অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে মুরারি কয়েক সেকেন্ডের জন্য গ্লাসে চামচ নাড়া থামাল।
”অ, আপনি দেখেছিলেন নাকি। সে কি আর এতক্ষণ পড়ে থাকে, সঙ্গে সঙ্গে কাকে তুলে নিয়ে গেছে।”
”তোমার লোকসান হল তো।”
ধন্য হয়ে যাবার অভিব্যক্তি ওর হাসিতে ফুটল।
”মানুদা ওই রকমই, কখন যে কী মেজাজ থাকে। চ্যারিটি ম্যাচের খানচারেক টিকিট এবার নোবই। এক একখানায় তিরিশ অন্তত পাব, গতবছরও পেয়েছিলুম।”
”পয়সাটা নাও।”
কাকা গঙ্গাস্নান আর বাজার সেরে ফিরছেন। রগ থেকে ঘাম গাল বেয়ে থুতনিতে এসে জমেছে। মুখ নামিয়ে ছোটো ছোটো কদমে হাঁটেন, এমনকি রাস্তা পার হবার সময়ও। কেমন একটা বিব্রত ভঙ্গি ওর চলাফেরায় সবসময়ই থাকে। হাত না দুলিয়ে একমাত্র কাকাকেই সে হাঁটতে দেখেছে। অথচ বছর তিরিশ আগে বগলের ল্যাটিসিমাস ফুলিয়ে থুতনি তুলে হাঁটতেন। তখন সবাই ওকে ”জগা” বলত।
প্রভাত সবে একজনের দাড়ি কামিয়ে হাতে লাগানো ফেনা ক্ষুর দিয়ে চেঁছে তুলছে। সন্দীপকে থুতনি দিয়ে সে চেয়ারটা দেখিয়ে দিল। বেঞ্চে বসে একজন কাগজ পড়তে পড়তে স্বগতোক্তি করল: ”আবার একটা ব্যাঙ্ক ডাকাতি।”
”কোথায়?”
”খিদিরপুরে।”
”এই তো কবে যেন শোভাবাজার হল।”
”সে তো পনেরো-ষোলো দিন আগে, তারপরও তো হল দুটো গয়নার দোকান।”
”আমাদের এদিকটায় এখনও হয়নি।”
”এবার হবে, দেখো হয়তো এটাতেই হবে।”
লোকটি বুড়ো আঙুল দিয়ে তার পিঠের দিকের দেয়ালটা দেখাল। ওটা ব্যাঙ্কের বাড়ির দেয়াল।
সন্দীপের নাকের নীচে বুরুশটাকে তুলির মতো সন্তর্পণে টানার কাজে ব্যস্ত থাকায় প্রভাত কথা বন্ধ রেখেছে।
”দুটো ডাকাতকে পিটিয়ে মেরেছে।”
”কোথায়?”
”হাওড়ায়।”
”সেদিন তো নদীয়ায় চারটেকে মারল।”
”চারটে নয় ছ’টাকে।”
”ওই হল।”
প্রভাত হঠাৎ গলার স্বর নামাল।
”আপনার ভাইতো অ্যাদ্দিনবাদে ফিরেছে।”
সন্দীপ চোখ বুজিয়ে ছিল, বুঝতে পারেনি প্রভাত তাকেই বলছে। সে আবার বলল, ”আমার কাছে কুড়িটা টাকা ধার নিয়েছিল।”
”কে?”
সন্দীপ ট্যারা চোখে প্রভাতের মুখটা দেখল। কোনো ভাবান্তর নেই।
”সুহাসদা। তখন তো আর জানতুম না ফোরটোয়েন্টি লোক। কত লোকের যে টাকা মেরেছে।”
‘আপনার ভাই’ কথাটা সন্দীপকে অস্বস্তিতে ফেলেছে, খানিকটা রাগও হচ্ছে। একটা ঢপবাজ তার ভাই, এটা ঠান্ডা মাথায় হজম করা শক্ত।
”আমার ভাই কে বলল? ওতো দূর সম্পর্কের…সবাই জানে ও চিটিংবাজ, তুমি টাকা দিলে কেন?”
”ওনার বউয়ের কাছে তিন-চারবার চেয়েছিলুম। দিচ্ছি দোব করে আর দেননি। আমিও আর চাইনি। নিজের চোখেই তো দেখি ওর অবস্থাটা।”
সন্দীপ আর কথা না বলে বাকি সময়টা কাটাল। বেরোবার মুখে আয়নায় মুখ দেখতে দেখতে বলল, ”এখন তো ফিরেছে, এবার চেয়ে নাও।”
”গেছলুম। ওনার বউ বললেন খুব অসুখ, তবে দিনকয়েক পরেই দিয়ে দেবেন।”
সন্দীপ ঠিক করল আজই দুপুরে সে হাসির সঙ্গে দেখা করবে। তারপর মনে পড়ল বিকেলে রত্নার সঙ্গেও দেখা হবে কিন্তু জায়গাটা মনে পড়ছে না।
মাঝে মাঝেই রত্না দেখা হওয়ার জায়গা পালটায়। দিনকয়েক লালদিঘির দক্ষিণ-পুব কোণের ট্রাম-স্টপ, তারপর জায়গাটা ওর হঠাৎ একঘেয়ে মনে হওয়ায় ইলেকট্রিক সাপ্লাই অফিসের সামনে বদল করেছিল। গত সপ্তাহ পর্যন্ত ছিল আকাশবাণী ভবনের ফটক।
এই এক ঝামেলা! অদ্ভুত এক অস্বাচ্ছন্দ্যে এবার সময় কাটবে। সন্দীপ বিরক্তি নিয়ে বাড়িতে ঢুকে বাঁ দিকের ঘরের আধভেজানো দরজা দিয়ে দেখল শৈলবালা ঘর মুছছে আর কাকা রজনীগন্ধার চূড়া পরিয়ে দিচ্ছে শিবাজীর গলায় যেটা বুক বেয়ে ঝুলছে শূন্যে।
শৈলবালা ফিরে তাকাল এবং কাকাকে কিছু একটা বলল।
”সানু।”
সন্দীপ বহু বছর পর কাকার এমন নরম গলা শুনল। জিজ্ঞাসু চোখে সে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। শৈলবালার বিপুল নিতম্বদ্বয়ের প্রতি চার চোখ কোনোক্রমেই যাতে নজর না দেয় সেজন্য হুঁশিয়ার রইল। শৈলবালার সঙ্গে রত্নার অনেকটা মিল আছে গড়নে। দুজনের শরীরেই সন্দেহজনক ধারণা দেবার মতো তথ্য রয়েছে। তবু সে বিশ্বাস করে না কাকার সঙ্গে ওর কোনো ব্যাপার আছে। বাল্য থেকেই সে দেখে এসেছে নরকের দ্বার ছাড়া নারী কাকার আর কোনো বিবেচনায় পড়ে না। দ্বার খোলার জন্য কাকা কখনো চেষ্টা করেনি।
”সুহাসকে একটু দেখিস, অনেকেরই তো রাগ আছে…হাজার হোক আমাদের বংশেরই একজন।”
নিশ্চয় শৈলবালার কাছ থেকে শুনেছেন সুহাসের প্রত্যাবর্তনের খবর।
”খুব নাকি অসুখ ওর, হাসির কাছে শুনলুম।”
”ছেলেটা ভালোই ছিল। অনেক কিছু করতে পারত…”
কাকা দরজার কাছে এগিয়ে এলেন। কপালে সিঁদুরের ফোঁটা। গঙ্গাস্নান করে ফেরার পথে কালীমন্দির থেকে নেওয়া। ঘরের একমাত্র আসবাব কাচের আলমারির মধ্যে দেখা যাচ্ছে লাল কাপড়ে জড়ানো কুকরিটা। সুভেনিরের মতো রেখে দিয়েছেন, যেমন গত তিরিশ বছর নিজেকেও আগলে রেখেছেন। কোথায়, কী যেন একটা বিপদ ওঁর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার অপেক্ষায় আছে, এমন একটা সতর্কতায় সর্বদা নিজেকে ঘিরে রাখেন। মৃত যবনরা হয়তো এখন ওকে ভয় দেখায়।
পানুর বিয়ের সময় নিমন্ত্রণ পত্রে সম্মতি নিয়েই ওঁর নাম ছিল কিন্তু বউভাতের অতিথি অভ্যাগতদের সামনে আসেননি। ঘরের দরজা বন্ধ রেখেছিলেন। আশ্চর্য, কেউই ওর খোঁজ করেনি।
”কিন্তু লোভে পড়ে বিপথে চলে গেল। চরিত্রের জোর নেই, ধৈর্য নেই, তাড়াতাড়ি বড়ো হতে চায়। না হলে…পানু কি জানে?”
