-নিজে কিনে এনেছে কিনা তাই মেজাজ দেখান হল।
ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল চিনু। কথাটা তার কানে গেছে।
-কি বলছিস কি?
-কি আবার বলব। ওপরের জেঠিমারা সেবার ভাতে রেঁধেছিল। একদিন খেয়েছে, তার গল্পের ঠ্যালায় কান পাতা যায় না, যেন ওরা ছাড়া আর কেউ খেতে পারে না। ঝাল কম দিয়েও তো রাঁধা যায়।
একটু থেমে চিনুর মুখের দিকে তাকিয়ে রমা আবার বলল।
-ঝাল না দিয়ে রাঁধলেও চলে। যে যার ইচ্ছেমত ঝাল দিয়ে নেবে।
হঠাৎ হো হো করে হেসে উঠল চিনু। ঘাড় ফিরিয়ে এই মুহূর্তে মাধবীর মনে হল, রমাটা এখনো কচি। সাত-তাড়াতাড়ি ওর বিয়ে না দিলেও চলে।
-তাই ভালো। ঝাল পেলেই তো তোমার মেয়ের পেটটা রবারের হয়ে যায়। হাঁড়িসুদ্ধ ভাত সাবড়ে দেবে।
-আহা হা।
আর কথা জোগাল মা রমার। চিনুর দিকে পিছন ফিরে দাঁড়াল। লজ্জা করছে তার। হলেই বা দাদা, শরীর নিয়ে কথা বললে এখন অস্বস্তি লাগে। শরীর নিয়ে কথা বিশ্বও বলে, তখনো কেমন কেমন লাগে। কিন্তু এ দুটোর মধ্যে তফাত আছে। দুজনেই এক বয়সী, দুজনেই পুরুষ মানুষ তবু তফাত। এটা কি একই মায়ের পেটে জন্মেছে বলে, না দুজনের বলার মধ্যে, উদ্দেশ্যের পার্থক্য আছে? নিশ্চয় পার্থক্য আছে, না হলে এখন খামকা বিশ্বর কথা মনে পড়ল কেন! এখন মনটা খুশি লাগছে তাই বিশ্বকে মনে পড়ছে। মনের সঙ্গে মনে-পড়ার একটা সম্পর্ক আছে নিশ্চয়।
-কৌটোটা খুলে দেখ সরষে আছে কি না।
কথাটা বলে মাধবী ঘরে গেল। শরীর খারাপ লাগছে। এবার সে শুয়ে পড়বে।
.গনগনে ক্ষিদে নিয়ে রোজই সানু স্কুল থেকে ফেরে। দালানে পা দিয়ে শুরু হয়ে যায় তার চীৎকার। হাতের কাজ ফেলে তখন রমাকে ছুটে আসতে হয়। ওইটুকু ছেলে সেই কোন সকালে দুটি খেয়ে গেছে। ক্ষিদে তো ওর পাবেই।
আজ রমা বিশেষ ব্যস্ত হল না। আঙুলে চুল পাকিয়ে চিরুণী দিয়ে তা ছাড়াচ্ছিল। ঘর থেকেই সে সানুকে ডেকে বলল:
-চট করে একবার মুদির দোকান যা। সরষে নিয়ে আয় চার পয়সার।
-কেন?
-দাদা একটা জিনিস এনেছে।
কথাটা অবিশ্বাস্য। তার সামান্য জীবনের অভিজ্ঞতায়, কখনো দাদাকে কোন জিনিস আনতে দেখে নি। বল্টু যখন আম্পায়ার থাকে তখন তার দলের কেউ বোল্ড আউট হলেও আউট দেয় না। সঙ্গে সঙ্গে নো-বল ডাকে। যদি কখনো বল্টু আঙুল তুলে আউট দেয় তা’হলে সেটা দাদার জিনিস আনার থেকেও আশ্চর্যের ঘটনা হবে না।
-মুদির দোকান তো এইখানে, যাবি আর আসবি!
-কি এনেছে দাদা?
সানু তার সন্দেহটা কথার সুরেই বলে দেয়। কেননা, আগেও রমা কাজ করিয়ে নেবার জন্য মিথ্যে কথা বলেছে। আঙুলটা আলগা হয়ে গেছল রমার। তাই জোরে চিরুণী টানতেই চুলের গোড়া জ্বালা করে উঠল।
-যাই আনুক না, ওইটুকু ছেলের অত কথায় কাজ কি।
-পারব না যেতে।
-আস্তে, মা শুয়ে আছে না পাশের ঘরে। হাত থেকে চিরুণীটা কেড়ে নিল সানু।
-কি বাঁদরামো হচ্ছে শুনি।
-যদি মিথ্যে হয় তা হলে চার আনা পয়সা দিবি, বল?
-কেন, মার কাছে চাইতে পারিস না। আমি কি পয়সার গাছ?
-তবে যাব না।
চিরুণী ফিরিয়ে দিল সানু।
-সরষে না আনলে একটা জিনিস আর খাওয়া হবে না। দালানে গামলা ঢাকা আছে তোর খাবার, খেয়ে নে।
সানুর সঙ্গে রমাও এল দালানে। গামলা সরিয়েই সানু তাকাল রমার দিকে। বল্টু আম্পায়ারের আঙুল আকাশমুখো হলে সে এতটাই আশ্চর্য হত।
-পয়সা দে।
-বা রে, আমার কথা কি মিথ্যে হয়েছে যে পয়সা দোব?
-তা হলে দোকানি কি অমনিতে সরষে দেবে!
.অন্ধকার ঘরে শুয়ে মাধবী ভাবছিল চিনুর কথা। এ বাড়িতে কি আশপাশের বাড়িতে যখনই সৎ, পরিশ্রমী, ভালো ছেলের কথা ওঠে, দৃষ্টান্ত দেওয়া হয় বিশ্ব’র। আর ঠিক তার উল্টোটি সম্পর্কে তাদের মনে পড়ে চিনুকে। গায়ে ফুঁ দিয়ে, বাপের অন্ন কি করে যে একটা জোয়ান ছেলে ধ্বংসাতে পারে, তারা তা বুঝতে পারে না। তার ওপর কারুর সঙ্গে মেশে না, মুখেও বড় বড় কথা। আজ চিনুর পকেট থেকে পড়ে যাওয়া বইটার মলাটে ঘোড়ার ছবি ছিল। চিনু রেস খেলছে। ভাবতে কষ্ট হয়। চিনু সৎ, পরিশ্রমী, ভালো ছেলে হতে পারল না।
চিনু তখন ছ’ বছরের, পাশের বাড়ির অরুণ চাকরির প্রথম মাইনেটা যখন তার মা’র হাতে তুলে দিল, তখন মাধবী সেখানে উপস্থিত। ছেলের কপালে সেই টাকা ছুঁইয়ে মা তার থেকে সত্যনারায়ণের শিরনীর জন্য টাকা সরিয়ে রেখেছিল। দেখে খুশি হয়েছিল মাধবী। অরুণের ফরসা মুখে রক্তের ছোপ, তার মায়ের চোখে স্নেহ আর সুখের চাউনি, স্নিগ্ধ করে দিয়েছিল মাধবীকে। তার মনেও সাধ জেগেছিল, কিন্তু চিনু তখন খুব ছোট। অরুণকে সে বলেছিল বায়োস্কোপ দেখাবার জন্য। তখন বয়স কতই বা আর, সাধ আহ্লাদ মরে যায় নি। বায়োস্কোপ দেখিয়েছিল অরুণ, সঙ্গে ছিল ওর মা, পিসি আর বামুন-দি। চিনুও জীবনে সেই প্রথম বায়োস্কোপ দেখল। খুব অবাক হয়েছিল, তারপরেও কতদিন সে হাতীর গল্প করেছে। সে বইটায় অনেকগুলো হাতী ছিল। মাধবী চেষ্টা করেও মনে করতে পারল না বইটার নাম। গল্পটাও ভুলে গেছে। শুধু মনে আছে মেয়েটার স্বামী ছবি আঁকত। বেশ ছিপছিপে চেহারাটি ছিল।
শিরনী দিয়েছিল অরুণের মা। পাড়ার অনেকে এসেছিল সত্যনারায়ণের পাঁচালি শুনতে। সবাই আশীর্বাদ করেছিল অরুণকে। ওর মা’র হাঁটাচলা লক্ষ্য করেছিল মাধবী। তারও অমন করে হাঁটতে ইচ্ছে করেছিল, কিন্তু চিনু তখন খুব ছোট। ওর লেখাপড়ার যত্ন নিতে শুরু করল সে। দিনেশকে মাস্টার রাখতে পর্যন্ত বলেছিল। কিন্তু অতটুকু ছেলের পড়ার কাজ তো দিনেশই চালিয়ে দিতে পারে। মাস্টার আর রাখা হয়নি। তাছাড়া লেখাপড়ায় সত্যি মাথা ছিল চিনুর। বেশ কিছুদিন দিনেশ যত্ন করে তাকে পড়িয়েছিল। চিনু বড় হবে। চিনু চাকরি করবে। চাকরির প্রথম মাইনেটা মা’র হাতে তুলে দেবে, সব টাকাটা। এমন কি বাসভাড়ার পয়সাটিও না রেখে। মাধবী সত্যনারায়ণের পুজো দেবে। পোস্টাপিসে কালকেই পাস বই খুলতে হুকুম দেবে আর পড়শীদের কেউ যখন বায়োস্কোপ দেখানোর কিংবা খাওয়ার কথা তুলবে, তখন মাইনের অঙ্কটা জানিয়ে লাজুক সুরে আপত্তি করবে চিনু। কিন্তু ওরা নাছোড়বান্দা, সেই ছোট্ট চিনু আজ কতবড়টি হয়েছে, পাশ করে চাকরি করছে। মায়ের হাতে টাকা তুলে দিচ্ছে। এতে ওদেরও আনন্দ। ওরা কেন ছাড়বে! তখন অসহায়ের মতো চিনু তার মায়ের দিকে তাকাবে, এই অবস্থা থেকে উদ্ধার পাবার জন্য।
