”ওর জন্য আমার দয়া হয়েছিল, এমন কথা শুনতে ভালো লাগে না, ইচ্ছেও করে না। তোমাদের যদি মনে হয়, ইচ্ছে করে, বিশেষত পানুদার, কেননা সবার থেকে তারই বেশি দয়া করার কথা, তাহলে তোমরা মিলে ওকে দয়া দেখাতে পার। কিন্তু আমার কাছে সে আমার স্বামী। সে বিভুর বাবা। সে একমাত্র মানুষ যাকে ভালোবেসেছি, এখনও বাসি।”
শেষের বাক্যটি বলার সময় তার গলা ভেঙে গেল, মুখটা দেয়ালের দিকে ফেরাল। সেই সময় বেয়ারা ফ্রায়েড রাইসের প্লেট হাতে টেবলে এসে না দাঁড়ালে সন্দীপ ওর হাতটা স্পর্শ করে জানিয়ে দিত, বুঝেছি।
”স্বীকার করছি, ও দোষী”, নিজেকে সামলে তুলে হাসি আবার শুরু করল, ”ওর দোষ ঢাকার চেষ্টা আমি করছি না। কিন্তু সারাজীবনই কি মানুষটা শাস্তি পেয়ে যাবে, এটা কি ঠিক? ও তোমারই বয়সি সানুদা, কিন্তু আসলে ওর আর বয়স নেই। বাড়ির সামনে ওকে যখন দেখলাম, দোতলায় জানলার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে…”
কাগজের ন্যাপকিনটা মুঠোয় পাকিয়ে দাঁতে চেপে ধরল। নিজেকে শান্ত রাখতে, কান্নায় ভেঙে না পড়ার জন্য। সন্দীপ এবার হাত বাড়িয়ে ওর হাতে আলতো চাপড় দিল বন্ধুর মতো।
”দেখ সানুদা”, নিঃশ্বাস চেপে হাসি মাথা এগিয়ে আনল কেননা তিন হাত দূরের টেবলে একাকী লোকটি তাদের কথা শোনার চেষ্টা করছে। ”তুমি তো ওকে জান। তোমার নিশ্চয় মনে আছে অল্প বয়সে ও কেমন ছিল, তোমাদের মধ্যে সব থেকে ভালো দেখতে, সব থেকে অহংকারী। তাই নিয়ে গোঁয়ার্তুমি ঔদ্ধত্যও ছিল, পৃথিবীকে তুচ্ছজ্ঞান করত। আর যে লোকটি সেদিন বাড়ির সামনে ঘুরঘুর করছিল তাকে দেখে মনে হল একটা ভাঙা পোড়ো বাড়ি। ভিখিরির মতো দেখাচ্ছিল…
”আমি শুনেছিলাম, ওকে নাকি দেখা গেছে পাড়ারই কাছাকাছি পাতাল রেলের মজুরের কাজ করতে। খালপাড়ে ঝুপড়িতে নাকি থাকতে দেখেছে কেউ কেউ। বিশ্বাস করিনি…
”ভাবতাম বাড়িতে ফেরার সাহস বোধহয় হবে না…অনেকদিন রাস্তায় দাঁড়িয়ে বড়ো বড়ো যন্ত্রপাতি দিয়ে মাটি তোলার কাজ দেখার ছলে ওকে খুঁজেছি। চাইতাম ফিরে আসুক আবার বিভুর কথা ভেবে চাইতাম না…ভাবতাম ওকে টাকা পাঠাই…কিন্তু কীভাবে?
”জানলার পর্যার ফাঁক দিয়ে সেদিন ওকে দেখছিলাম। ঠাটা রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে দরদর ঘামছে, কঙ্কাল চেহারা, চোখ গর্তে বসা, হাত-পা কাঠির মতো, মারখাওয়া গোরুর মতো তাকাচ্ছে, একেবারে হেরে যাওয়া মানুষ একটা…যখন জানলার দিকে তাকাল আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না…ছুটে সিঁড়ি দিয়ে নেমে দরজা খুলে ওকে ডাকলাম…
”এগিয়ে আসার আগে একটু ইতস্তত করল। দরজা পেরিয়ে ঢুকে এল আমার মুখের দিকে না তাকিয়ে, তারপর কী যে হল আমার, দরজা তখনও খোলা, আমি কান্নায় ভেঙে পড়লাম ওর বুকের ওপর।”
হাসির হাতের উপর সন্দীপের হাত। ও খাচ্ছে না এবং কাঁদছেও না। সে চোখ ইশারায় খাবার দেখিয়ে বলল, ”ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।”
মুখ নিচু করে হাসি খেয়ে গেল কিছুক্ষণ। ”তোমাদের বংশের অসুখটাই পেয়েছে। ওর বাবার ছিল, তোমার বাবারও ছিল। যখন অ্যাটাক হয় নিথর হয়ে বসে থাকে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে, হাতটুকু পর্যন্ত তুলতে পারে না। তোমার বাবার কথা তো মনে আছে? তাছাড়া পেটের গোলমাল, হজম ক্ষমতা একদমই নষ্ট হয়ে গেছে, কিছু খেতে পারে না…ডাক্তার বললেন, সেবাযত্ন আর নিয়ম মেনে চলা, এই একমাত্র চিকিৎসা…
”পানুদার সঙ্গে দেখা করব ভেবে একদিন ওর অফিস পর্যন্ত গিয়ে ফিরে এসেছি। মনে হল হয়তো এমব্যারাসড হবে। আমার জন্য অনেক করেছে, এই কাজটা পানুদাই চেষ্টা করে জোগাড় করে দিয়েছে, বিভু তো ওকে প্রায় বাবার মতই দেখে…
”সানুদা ওকে ফিরিয়ে দেওয়া আমার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়, একেবারে শেষ হয়ে গেছে লোকটা, তুমি তো ওর চরিত্র জান, সামান্য এক ফোঁটা আশাও কোথাও যদি থাকত তাহলে এমন লজ্জাকর ভাবে মাথা নিচু করে ও ফিরে আসত না।”
সন্দীপ অবশ্য হাসির মতো অত নিশ্চিত নয় এই ব্যাপারে, সুহাস ভান করায় ওস্তাদ এবং জীবনধারা বদলাবার প্রতিশ্রুতি এটাই তার প্রথমবার নয়। ব্যক্তিগতভাবে সন্দীপের কোনো রাগ বা বিদ্বেষ ওর প্রতি নেই। পানু হয়তো ওকে ক্ষমা করে দিয়ে থাকবে। কিন্তু হাসিকে তার স্বামীর হাত থেকে বা দয়া মায়া মমতার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য পানু কি চেষ্টা করবে না? গত দশ বছর ধরে হাসির উপর ওর একটা অধিকার এসে গেছে।
”ওর সম্পর্কে পাড়ায় অনেক কথাই হয়েছিল, তুমি নিশ্চয় সেসব জান। ওর জন্যই দুটো ছেলে পুলিশে ধরা পড়ে, নকশালরা ওকে পেলে খুন করবে, পানুদাকে…এসব কথা আমিও শুনেছি, ওহ কি দিনই না আমার গেছে। সারা পাড়া আমায় ঘেন্না করত। পানুদা তখন পাশে না দাঁড়ালে…ওর কাছে আমার ঋণ শোধ করার নয়।”
”সুহাস কি ভয়ের মধ্যে রয়েছে? এখন তো ওসব ব্যাপারে খুনটুন হচ্ছে না, গুণ্ডামি, ডাকাতি, চোরাকারবারের অধিকার নিয়েই তো যা কিছু হয় এখন।”
”ভয় নয়, বোধহয় লজ্জা। ও জানে তোমরা সবাই ওর সম্পর্কে কী ভাব। তোমাদের বিশেষত পানুদার, মুখোমুখি হলে কী ঘটবে তাই নিয়েই ওর কেমন যেন চিন্তা, আমার ঘাড়ে বসে খাবে এতেও ওর লজ্জা। এখনই কাজকর্মের কথা বলছে।”
”কী করতে চায়?”
সুহাস কখনো বাঁধা কাজ করেনি, নিয়মমাফিক কাজ শেখেওনি। শুধুই লোক ঠকিয়ে গেছে।
