”মানে, আমার শালীর মেয়ে পরশু গান করেছে একটা ফাংসানে, রবীন্দ্রভারতীতে। তারই রিপোর্ট…”’
টেবিলের ড্রয়ার টানল।
”…আমিও শুনতে গেছলাম, ভালোই গেয়েছে, অবশ্য গানের তেমন কিছু বুঝি না তবে মানুষের ফিলিং তো বুঝি। দুটোর জায়গায় চারখানা গাইতে হয়েছে…আধুনিক আর হিন্দি গীত…খুব বড়ো করে লেখেনি, এইসব ফাংসানের খবর ছাপাবার তো আলাদা বিভাগ আছে!…আমি বলেছি আপনার কথা, ভাই কাজ করে, ছাপাবার কোনো অসুবিধেই হবে না।”
সন্দীপ অনেক আগেই ধোঁয়া সামনের দিকে ছেড়েছে তবে মৃদু ভাবে। বোধহয় অঙ্কখাতার পাতা ছিঁড়ে লেখা হয়েছে। কাগজটার অন্য পিঠে তৃতীয় উপপাদ্যের ত্রিভুজটা আঁকা। গভীর মনোযোগে পড়ার জন্য সে কপাল কুঁচকোল।
”লেখাটা অবশ্য এধার ওধার করার দরকার মনে করলে করে নেবেন…একটা অল্প বয়সি নতুন গাইয়ে, তাকে তুলতে হলে কীভাবে লিখতে হবে সে ওরাই ভালো জানে…আর এইটে।”
স্টুডিয়োতে তোলা ছবি। ফুলদানির পাশে চিবুকে আঙুল ঠেকিয়ে রাখা মুখ। ভরি পাঁচেক সোনা, দোকানে বাঁধা খোঁপা, দুটি দীর্ঘ চোখ এইসবই চোখে পড়ে।
”বলব ভাইকে।”
”বলাবলি নয়, ছাপিয়ে দিতেই হবে।”
এর কাছেই প্রণবেশের কোটেশন অনুমোদন হবে কি হবে না বিচারের ভার। এখনই সুযোগ ব্যাপারটা তোলার। কিন্তু এই মুহূর্তে কথা পাড়লে, বুদ্ধিমান লোক, বুঝে নেবে। খুব সম্ভবত রাজি হবার ভান করে, শালার মেয়ের সংগীত রিপোর্ট ছাপিয়ে কাজ হাসিল করেই কলা দেখাবে। এই ধরনের গুণ না থাকলে সন্দীপ সযত্নে কাগজটা চার ভাঁজ করে ছবি সমেত মানিব্যাগের মধ্যে রাখল লোকটাকে নিশ্চিন্ত করতে। শালার বাড়িতে খাতির বাড়লে যে আত্মপ্রসাদ জমবে সেটা ভাঙিয়ে আদায় করাই ভালো। পানুকে বললেই হয়ে যাবে, নিশ্চয় এসব জঞ্জাল ছাপাবার ক্ষমতা ওর আছে। বড়জোর বলবে: ”তোমাদের কোম্পানি বিজ্ঞাপন দেয় কি?”
আশ্চর্য, পানুরও কিছু ক্ষমতা আছে! ওর জন্যই এখন এই চোয়ারে বসে ভালো সিগারেট টানতে টানতে সামনের বিগলিত মুখটি দেখার সুযোগ সে পেল। মানুও যে তার ভাই এটাও নিশ্চয় জানে। সারা অফিস তো জানেই।
মানুরই খ্যাতি পরিচিতিটা বেশি। অফিসেই একজন বলেছিল, ”আপনার ভাইয়ের নাম আর ছবি গত চার-পাঁচ বছরে যত ছাপা হয়েছে কোনো বড়ো বিজ্ঞানী কি মিউজিসিয়ান কি পেইন্টারেরও সারা জীবনও তা হয়নি।” মানু দুবার স্কুল-ফাইনাল ফেল করেছে। বছর তিন আগে বাণী জানিয়েছিল ওর পাসের ব্যবস্থা হয়েছে।
”আরে আর একটা কথা তো বলতে ভুলেই গেছি।”
সন্দীপ দরজার কাছ থেকে ঘুরে দাঁড়াল।
”আপনার বন্ধুর ব্যাপারটা। ওটা আমি দেখব।”
”কোন বন্ধু?”
আলটপকা কথাটা তার মুখ থেকে খসে পড়ল। কন্ট্রোলারের ভ্রূ বিস্ময়ে উঠে যেতেই সামলে নিয়ে সে বলল, ”প্রণবেশ। হ্যাঁ, কাল বলছিল আমায় আপনাকে একবার বলতে।”
”বলতে হবে না, আমার মনে আছে। বাঙালি ফার্ম, খেটেখুটে কম্পিটিশানের মধ্য দিয়ে দাঁড়াচ্ছে, চেষ্টা তো করতেই হবে হেল্প করতে…আচ্ছা যার কাছে গান শেখে, তার নামটা কি দেওয়া সম্ভব?”
প্রণবেশ বলেছিল, ”মদ টদ খায় তবে মাত্রা রেখে, মেয়েছেলের ঝোঁক নেই। সল্ট লেকে জমি কিনেছে, টাকা-ফাকার ব্যাপারে যদি আসে রাজি আছি।”
সন্দীপের মনে হল এখুনি বলে ফেলা যায়: ”স্যার কত টাকা আপনি নেবেন কোটেশান অ্যাপ্রুভ করতে, বলে ফেলুন।”
”কেন দেওয়া যাবে না! দেখি তো এরকম কত ছাপা হয়, অমুকের কাছে সংগীত শিক্ষা গ্রহণ করেছেন বা অমুকের ছাত্রী।”
”তাহলে একটু দিয়ে দেবেন।”
”কার কাছে শিখেছে?”
মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে ফ্যালফ্যালে দেখাচ্ছে। আজ সকালেই মানুর কাছে ধমক খাওয়া মুরারির মুখের সঙ্গে যেন পলকের জন্য মিলে গেল। খোলা ড্রয়ারের দিকে একবার তাকিয়ে বলল: ”লেখা নেই ওতে? আমার কাছেও তো নেই নামটা।”
”না, লেখা নেই।”
”বলেছিল কী একটা যেন। আচ্ছা ফোন করছি, না থাক, আমি বরং কালই আপনাকে জানিয়ে দেব। দেরি হবে না তো?”
”না সাপ্তাহিক তো, দু একদিনে আসে যায় না।”
নিজের চেয়ারে এসে তার প্রথমেই মনে হল মানু বা পানুর পরিচিত মহলে কি কখনো কেউ বলে, ‘ইনি সন্দীপের ভাই’, কখনো কেউ কি ওদের বলে ‘দাদাকে দিয়ে এটা করিয়ে দাওনা ভাই।’ কিংবা তোমার দাদার একটা অটোগ্রাফ চাইই। বড্ড ধরেছে ছেলেটা।’
প্রণবেশ তার সাহায্য চেয়েছে বটে কিন্তু আসলে সেটা পারচেসিং কন্ট্রোলারের অনুগ্রহ জোগাড় করে দেবার জন্য, তার নয়। নিজের অবস্থা নিয়ে সন্তুষ্ট ওরা থাকেনি, পানু মানু প্রণবেশ কেউ নয়। সে অসন্তুষ্ট বটে কিন্তু কাউকে অনুগৃহীত করার মতো গভীর অসন্তাোষ বোধ হয় তার মধ্যে নেই। না থাকায় সে কি পিছিয়ে পড়েছে?
অদ্ভুত একটা ঝাঁঝ তার মাথা থেকে পায়ের ডগা পর্যন্ত ওঠা-নামা করল। ক্রোধ নয়, হতাশা আর তিক্ততা এবং নিজের প্রতি অনুকম্পা ও বিরক্তি ছাড়া এটার কোনো মূল্য নেই। এইরকম অবস্থায় নিজেকে চাঙ্গা করার কথা ভেবে সে রত্নাকে ফোন করার জন্য উঠে গেল পাশের মার্কেটিং ডিভিশনের ঘরে।
পি বি এক্স বোর্ডের মেয়েটা আড়ি পেতে শোনে, বিশেষত ওপ্রান্তে যদি কোনো মেয়ে কথা বলে। রত্না নৈর্ব্যক্তিক কণ্ঠে ঠিক দরকারি কথাগুলোই যদি বলতে পারত তাহলে সন্দীপ উলটো দিকে দুটো টেবল পরে ডেপুটি ম্যানেজারের ফোনটাই ব্যবহার করত। কিন্তু রত্না ধরা গলায় আধো আধো স্বরে এমন দু-চারকথা বলবেই যাতে এক্সচেঞ্জ বোর্ডের মেয়েটা উৎকর্ণ হয়ে উঠবে। তবে রত্নার দিকের ফোনটা ধরতে হয় খিটমিটে মাঝবয়সি সেকশান ইনচার্জের চেয়ার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে। লোকটার ভীষণ ঝোঁক, মেয়েরা ফোন করতে এলে ঘাড় ফিরিয়ে শিল্পী সমালোচকের মতো তাদের নিম্নাঙ্গ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে একফুট দূর থেকে দেখার। কোনো কোনো ক্ষেত্রে, তার নস্যির কৌটো বা পেনসিল সেই সময় টেবল থেকে পড়ে যায় এবং ঝুঁকে মেঝে থেকে সেটি তোলার সময় তার মাথা আলতো ছুঁয়ে যাবেই ঊরু বা নিতম্বে। সারা অফিস এটা জানে এবং মেয়েরা ফোন হাতে নিলেই ঘরে মুচকি হাসি শুরু হয়। রত্নার বারণ আছে, গুরুতর বিষয় ছাড়া, তাকে ফোন করার।
