট্র্যান্ড রোড ধরে ইডেনের পাশ দিয়ে ঘুরে মোহনবাগান মাঠের পিছনে কেল্লার র্যামপার্টের উপর কোনাকুনি একটা উঁচুনিচু কাঁচা রাস্তা ধরল যেটা দিয়ে রেড রোড ও ট্রামলাইনের মোড়ে পৌঁছনো যায়। মোহনবাগান বা ইস্টবেঙ্গলের ফুটবল খেলা না থাকলে অল্প লোকই এই পথে চলে, সন্ধ্যার পর চলে না। গড়ের ধারের ঝোপ ঝাড় থেকে র্যামপার্টের জমি ঢালু হয়ে নেমে এসেছে। কেল্লার গঙ্গার দিকে প্রণবেশের গাড়িতে বসে সন্দীপ দেখেছিল এমনই ঢালু জমি দিয়ে অন্ধকার থেকে নেমে এসেছিল দুটি নারী পুরুষ।
গঙ্গার ওপারে সূর্য ম্রিয়মাণ হয়ে আড়াল পড়ার পরও এই অঞ্চলে আলোর স্বচ্ছতা কিছুক্ষণ থাকে। কলকাতার গভীরে, অলিগলিতে তখন সন্ধ্যা নেমে যায়। ছড়িয়ে ছিটিয়ে জোড়ে জোড়ে কিছু নারী ও পুরুষ ঘনিষ্ঠভাবে বসে। ওদের মুখগুলো এখন আবছা, মেয়েদের রঙিন শাড়ির রং শুধু চেনা যাচ্ছে।
রত্না পথ ছেড়ে কেল্লার গড়ের দিকে হাঁটতে শুরু করল।
”ওদিকে কোথায়? আর একটু বরং হাঁটি।”
”আর পারছি না বাবা, এবার বসব।”
ইচ্ছে করেই রত্না ওদের পাশ দিয়ে হেঁটে গেল। যুবকটির হাতে মেয়েটির হাতটি ধরা। একবার চোখ তুলেই নামিয়ে হাত ছাড়িয়ে পিঠের উপর আঁচল টেনে দিল। রুগণ, মুখটি মিষ্টি। যুবক কাঠি নষ্ট করছে সিগারেট ধরাবার জন্য। পুরু গোঁফ, হাত দুটিতে ভিটামিনের অভাব।
ঝোঁপের দিকে পিঠ রেখে ওরা বসল। দূরে চৌরঙ্গীর উপর বাড়িগুলো অস্পষ্ট, রাস্তার আলো জ্বালা হয়ে গেছে। মোটরের হর্ন এমনকি এঞ্জিনের শব্দও তারা শুনতে পাচ্ছে। তক্তাঘেরা তিনটে ফুটবল মাঠ আর মধ্যে মধ্যে তাঁবু নিয়ে গড়ের মাঠের এইদিকটা পরিত্যক্ত কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক খননক্ষেত্রের মতো দেখাচ্ছে। বহু দূরের নিওন বিজ্ঞাপনের দপদপানি এতক্ষণে বেরিয়ে আসছে। আশপাশে যারা বসে, অন্ধকার তাদের গলিয়ে মিশিয়ে দিচ্ছে নিজের সঙ্গে। একটা দুটো সাদা ছোপ, হয়তো সাদা জামাপরা কেউ।
সন্দীপ হাত রাখল রত্নার ঊরুতে।
”এখন নয়…চুইংগাম আছে খাবে?”
”এই জিনিসটা আমার বিশ্রী লাগে।”
”কোন জিনিসটা তোমার ভালো লাগে? ঝালমুড়ি…খাব না, গরম আলুর চপ…খাব না, শশা….খাব না, ভিজে ছোলা কাঁচালঙ্কা পেঁয়াজ তাও নয়।”
”এগুলো প্রত্যেকটা মারাত্মক বীজাণুর ডিপো।”
”আমি তো কত খেয়েছি…আর একটু পরে…যখন স্পোরটসে আসতুম তিন টাকা চার টাকার ফুচকা উড়িয়ে দিতুম, কই অসুখ বিসুখ…আঃ বলছি এখন নয়, কে এসে পড়বে।”
”কার মাথাব্যথা পড়েছে এখন এখানে আসার।”
”একদিনের জন্যও আমার শরীর খারাপ হয়নি।”
”ওজন বেড়ে যাওয়াটাও একটা রোগ।”
”সত্যিই আমি কি মোটা হচ্ছি? ঠাট্টা কোর না, ঠিক ঠিক বলো। কই আর কেউ তো বলে না?”
”কেউ তো আমার মতো এত মন দিয়ে দেখে না।”
”খুব হয়েছে।”
সন্দীপ ওর পিঠে হাত রেখে বুলোতে বুলোতে বগলের নীচে পৌঁছল। রত্নার বসার ভঙ্গি বদলে গিয়ে শিথিল হল।
”তোমার বউকে আজও দেখা হল না।”
”যখন আসে খুব বেশি বেরোয় না বাড়ি থেকে।”
”গিয়েও তো দেখা করতে পারি।”
