মিনিবাসে বহু মাস পর সন্দীপ আজ বসার জায়গা পেল, তাও জানলার ধারে। সকাল নটার পর, কলকাতায় কাজের দিনে এটা বিমূঢ় করার মতো অভিজ্ঞতা। গিরিশ পার্কে নেমে যাওয়া অবাঙালিনীদ্বয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিল সন্দীপ।
”এই তো এই বাড়িটা…এই যে এই যে নীচে ব্যাঙ্ক, বাসনের দোকান…”
কথাগুলোর সঙ্গে সঙ্গে বাসে দাঁড়ানোরা কুঁজো হয়ে জানলা দিয়ে তাকাবার চেষ্টা শুরু করল।
”চোদ্দতলা ভাঙা চাট্টিখানি কথা নয়। বহু লাখ টাকা খরচ করেছে, সহজে ভাঙতে দেবে না।”
”তৈরি করল কী করে, অ্যাঁ, কর্পোরেশনের পারমিশান ছাড়াই?…ঘুমোচ্ছিল নাকি!”
”ঘুষ দাদা, ঘুষ…সবই করা যায়, কলকাতাটাই বেচে দিতে পারেন।”
সন্দীপও ঘাড় বেঁকিয়ে আকাশের দিকে তাকাবার চেষ্টা করে বাড়িটার অর্ধেক মাত্র দেখতে পেল। ঘাড়ের কাছে মেরুদণ্ড যথেষ্ট মোচড় খেল না। ঘাড়ের ব্যায়ামটা করলে বোধহয় আর একটু বাঁকাতে পারত।
কিন্তু এই বাড়িটা চোদ্দতলা পর্যন্ত উঠল কবে? প্রতিদিনই সে এই রাস্তা দিয়ে যায়, অথচ একদমই নজরে আসেনি। রাস্তার দুধারে যতটুকু বাসের জানলা দিয়ে দাঁড়ানো বা বসা অবস্থা থেকে দেখতে পেয়েছে, বড়োজোর তিনতলা পর্যন্ত, তার বেশি আর কিছুই জানে না। উপর দিকে তাকানোটাই তো বহু বছর হয়নি।
সন্দীপ রীতিমতো অবাক হয়ে গেল। কাগজে হঠাৎ একদিন এই বাড়িটাকে নিয়ে মামলা, ভাঙার হুকুম, ইনজাংসন, ভাড়াটেদের দাবি, সুপ্রিমকোর্ট ইত্যাদির দ্বারা হইচই না উঠলে, কোনোদিন তো জানতেই পারত না, এমন লম্বা একটা বাড়ির পাশ দিয়ে রোজ দুবার সে যাতায়াত করে। কত জিনিসই দেখা হয় না সংকীর্ণ পথের জন্য। ময়দানের বা গঙ্গার ধার দিয়ে যাবার সময় দৃষ্টি কিন্তু অনেক উঁচুতে পৌঁছোয়।
সংসারেও অনেক কিছু দেখা হয়নি, সংকীর্ণতার জন্য।
আলোচনাটা চালু রয়েছে। অনেকেই তাদের অভিজ্ঞতার থলি থেকে তথ্য বার করছে। সন্দীপ তাতে মন দিল।
”আরে মশাই গরমেন্টের পতিত খাসজমি মাটি ঢেলে, রাস্তা ড্রেন বানিয়ে প্লট করে করে রীতিমতো বিজ্ঞাপন দিয়ে বিক্রি হয়ে গেল। কোটি কোটি টাকার কারবার…লালে লাল হয়ে গেল। স্রেফ ল্যান্ড রেকর্ডস অফিসের কটা লোককে…কাউকে টাকা খাইয়ে কাউকে জমির একটা তিন টাকার তিনকাঠার প্লট দিয়ে হাপুস করে দিলে দলিলপত্তর। গরমেন্ট জানতেও পারল না। তার জমি লোপাট হয়ে গেছে। মজার কথা কী জানেন, রাস্তা তৈরি করতে গিয়ে যখন জমির দরকার হল, গরমেন্ট তখন নিজের সেই জমিরই খানিকটা টাকা দিয়ে কিনল। কী বলবেন একে বলুন। দাদা তখন তো বললেন ঘুমোচ্ছিল নাকি! মোটেই ঘুমোয়নি, তখনই সব থেকে সজাগ ছিল।”
গভীর মনোযোগে সারা বাস শুনছিল। সন্দীপের পাশের লোকটি এই সময় বিড়বিড় করল: ”করাপশ্যান…তলা থেকে ওপর পর্যন্ত পচে গেছে। ধরে ধরে গুলি করা উচিত।”
”ব্রেন আছে বটে।” কুঁজো হয়ে সন্দীপের মুখের কাছে মুখ রেখে যে লোকটি দুর্গন্ধ নিঃশ্বাস ছাড়ছে এবং ঊরুর উপর ফোটা ঘাম ফেলছে, তারিফ জানাবার ভঙ্গিতে তাকে উদ্দেশ্য করেই বলল।
”একসময় বাঙালিদেরও ব্রেন ছিল, ভেজাল খেয়ে খেয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। কীসে ভেজাল নেই, ওষুধে পর্যন্ত। লোক মরে যাচ্ছে পরোয়া নেই, টাকাতো আসছে। এইরকম মেন্টালিটি না হলে টাকা করা যায় না।”
সন্দীপ জানলার বাইরে তাকাল। প্রণবেশের মুখটা ভেসে উঠছে তার মনে।
”সারাদেশটা লোকে থিকথিক করছে, কিছু মরা ভালো।”
সন্দীপের পাশের লোক কোলে রাখা ব্রিফ কেসটার হাতল আঁকড়ে কথাটা বলেই উঠে পড়ল। বাস বৌবাজার মোড়ে থেমেছে।
”পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধু লাগবে মনে হয়। আমেরিকা তো এন্তার অস্ত্র ওদের দিচ্ছে।”
লোকটি তার নিঃশ্বাসের শেষ কিস্তি সন্দীপের মুখে ছড়িয়ে পাশের খালি সীটে বসল। প্রণবেশের মুখটা মিলিয়ে গিয়ে এবার কাকার মুখ ভেসে উঠল। তার মনে হচ্ছে ওই দুজনই নানান ছদ্মবেশে বাসে রয়েছে।
কুড়ি মিনিট দেরিতে সন্দীপ অফিসে পৌঁছালো। প্রতিদিন এইরকম দেরিই তার হয়। তাকে দেখে বেয়ারা সুজিত আঙুলের ইশারায় পারচেসিং কন্ট্রোলারের কেবিনটা দেখাল অর্থাৎ ওখানে খোঁজ পড়েছে।
লেট হওয়ার জন্য এখানে ঝামেলা হয় না, সুতরাং খোঁজ পড়ার কারণ কী হতে পারে? দরজা ঠেলে কন্ট্রোলারের মুখটুকু চোখে পড়ার আগে পর্যন্ত সে একটি কারণও খুঁজে পেল না।
ফোন করছিল লোকটি। ব্যবসায়িক কথাবার্তাই হবে, কেননা টেবলে কনুই রেখে ঝুঁকে কপালে ডানহাতের তালু ঘষছে। অব্যবসায়িক হলে চেয়ারে হেলান দেয়। সন্দীপকে চোখের ইশারায় চেয়ার নিতে নির্দেশ দিল।
”একটা ছোট্ট উপকার করে দিতে হবে। আপনার ভাইয়ের ম্যাগাজিনে ছোট্ট একটা রিপোর্ট ছাপিয়ে দিতে হবে, আর একটা ছবিও।”
কাঁচুমাচু অথচ ব্যক্তিত্ব বজায়, দুটোই একসঙ্গে মুখে রয়েছে। সন্দীপ কোনটাকে প্রাধান্য দেবে বোঝার জন্য গম্ভীর হল।
”সিগারেট।”
বিলিতি প্যাকেটটা এগিয়ে দিল। নিজের জন্য একটা দিশি প্যাকেটও থাকে। ওই ব্র্যান্ডেই নাকি গত পঁচিশ বছরে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তবে বাইরের লোকের সামনে বার করে না।
সিগারেট ধরিয়ে প্রথম টানের ধোঁয়াটা সামনের দিকে না পাশে বার করবে তাই নিয়ে একটা ছোটো সমস্যায় সে পড়ল। কন্ট্রোলার তার অনেক ধাপ উপরের লোক।
