”দেখ তো কেমন হল।”
বাঁ হাত এগিয়ে ধরল রত্না, ম্যারাথন বিজয়ীর হাসি নিয়ে। মুখটিতে লাবণ্য কম। মুখ আর একটু কম রুক্ষ হলে বা গোলাকার না হলে এই হাসিকে স্নিগ্ধ বলা যেত। দেহের সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে ঈষৎ বৃহদাকার মাথা। বালাটা চওড়া কবজির সঙ্গে মানিয়ে দরজার কড়ার মতো মোটা। রত্নার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ স্বাভাবিক আকারের রমণীদের থেকে বড়ো। কণ্ঠস্বর ভারী, নাকের নীচের পুরু লোম ত্বকের রঙের সঙ্গে মিশে যাওয়ায় দূর থেকে চোখে পড়ে না।
সন্দীপ একনজর তাকিয়েই তারিফ জানাল, ”বাহ বিউটিফুল তো..মানিয়েছে বেশ!”
”আনা ছয়েক সোনা আরও দিতে পারলে ভালো একটা ডিজাইনের করা যেত।”
”দিলে না কেন?”
”কি যে বলো, তাহলে আরও কত দিতে হত জান?”
ওরা হাঁটতে শুরু করেছে। স্ট্র্যান্ড রোড দিয়ে দক্ষিণে বাবুঘাটের দিকে আপাতত যাচ্ছে। কতদূর যাবে সেটা নির্ভর করে রত্নার ক্লান্তির বা সন্দীপের পছন্দ মতো বসার জায়গা পাওয়ার উপর।
একদিন সে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের বাগানে বসে সাধারণ স্বরেই বলেছিল, ”তুমি মোটা হয়ে যাচ্ছ, পেটে চর্বি জমছে।” রত্না তলপেটে হাত রেখে যথাসম্ভব মেরুদণ্ড খাড়া করে বলে: ”কোথায় চর্বি, দেখো।”
সে হাতটা বাড়িয়ে ওর তলপেটের চর্বি আঙুলে ধরে টানতেই রত্না চাপা ধমক দিয়ে ওঠে। হাতটা অবশ্য সে অনেকক্ষণ রেখেছিল।
”তোমার আবার ছোটাছুটি করা উচিত, ডায়েটিংও।”
রত্না একসময় শট ও ডিসকাস ছুঁড়ত। বিশ্ববিদ্যালয় আর বাংলা দলের প্রতিনিধি হয়ে বছর চারেক ভারতের কিছু জায়গায় গেছল। চাকরিটা তখনই পাওয়া এবং বিয়েও। অ্যাথলেটিকস জীবনের মতো ওর বিবাহিত জীবনও দ্রুত শেষ হয়ে যায়।
একবার চণ্ডীগড় যাবার সময় টিমের কোচের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয় ট্রেনে। সেটা চূড়ান্ত হয় কোচের ঘরে মধ্যরাত পর্যন্ত কাটিয়ে। ব্যাপারটা যথেষ্ট জানাজানি হয়েছিল। বাপের বাড়ির অমতে অবশেষে সেই কোচকেই রত্না বিয়ে করে।
চারমাসের মধ্যেই স্বামীর সঙ্গে তার বিচ্ছেদ ঘটে। রত্নার কাছে লোকটি লুকিয়ে গেছল তার আগের বিয়ের কথা। মালদহের গ্রাম থেকে তার সতীন এক ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতায় এসে পৌঁছতেই সে বাপের বাড়ি চলে আসে। আজও সেখানেই আছে, কুমারী সময়ের পদবি নিয়ে।
রত্নার বাবা ও বড়দা আলু ব্যবসায়ী, মেজদার ছিট কাপড়ের দোকান হাতিবাগানে, পরের ভাই ডেকরেটিং ব্যবসা শুরু করেছে, দুই বোনেরও বিয়ে হয়ে গেছে। স্বচ্ছল পরিবার, রত্না সেখানে বোঝা নয়, কিন্তু চোখের মণিও নয়।
সন্দীপ মাঝে মাঝে অফিস থেকে ফেরার পথে গল্প করতে যায় মাণিকতলায় উকিল বন্ধু প্রফুল্লর সেরেস্তায়। বাড়ির বৈঠকখানাটা কাঠের পার্টিশান দিয়ে এবং প্রচুর আইন বিষয়ক বই সাজিয়ে বারো বছর ধরে প্রফুল্ল বসছে। রমরমা পসার নয় তবে চলে যাচ্ছে।
দেড় বছর আগে সেখানেই সন্দীপ প্রথম দেখেছিল রত্নাকে। খোরপোষের মামলা করার জন্য অফিসের একটি মেয়ের সঙ্গে ও এসেছিল প্রফুল্লর কাছে।
”সানু একে চিনিস, নামকরা অ্যাথলিট রত্না গড়াই।”
”নামকরা আর কি, অল্প কদিনই তো নেমেছিলুম। অল ইন্ডিয়াতেও তেমন কিছু করিনি।”
”গত বছরও তো আমাদের অফিসের অল ইন্ডিয়া স্পোর্টসে সেকেন্ড হয়েছিলি ডিসকাসে।” বান্ধবীর এই সংশোধন রত্না গায়ে মাখল না।
”হ্যাঁ, ভারী তো অফিস স্পোর্টস, সবই তো আমার মতই বুড়ি, আধবুড়ি। চাকরি রাখার জন্য নামা।”
রত্নার সরল স্বীকারোক্তিতে সন্দীপ হাঁফ ছেড়েছিল। কেননা সে জীবনে এই মেয়েটির নাম শোনেনি। কিন্তু ওর খসখসে ভারী গলায় এমন একটা কিছু ছিল শোনামাত্র সন্দীপের নার্ভগুলো, এমনকি পেশিও শিরশির করে ওঠে। দেয়ালে নখ দিয়ে আঁচড়ালে যেমনটি হয়, বাহুতে কাঁটা উঠেছিল। সে অনুভব করেছিল যৌন উত্তেজনা। এর পর সে উকিল ও মক্কেলের মধ্যে দরকারি কথাবার্তা থেকে নিজেকে সরিয়ে খবরের কাগজে চোখ রাখে।
বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল, বাজ পড়ারও কয়েকটা শব্দ হয়। তাই ওরা বাড়ি যাবার জন্য ব্যস্ত হয়ে প্রফুল্লর সেরেস্তা থেকে বেরিয়ে পড়েছিল। রত্নার বন্ধুটি রাস্তাতেই বিদায় নেয়।
ওরা সেদিন ট্রাম বাস পায়নি। কোনো কারণে বন্ধ হয়ে গেছল। মিনি বাসে ঘাড় হেঁট করে দাঁড়াতে দুজনেই রাজি না হওয়ায় তারা হেঁটে শ্যামবাজার পর্যন্ত যায়।
সন্দীপ পরদিন খবরের কাগজে দেখে, কয়েক লাইনে বলা হয়েছে: একটি বালক সরকারি বাস চাপা যাওয়ায় জনতা বাসে অগ্নিসংযোগ করে, কয়েক রাউন্ড গুলি চলে, দুজন হত। তারপর রুট থেকে ট্রাম-বাস প্রত্যাহার করা হয়।
”আমি মামলা মোকদ্দমায় যেতে চাই না। দশ বছর তো হয়ে গেল, দিব্যিই আছি। কোনো অসুবিধে যখন হচ্ছে না তখন ঝুটঝামেলায় গিয়ে লাভ কি!” হাঁটতে হাঁটতে রত্না কথা বলে যাচ্ছিল। ”কিন্তু কি জানেন, লোকটা মহা খচ্চচর। আবার একটা মেয়ের সঙ্গে একই কাণ্ড করেছে যা আমার সঙ্গে করেছে। আপনি তো শুনলেন যা যা উকিল বাবুকে বললুম।”
”না আমি শুনিনি।”
রত্না মুখ ফিরিয়ে অবিশ্বাসী চোখে তাকিয়েছিল।
”ডাক্তার বা উকিলের কাছে মানুষ তার ব্যক্তিগত গোপন কথা বলে, ওসব শুনতে নেই বাইরের লোকের।”
‘তা ঠিক। তবে কোর্টে মামলা উঠলে তখন তো হাটে হাঁড়ি ভাঙে। আমার হয়েছে সেই মুশকিল। দাদার মেয়ের বিয়ের সম্বন্ধ হচ্ছে, খুব কনজারভেটিভ ফ্যামিলি আমাদের, বংশে আমিই একমাত্র মেয়ে কলেজে পড়েছি, বি.এ. পাশটা করিনি অবশ্য।…আমাকে বিধবা বলে পরিচয় দেওয়া হয়েছে পাত্র পক্ষের কাছে।”
