”খুবই জরুরি তাই, কোথায় দেখা করার কথা বল তো?”
”সেকি, এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেল! এইতো আমার বরাত, আমার কথা তো…”
”আমাকেই শুধু বলতে হয়, ভিখারির মতো আমাকেই শুধু দেখা করো দেখা করো বলে দর্শন চাইতে হয়।”
”তোমার পাশের চেয়ারের লোকটা কিন্তু যা দেখার দেখছে, আমার হিংসে হচ্ছে।”
”থাক আর মিথ্যে বলতে হবে না, হিংসে যে কত হয় তা জানি, চেয়ারের লোকটার হাঁপানি বেড়েছে, ছুটিতে আছে, নতুন একজন চেয়ারে,” স্বরটা অস্পষ্ট হয়ে পড়ল, বোধহয় মুখ অন্যদিকে ফেরানো।
”দারুণ হ্যান্ডসাম, তোমার থেকেও।”
”তাহলে ফোন রাখছি।”
”না না…এই ঠাট্টা করছি।”
রত্নার স্বরে ক্ষীণ উৎকণ্ঠার ছোঁয়া পেল। বোরডের মেয়েটা নিশ্চয় ঘড়ি দেখে সময়টা রাখছে পরে খোঁজ নেবে ঠিক এগারোটা-তেত্রিশে মার্কেটিং ডিভিশনের দুনম্বর টেবল থেকে কে ফোন করেছিল।
”আজকের জায়গাটা কোথায়?”
”বৌবাজার যাব, ওমাসে যে বালাটা গড়াতে দিলুম সেটা আজ দেবার কথা। সেখান থেকে বাসে কি ট্রামে উঠে…তুমি ঠিক ছ’টায় ইনডোর-স্টেডিয়ামের গেটে থেকো, হাইকোর্টের দিকে।”
সন্দীপ রিসিভার রেখে দিল। আর না শুনলেও চলে। ঘড়ি দেখল সে, দুটোর সময় হাসির টিফিন হয়। ওর সঙ্গে দেখা করতেই হবে, সুহাস ফিরে এসে কিছু জট তৈরি করেছে। হেঁটে হাসিদের এম্পোরিয়ামে দুটোয় পৌঁছতে গেলে কখন বেরোতে হবে, তার একটা আন্দাজ করে নিয়ে সে নিজের চেয়ারে ফিরে এল।
দরজা থেকেই হাসির সঙ্গে তার চোখাচোখি হল। তারা দুজনেই হাসল। কাউন্টারের ওধার থেকে হাসি বেরিয়ে এল। চিবুক তুলে সমুন্নত দেহে তেজি ভঙ্গিতে। সন্দীপের মনে হল এইটেই ওর সম্পর্কে সঠিক শব্দ। তেজি মেয়ে না হলে সরলভাবে, নম্রতা সহকারে এবং ভাগ্য যা কিছু ছুঁড়ে দিয়েছে তাই স্বীকার করে নিয়ে জীবনের মুখোমুখি দাঁড়ানো যায় না।
অভিযোগ করার মতো যাবতীয় কারণ ওর আছে! ওর মুখমণ্ডল স্বচ্ছ, সবকিছুই স্বচ্ছ। ওর গায়ে সাদা ব্লাউজ, মেঘরঙা তাঁতের শাড়িতে সাদা বিজলি রেখা আর বৃষ্টির ছাট। এখানকার সব মেয়েই তাই পরেছে। হাসির কপালে সিঁদুরের টিপটা সে আগে কখনো দেখেনি।
”আমার মনে হচ্ছিল আজই তুমি আসবে।”
”কেন জানি মনে হল, তাড়াতাড়ি দেখা করাটাই বোধহয় ভালো।”
”চলো কোথাও বসে কথা বলি। এখানে একটা দোকান আছে।”
হাসি তাকে নিয়ে যেখানে এল সেটা মুরারির দোকানের থেকে কুলশীলে মাত্র এক ধাপ উপরে। ভিতরে বসার জায়গা নেই, ফুটপাথে দাঁড়িয়ে কয়েকজন আলুরদম পাউরুটি খাচ্ছে। চেয়ার থেকে কেউ ওঠা মাত্রই ভিতরে অপেক্ষমানরা বসে পড়ছে। সন্দীপের নজরে পড়ল অফিসের ইউনিফর্ম পরা দুটি লোককে, কোনো অফিসের বেয়ারা বা ড্রাইভার হবে। হাতে গড়া রুটি আর তরকারির প্লেট প্রতি টেবলেই। মাংসের ঝোল নিয়েও কেউ কেউ। কর্মচারীদের হাঁক আর টেবলে প্লেট রাখার শব্দ ছাড়া আর সবই নীরব।
”দিদি আসুন, জায়গা আছে।”
ভিতর থেকে হাতছানি দিল দোকানের ব্যস্ত পরিবেশক ছেলেটি। হাসিকে দেখে মনে হচ্ছে, সম্ভবত দুপুরেও এখানে খেতে আসে।
”এখানে বসে তো কথা বলা যাবে না, চল অন্য কোথাও যাই। বড্ড গরম।”
হাসিকে বিব্রত দেখাল। অন্য কোথাও কত খরচ পড়বে তাই ভেবেই বোধহয়।
”তোকে আজ চীনে খাবার খাওয়াব। আমার চেনা একটা দোকান এখানেই আছে।”
মিনিট চারেক হেঁটে ওরা ঢুকল সেই দোকানটিতে যেখানে প্রায়ই রত্নাকে নিয়ে সন্দীপ বসে। আজও তার ইচ্ছে ওকে নিয়ে এখানে কিছু খাওয়ার, এদের চিকেন-ছৌ ছৌ রত্নার ভালো লাগে। কিন্তু একই দিনে দুবার একজায়গায় খাওয়া যায় না।
দেয়াল ঘেঁষে দু-তিনটে খালি টেবল। পিছনের দিকে একটা ওরা বেছে নিল। অন্যান্য টেবলে বীয়ারের বোতল এবং আরামলোভী মানুষ। সবাই মুখ ফিরিয়ে হাসিকে দেখল বা দেখছে। সন্দীপ বীয়ার চাইল আর হাসির জন্য পেট ভরানোর মতো ফ্রায়েড রাইস। ওয়েটার বীয়ারের সঙ্গে দুটি গ্লাস এনেছিল, সন্দীপ তর্জনী তুলে একটি গ্লাসেই বীয়ার ঢালতে নির্দেশ দিল।
”আজকাল মেয়েরাও খুব খাচ্ছে তাই ও…”হাসি প্রসঙ্গটা এড়িয়ে যেতে চায় বলেই চোখেমুখে কোনো ঔৎসুক্য প্রকাশ করল না। কিছুক্ষণের জন্য ওরা কথা বলা বন্ধ রাখল।
”পানুদার সঙ্গে কি এরমধ্যে তোমার দেখা হয়েছে?”
সন্দীপ মাথা নাড়ল।
”যদিও একই বাড়িতে থাকি, কারুর সঙ্গেই আমার বিশেষ দেখা হয় না।”
”ওর বউয়ের সঙ্গে হয়, তোমায় তো ভাত দিয়ে আসে।”
হাসি এসব খবর তাহলে রাখে, পানুর তো যাতায়াত ছিল ওর কাছে, কিংবা মার সঙ্গে কোনোসময় রাস্তায় দেখা হয়ে থাকবে।
”মার কাছে শুনলাম, অবশ্য সেদিন তোর কাছেই প্রথম।”
”পানুদা জানে, তাই না?”
”বলতে পারব না, হয়তো জানে। পাড়ায় যখন সবাই জানে।”
”ওর সঙ্গে একটু কথা বলা দরকার সানুদা…আমি নয়, আমার হয়ে তুমি বলবে। ব্যাপারটা পরিষ্কার হওয়া ভালো। তোমার ভাইকে আমি বুঝি। তোমাদের বাড়ির লোক কী ভাবে না ভাবে তাও জানি।”
ওর মুখে বিভ্রান্তি উৎকণ্ঠা। সুন্দর গোলাকার দৃঢ় বুকদুটি দ্রুত ওঠা-নামা করছে। হাসি কাঁদছে না।
”যদি দেখতে কী অবস্থায় ও এসেছে।”
”বুঝতেই পারছি ওকে দেখে তোর দয়া হয়েছিল।”
অস্ফুটে বলেই সন্দীপ অনুতপ্ত হল। বোঝা উচিত ছিল কথাটা ওকে আঘাত করবে, কিন্তু যা আশা করেছিল তার থেকেও তপ্ত প্রতিক্রিয়া ঘটল।
