”যা জোটে। আমাকে বলেছে বোম্বাইয়ে দিল্লি দরবার হোটেলে ডিশ ধোয়ার কাজ করেছে, একটা ফিল্ম স্টুডিয়োতে ছুতোর মিস্ত্রির হেল্পার ছিল বছরখানেক…”
হাসি আবার চামচে হলুদভাত তুলল। বোঝা যায় খাওয়ার খুব ইচ্ছে নেই, শুধু কথা বলতে চায়।
ঠিকই বলেছে হাসি: প্রথম যৌবনে সুহাস সুদর্শন, স্মার্ট, সবথেকে প্রতিশ্রুতিবান ছিল তাদের মধ্যে। বংশে অমন গৌর ত্বক, ঘন কোঁকড়া চুল, গভীর চোখের মণি আর তীক্ষ্ন নাক ও চিবুক কারুর হয়নি। সন্দীপের মনে আছে, সুহাস উপস্থিত থাকলে সেখানে সবাই মিইয়ে যেত, কথাবার্তার ধরন বদলে যেত। উদ্যম ছিল সুহাসের, ওকে দমানো বা থামানো যেত না। শুধু মেয়েরাই মুগ্ধ হত না, পুরুষরাও ওর ঝাঁঝালো প্রাণপ্রাচুর্যে আর কথায় চনমন করে উঠত। ঝকঝকে দাঁতের ঝিলিক দিয়ে তরুণ সুহাস যখন কুড়ি-বাইশে তখনই সে ক্যানিং থেকে মাছ কিনে এনে বাজারে স্টল নিয়ে বিক্রি করেছিল। ব্যবসাটা শুরুর পনেরো দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে গেছিল। এরপর শিলিগুড়ি থেকে সে চোরাচালানি জিনিস কিনে কলকাতায় বিক্রির কাজে নামে। মাস তিনেক পর তাকে দেখা গেল একটা ছাপাখানা ইজারা নিয়ে সাপ্তাহিক সিনেমা পত্রিকা ছাপছে। সুহাসের কোনো উদ্যোগই নিজের টাকায় নয় যেহেতু টাকাই তার ছিল না। যাদের টাকা নিয়ে তার ব্যবসা, তারা কিন্তু পরে কোনো অভিযোগ তোলেনি বা আইনের আশ্রয় নেয়নি। লোককে বোঝাবার বা বিভ্রান্ত করার ক্ষমতা ওর ছিল।
হাসি খাবারের এক-তৃতীয়াংশ ফেলে রেখে ক্ষমাপ্রার্থীর মতো মুখ করে বলল, ”আর পারছি না সানুদা।”
”থাক দরকার নেই।”
ওরা রাস্তায় বেরিয়ে কিছুটা একসঙ্গে হেঁটে আলাদা পথ নেবার আগে একবার দাঁড়াল।
”পানুদার সঙ্গে অনেকদিন দেখা হয়নি, নিশ্চয় শুনেছে। হয়তো ওর সঙ্গেই আমার বিয়ে হত যদি না সুহাস এসে পড়ত। তাহলে বোধহয় সকলের পক্ষেই ব্যাপারটা ভালো হত, তাই না?”
সন্দীপ এবং হাসি হুবহু একই রকমের পাতলা স্বচ্ছ হাসিতে মুখ ভরিয়ে তুলল যাতে কোনো দ্বিমত বা বিরোধ নেই।
”সারাজীবনই মাশুল গুনে যাবে একটা লোক, তা হয় না…একটা সময় আসে যখন…তুমি কি পানুদার সঙ্গে কথা বলবে? যদি চায় তাহলে আমি গিয়ে বরং দেখা করব…তোমায় যা যা বললাম তাই বলব, আমি ওর পায়ে ধরব, যা কিছু অন্যায় বিভুর বাবা করেছে ওর প্রতি…”
”কিন্তু শুধু তো পানুই নয়…”
সারা পাড়ার ধারণা পিণ্টু আর দুলাল ধরা পড়েছিল সুহাসেরই দেওয়া খবরে। দুলাল মারা গেছে জেলে, পিণ্টুর আজও কোনো খোঁজ মেলেনি। মাকে নিয়ে দুলাল আশ্রিত ছিল মামাবাড়িতে। পিণ্টুর বাবা দু বছর আগে মারা গেছে। ওর একটা বোন যাত্রায় অভিনয় করে ছয়জনের সংসারটাকে ভাসিয়ে রেখেছে।
”পানুদা যদি ওকে ক্ষমা দেখান তাহলে অন্যরা সাহস পাবে না…”
”সুহাসকে নিয়েই কি জীবন কাটাবে?”
”ও আমার স্বামী।”
”বিভু কী বলছে?”
”বাবাকে ও এই প্রথম দেখছে। কথা বলে না, দূরে দূরে রয়েছে।”
”বাবার সম্পর্কে কিছু কথা নিশ্চয় ওর কানে গেছে।”
হাসি মাথা হেলিয়ে ফ্যাকাশে মুখে বিড়বিড় করল।
”বাবার সম্পর্কে ওর ধারণা বদলে দিতে পারে শুধু পানুদা। ও যদি দেখে পানুমামা কথা বলছে বাবার সঙ্গে তাহলে…ওর কাছে পানুমামা ভগবানতুল্য।”
”আচ্ছা আমি কথা বলব ওর সঙ্গে।”
স্বস্তি ফুটে উঠল হাসির মুখে। ওদের দু পাশ দিয়ে মানুষের স্রোত ভুলে গিয়ে সে সন্দীপের হাত দুই মুঠোয় কয়েক সেকেন্ডের জন্য ধরে ছেড়ে দিল।
”তাহলে জানিও, আমি যাচ্ছি, দেরি হয়ে গেছে।”
সমস্যার ছোপ মুখ থেকে মুছে হঠাৎ নিশ্চিন্তি এনে ওকে প্রফুল্লতা দেওয়ায় হাসিকে এখন কুমারীর মতো লাগছে। ওর যে বারো বছরের একটা ছেলে আছে কেউ তা বিশ্বাস করবে না। এক সময়ে ওকে ভালো লেগেছিল এটা আবার তার মনে পড়ল।
”বেচারা।”
দ্রুত হেঁটে যাওয়া হাসির দিকে তাকিয়ে সে অলকা বা রত্নার সঙ্গে কোনো সাদৃশ্য খুঁজে পেল না।
অন্ধ একটা রাগ, একটা বিস্বাদ পলকের জন্য তাকে ঝাঁকুনি দিল, হাসি, পানু সুহাস এরা তার জীবনের একটা ক্ষুব্ধ, বিরক্তিকর সময়ের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। বাল্য, কৈশোর থেকে যৌবনের প্রথম কয়েকটা বছর পর্যন্ত যখন সে বাড়িতে বা বাইরে বন্ধুহীন, জগৎ সম্পর্কে সন্দিগ্ধ, সুকুমার বৃত্তিগুলি স্ফূরণে অনাগ্রহী তখন হাসিকে কেন্দ্র করে তারই বয়সি দুজন অন্য এক পৃথিবীতে চলে গেছিল তাকে ফেলে রেখে।
আবার ওরা তার জীবনে ফিরে এল কিন্তু কোনো উপহার সঙ্গে আনল কি? হয়তো দশ বছরের সহিষ্ণুতা, ক্ষমা, আত্মত্যাগ, …সুহাসের সঙ্গে বসবাস মানেই তো ধ্বংস হওয়া, এসবের সাহায্যে হয়তো সে হাসিকে বা ওর মতোদের শ্রদ্ধা করতে শিখবে। কিন্তু ব্যাপারটা অর্থহীন কেন নয়? হাসি মাত্র তেত্রিশ বা চৌত্রিশ বছরের। দেহ মন অনেক কিছু চায় নিশ্চয়। পানুকে নিয়েই জীবন কাটাতে পারে, দরকার কি ব্যর্থ একটা ভালোবাসাকে ধরে রাখার? সুহাস সুখী হবে না কিন্তু পানু হবে। হাসি কি জীবন উপভোগ করতে চায় না!
কয়েক ঘণ্টা পর ট্রাম থেকে নামা রত্নাকে ইনডোর স্টেডিয়ামের গেটের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে সন্দীপ আর একবার ভাবল, হাসির মতো নয়, রত্না চালাক, স্বার্থপরও কিন্তু জীবনকে হাতছাড়া করায় ব্যস্ততা ওর নেই। যা পায় কুড়িয়ে নেয়। বিয়ের বয়স, যদি শরীরের আকর্ষণের ভিত্তিতে বিচার করতে হয়, তাহলে পুরোমাত্রায় বজায় আছে, যদিও সে মধ্য তিরিশে।
