রত্না হেসেছিল শব্দ করে। দু-তিনজন পথচারী ফিরে তাকায়।
”বলেছিলুম এসব বলার কী দরকার, যা সত্যি তাই বলো! এমন তো কতই হচ্ছে, কত মেয়েকে পুরুষরা ঠকাচ্ছে, তাদের জীবনটাই নষ্ট করে দিচ্ছে…আমার অবশ্য নষ্টফস্ট হয়নি, চাকরি করছি খাচ্ছিদাচ্ছি ঘুরছি…কিন্তু দাদাবউদির কাছে এটা একটা মহাভারত অশুদ্ধ হওয়ার মতো ব্যাপার। আপনার কি মনে হয় এ ব্যাপারে?”
”এ রকম মানসিকতা আমাদের দেশে তো এখনো রয়ে গেছে।” সন্দীপ সাবধানে বিষয়টাকে পাশ কাটাতে চাইল। প্রথম আলাপেই বাড়ির কারুর সম্পর্কে কটু মন্তব্য ওর পছন্দ হবে কিনা সেটা এখনও বোঝা যাচ্ছে না। তবে রত্নার স্বচ্ছন্দ কথা বা ভঙ্গি তাকে আকর্ষণ করেছিল। আড়চোখে সে কয়েকবার ওর ঘাড় থেকে গলা বেয়ে ব্লাউজের কিনার পর্যন্ত নেমে যাওয়া ঢালু মসৃণ পেশির দিকে তাকিয়েছে। একদা ভারী লোহা নাড়াচাড়া করার রেশ কাঁধ ও বাহুতে ছড়িয়ে আছে। সন্দীপের মনে পড়ল সে অনেকদিন কোনো ধরনের ব্যায়ামই করেনি।
”এতদিন যখন মামলা করেননি, তখন আর করার দরকার কী?”
এইসময় বড়ো বড়ো ফোঁটায় বৃষ্টি নামে।
”আজই ছাতা না নিয়ে বেরিয়েছি…চলুন ওই বারান্দাটার নীচে।”
দমকা হাওয়ায় বৃষ্টির ছাঁট মানুষগুলোকে একধারে ঠেলে জড়োসড়ো দলা পাকিয়ে দিয়েছে। ওরা বারান্দার নীচে অন্যধারে দাঁড়াল যেখানে ভিজতে হবে বলে কেউ দাঁড়ায়নি।
”আমার কিন্তু বৃষ্টিতে ভিজতে বেশ লাগে।”
”আমারও।”
”এখন বাড়িতে থাকলে ছাদে উঠে…”
আকাশে ফাটল ধরিয়ে বিদ্যুৎ রেখা পুবের বস্তির মাথায় নেমে এল এবং বাজ পড়ল।
”উ বাবা।” দুহাতে কান চাপা দিয়ে রত্না কুঁজো হতেই সন্দীপের বাহুতে মাথা ঠেকল। হালকা সুগন্ধি তার নাকে এল।
”বড্ড ভয় করে বাজ পড়লে…আবার হয়তো পড়বে।”
”এক জায়গায় পরপর পড়ে না।” সন্দীপ অনিশ্চিত স্বরে বলল।
কিছুক্ষণ পর রত্না বিষণ্ণ স্বরে বলল, ”আজ দুর্ভোগ আছে…যা বৃষ্টি হচ্ছে ট্রামতো বন্ধ হবেই, বাসেও ওঠা যাবে না, রিকশা যদি যায় তো দশ-পনেরো যা খুশি ভাড়া চাইবে।”
”আপনার কাছে টাকা নেই?”
”তা আছে।”
”উহুঁ মনে হচ্ছে নেই, কই দেখান তো?”
”ধার দেবেন, তারপর ধার শোধ করতে আপনি আসবেন আমার অফিসে।”
সন্দীপ অপ্রতিভতার শেষ সীমায় পৌঁছে ফিরে আসার জন্য আঁকুপাকু করতে করতে একটা ব্যাপার বুঝল: ওর কথায় বিদ্রূপের হুল ফোটানোর চেষ্টা নেই এবং স্বাভাবিক বোধশক্তিটা প্রখর।
”সেটা মন্দ ব্যাপার হয় না, তাহলে আমার কাছে ঋণী হোন।”
সন্দীপ একটা পাঁচ পয়সা ওর মুখের সামনে চিমটের মতো দু আঙুলে ধরল। রত্না নির্দ্বিধায় তার দু আঙুলে মুদ্রার বাকি অংশটুকু চেপে ধরে বলল, ”রোজ পাঁচটার সময় আমি জি পি ও-র সামনে মিনিবাসের লাইনে দাঁড়াই, হয়তো, কোনো একদিন দেখা হয়ে যাবে, তখন পয়সাটা ফেরত দিয়ে ঋণমুক্ত হব।”
একটু গলা নামিয়ে সন্দীপ বলল, ”ঋণ বেশিদিন ফেলে রাখতে নেই, মার যাবার সম্ভাবনা থাকে। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে ফেরত না পেলে আমি কিন্তু ঋণ দিই না।”
ছোট্ট মুদ্রাটিকে দুজনেই আঙুলে চেপে ধরে কথাগুলো বলে। আঙুলগুলো ছোঁয়ানো ছিল। পরে অবশ্য সন্দীপের মনে হয়, খুব দ্রুত তারা কাছাকাছি এসেছে, যা সাধারণত হয় না।
”পাঁচ পয়সার মতো সামান্য জিনিস মার যায় না, হাজার কি লক্ষ টাকার মতো হলেই ভাবনার ব্যাপার।”
”এটা পাঁচ পয়সা কে বলল! পাঁচকোটি টাকা এর দাম।”
যতটুকু রাস্তার আলো পাওয়া যাচ্ছে তাতেই সন্দীপ দেখতে পেল রত্নার মুখে কোমলতা ছড়িয়ে যাচ্ছে।
”এত বছর এভাবে না কাটিয়ে বিয়ে করতে পারতেন।”
”কেন এইভাবে থাকতে অসুবিধে কী?”
”বাস্তব অসুবিধে আছে বইকি।…রোগভোগ, বার্ধক্য, অপরের সংসারে থাকার যন্ত্রণা…”
”ওসব নিয়ে অতশত ভাবি না…আপনি কি বিয়ে করেছেন?”
”হ্যাঁ।”
”ছেলেমেয়ে?”
”নেই।”
”বউ?”
”বাইরে থাকে, স্কুলে কাজ করে, শনি রবিবার আসে।”
”দুটো দিন তাহলে এনজয় করেন।”
অর্থ হৃদয়ঙ্গম করতে ওর মুখের দিকে তাকাল। রচনার হাসিতে অশ্লীলতার চাপা আভাস। সন্দীপের ভালো লাগল দেখতে। উত্তেজিত হবার মতো প্রশ্রয় রয়েছে।
”আপনার একটা হাতের মাপে আমার বউয়ের একটা পা হবে।”
”রুগণ?”
সন্দীপকে দেখিয়ে আঁচলে বাহু ঢেকে রত্না হাত বাড়িয়ে বৃষ্টি মাপার চেষ্টা করল।
”চলুন যাওয়া যাক। আমাদের দত্ত বাগানের দিকটা খুব ভালো নয়, রোজই ছিনতাই হচ্ছে। অবশ্য গায়ে গয়নাটয়না নেই, তাহলেও…”
হালকা এলোমেলো হাওয়ায় ঝিরঝিরে বৃষ্টির মধ্যে ওরা রওনা হল। কিছু লোক রাস্তায় রয়েছে। যানবাহন অল্প। শ্যামবাজারে যে বাসগুলির যাত্রা শেষ সেগুলিতে হালকা ভীড়। রাস্তার গর্তে জমা জল ছিটকে উঠছে গাড়ির চাকার ধাক্কায়। কখনো ফুটপাথ দিয়ে কখনো বা রাস্তায় নেমে ওরা হেঁটেছে।
”এইসব মামলা আবার কাগজে বেরিয়ে যায়, ভয়টা সেখানেই, বাড়িতে বলছে যাকগে কিন্তু বিয়েতে পাওয়া হাজার দশেক টাকার জিনিস ফেলে রেখে এসেছি, চেয়েও পাইনি। গয়নাগুলোও দেয়নি। তা নয় না দিল, কিন্তু ব্যাটা আবার মেয়ে ঠকাতে শুরু করেছে।
”বউটাকে তো দেশে পাঠিয়ে দিয়েছে, এখন একটা মেয়েকে নিয়ে খুব ঘোরাঘুরি করছে…ফর্সা ছিপছিপে সুন্দরী, সম্ভবত স্প্রিন্টার।
”একদিন ময়দান মার্কেটে মুখোমুখি পড়ে গেছল। আমাকে দেখে একগাল হাসল, আমি অবশ্য ন্যাচারালই ছিলাম। মেয়েটা একটু দূরে দাঁড়িয়ে আমাকে খুব লক্ষ করছিল, হয়তো জানে আমি কে। খচ্চচরটা ‘কেমন আছ? ভালো আছ?’ ‘আমার ছাত্রী’ এইসব বলে তাড়াতাড়ি কেটে পড়ল।
