”বলতে পারছি না। হয়তো জানে, পাড়ায় তো সবাই জেনে গেছে।”
হঠাৎ চোখদুটো নিথর করে, কাকা অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে রইলেন। সন্দীপ যাবার জন্য উশখুশ করে বলল, ”আর কিছু?”
”সুহাসকে দেখো…মানুষ অনেক কিছু মনে রাখে প্রতিশোধ নেবার জন্য।”
দরজাটা আচমকা বন্ধ করে দিলেন। সন্দীপ দোতলায় ওঠার সময় ভাবল, পানু কি প্রতিশোধ নেবে? তেমন মানসিকতা তো ওর নয়। স্বভাবে মৃদু, কখনো ঝগড়া করেনি, উত্তেজিত হতেও দেখা যায়নি। ওকে নিয়ে কখনো কোনো ঝামেলা হয়নি। ‘ভালো ছেলের’ মর্যাদা একমাত্র ওকেই দিয়েছে এই পাড়া। বাচ্চচাদের ক্লাব আর নানাবিধ অনুষ্ঠান নিয়েই ব্যস্ত থাকত। ক্লাবঘরটাতেই তার বেশি সময় কাটত। দুটো বোমা পুলিশ ওই ঘরেই পেয়েছিল। সেটাও কি সুহাসের কাজ? হাসি কি এতই কাম্য যে সুহাস এমন জঘন্য উপায় নেবে?
পানুর দরজা বন্ধ রয়েছে। ভিতরে ভারী কিছু একটা টেনে নিয়ে যাওয়ার শব্দ। সন্দীপের হঠাৎ ইচ্ছা ছিল পানুকে সে একবার দেখবে। ওর পেটে এতদিন ধরে যন্ত্রণা হচ্ছে অথচ তাকে বলেনি, এজন্য সে ধমকাবে।
দোতলায় সন্দীপকে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মানুদের বাচ্চচা চাকরটা অবাক হয়ে তাকাতেই সে উপরের সিঁড়ি ধরল। ওর ডানহাতে বাজারের থলি থেকে লাউডগা বেরিয়ে ঝুলছে। আড়চোখে সে দেখল ছেলেটা কলিংবেল টেপার জন্য বাঁহাত তুলেছে। তিনতলায় পৌঁছনো পর্যন্ত বেল বাজার শব্দ পেল না। লোডশেডিং এখনও চলছে।
ভাতের থালা নামিয়ে রাখা মাত্রই বাণীকে সে অনুযোগের সুরে বলল, ”এতদিন ধরে ব্যথা পুষে রেখেছে অথচ আমি জানি না। ট্রিটমেন্ট করাচ্ছে কি?”
বাণী বুঝতে সময় নিল।
”খুব মারাত্মক হতে পারে।…ছেলেমানুষ তো নয়…লজ্জারও কিছু নয়। চুরি-ডাকাতি করে তো আর পুলিশের হাতে মার খায়নি, চেপে রাখার কি আছে!”
সে বাণীর বিব্রত মুখের দিকে এক পলক তাকিয়ে ডালের বাটিতে আঙুল ডুবিয়ে নাড়তে লাগল।
”করছে কী এখন?”
”লিখছে।”
পানুর লেখক হবার ইচ্ছাটা ছোটো থেকেই ছিল। স্কুলে মাস্টারমশাইরা ওর গদ্যের প্রশংসা করতেন। কম মাইনেয় পত্রিকায় চাকরি নেবার পিছনে নিশ্চয় ওর এই বাসনাটাই সক্রিয় ছিল। বছর দুই আগে একটা মাসিক পত্রিকায় ওর ধারাবাহিক উপন্যাস বেরোচ্ছিল। চার কিস্তি পর পত্রিকাটা উঠে যায়। সন্দীপ কখনো পানুর লেখা পড়েনি।
”লেখা ছাড়া বাড়িতে আর করে কী?”
”কী আর করবে, ছুটিছাটার দিনে দেবুকে কিছুক্ষণ নিয়ে বসে নয়তো ওই লেখা…কী যে লেখে, একটা পয়সাও তো পায় না।”
”তুমি জান না ওর পেটে মাঝে মাঝে ব্যথা হয়?”
”মাঝে মধ্য বলে তো…অম্বলের ব্যথা। কদিন আগে তো অপিসেই গেল না।”
দ্বিধাজড়িত উদ্বিগ্ন বাণীর স্বর থেকেই সে বুঝল, পানু চায়নি তার বউ জানুক। জেনে কিই বা করতে পারবে। অলকা বা রত্নার মতো বাণী চলাফেরা, চিন্তা বা উদ্যোগ নিতে অক্ষম, অর্থ রোজগারে অক্ষম। একা কখনো রাস্তায় বেরোয়নি। এবং পানু কদাচিৎ ওকে নিয়ে বেরোয়। স্বামীর বা সংসারের উপরও প্রভাব নেই। বেচারা।
”ওর কীসের ব্যথা হয়?”
উৎকণ্ঠায় বাণীর গলা বসে গেছে। হয়তো যন্ত্রণার কথা জানে। কিন্তু তার কারণটা সম্পর্কে সন্দেহ আছে তাই জেনে নিতে চাইছে।
”বিয়ের আগে একবার পুলিশে ধরেছিল নকশাল সন্দেহে, কোনো বদমাস লোকের কাজ। তুমি তো সে সময় কলকাতায় ছিলে না তাই দেখনি কী কাণ্ড হয়েছিল। হরদম বোমার শব্দ আর খুন। তখন যাকে পেত পুলিশে ধরত, থানায় মারধোর করত কথা বার করার জন্য। পানুকে ধরে নিয়ে যাবার পর পাড়ার দুটো ছেলে ধরা পড়ল…”
”উনি ধরিয়ে দিয়েছিলেন?”
ভাতের গ্রাস মুখে তুলতে গিয়ে সন্দীপের আঙুলগুলো মুহূর্তের জন্য অসাড় হয়ে গেল।
পানু ধরিয়ে দেবে কেন! সকলেই তো জানে এসব সুহাসেরই কাজ। হাসির চোখের আড়ালে পানুকে পাঠাবার দরকার ওর তখন হয়েছিল। এছাড়া কোনো কারণ, কোনো যুক্তি কি পানুর বিপক্ষে থাকতে পারে? মৃদু নম্রস্বভাব, কোনো রাজনৈতিক দলে নেই। কখনো ছিলও না, সৎ এবং ন্যায় এই দুটি পন্থা যথাসাধ্য অনুসরণ করে পানু বরাবর চলেছে।
বহু উদাহরণ আছে, নিজে অকারণে আর্থিক বা মানসিক অসুবিধায় পড়েও যথার্থ কারণটিকে ধরিয়ে দেয়নি।
”তোমার একথা মনে হল কেন?”
একটু রূঢ় হয়ে গেছল তার বলার ভঙ্গি, বাণী থতোমতো অসহায় হয়ে গেল।
”এতদিন ঘর করছ, তুমি চেনো না তোমার স্বামীকে?”
”আমি তা ভেবে বলিনি, দাদা। মা একদিন বলেছিলেন কিনা…”
সন্দীপ জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে বাণীর থেমে যাওয়া বাক্যটিকে সম্পূর্ণ করার আদেশ জানাল।
”মানে, হাসিদিকে উনি তখন নাকি বিয়ে করবেন ঠিক করেছিলেন…”
”হ্যাঁ, তাতে কী হয়েছে, বহুলোকের জীবনেই এমন ঘটে, ঘটবেও…বিয়ের পরেও ঘটে।”
সে শেষের কথাটা যোগ করল সম্ভবত নিজেকে ভেবে, নিজেরই সমর্থনে। পরমুহূর্তে তার মনে হল এটা করার কোনো দরকারই ছিল না।
”ওসব অনেকদিনই চুকেবুকে গেছে। পানুর সঙ্গে হাসির সম্পর্ক আর নেই। তাছাড়া সুহাসও এসে গেছে।”
”উনি হাসিদির বাড়ি মাঝে মাঝে যান।”
”কে বলল?”
বাণী জবাব না দিয়ে হঠাৎ চলে গেল। তবে সন্দীপের মনে হল ও যেন দরজার কাছে ধরা গলায় একবার স্বগতোক্তি করল, ”আমি জানি।”
অলকাও কিছু জানে কি? জানলেও সে একটি কথাও বলবে না। নিজের মর্যাদা সম্পর্কে অত্যন্ত সতর্ক। তাচ্ছিল্য অবহেলা দেখাবে, না জানার ভান করবে। বাণীর মতো সে ভাবপ্রকাশে অভ্যস্ত নয়। অলকা সম্ভবত বোঝে দেহ বা আবেগের মতো বড়ো দুটি ব্যাপারে পুরুষদের থামিয়ে রাখার মতো বোকামি আর নেই।
