সন্দীপ একটা ঝাঁকুনি খেল কথাটা শুনে। পানুর তলপেটে এখনও যন্ত্রণা হয়, এটা সে জানে না, বাণীও কখনো বলেনি। পানু তো বলবেই না, অত্যন্ত কম কথা বলে। কোর্টে ওকে দেখেছিল কুঁজো হয়ে মুখ নীচু করে বসে থাকতে। দেখে মনেই হয়নি অত্যাচার হয়েছে শরীরে। শুধু চোখাচোখি হতে হাসবার চেষ্টা করেছিল। ওই সময় সবাই তা করে।
”পানুর এখনও পেটে যন্ত্রণা হয়! চিকিৎসা করায় না?”
”মানু তো বলেছিল ওর চেনা এক বিরাট ডাক্তার আছে, ওদের ক্লাবের, তাকে দিয়ে দেখিয়ে দেবে, কিন্তু পানু কোনো গা করল না,…সন্দেশ আছে খাবে, মানুর এক ফ্যান কাল পাঠিয়ে দিয়েছে।”
”না থাক, আমার দেরি হয়ে গেছে।”
যখন সে দরজার দিকে এগোচ্ছে পিছন থেকে মা বললেন, ”পানুর তো যাতায়াত আছে হাসির বাড়ি, অবশ্য মাসদুয়েক আর যাচ্ছে না। অন্য কিছু নয়, ওর ছেলেকে পড়াটড়া দেখিয়ে দিতেই যেত।”
সন্দীপ না শোনার ভান করল। একতলায় নামার সময় একবার ভাবল, পানুর যন্ত্রণার ব্যাপারটার খোঁজ নেবে। ওর সঙ্গে পাড়ার আরও তিনটি ছেলেকে পুলিশ তুলে নিয়ে গেছল, তাদের কাছেই শোনা, ওর পেটে তক্তা পেতে তিন-চারকজন নাচানাচি করেছিল। নিশ্চয় তখন টুঁ শব্দটি করেনি। করলে হয়তো ওরা খুশি হয়ে অল্পেই ছেড়ে দিত।
এততলায় সিঁড়ির পাশেই তালাবন্ধ বৈঠকখানা ঘর। বাবা মারা যাবার পর তারা দুই ভাই দিনের বেশিরভাগ সময় এই ঘরেই কাটাত। মাস্টার মশাইয়ের কাছে এই ঘরেই পড়েছে। কাকা তার ঘরের দরজা খুলে কান পেতে রাখতেন, মাস্টার আর পড়ুয়ারা ফাঁকি দিচ্ছে কিনা ধরার জন্য। মাস্টারমশাই পড়িয়ে উঠবার সময় চেয়ার টানতেন। শব্দটা হলেই কাকার দরজা বন্ধ হয়ে যেত। পানুই এটা লক্ষ করেছিল।
এখন ঘরটার ভিতরে লম্বা টেবলটা, ভাঙা চেয়ারগুলো, কাচ ভাঙা আলমারি দুটো আর কয়েক কিলোগ্রাম ধুলো ছাড়া বোধহয় আর কিছু নেই। এই ঘরে মানুও ছোটোবেলায় পড়েছে। তবে বছর তেরো বয়স থেকে সে যখন বেশি মনোযোগী হল ফুটবলে এবং গৃহশিক্ষক সন্ধ্যায় অপেক্ষা করে ফিরে যেতে লাগল তখন কাকাই একদিন ঘরে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে পড়ার হাত থেকে মানুকে রেহাই দেন।
বছর দুই আগে মানু ঘরটা নিতে চেয়েছিল। ঘরের চাবি কাকার কাছে। বাড়ি ভাগ হয়নি, এক একজন একটা অংশ নিয়ে বসবাস করে যাচ্ছে। বাড়ির ট্যাক্সের টাকা প্রতি তিনমাস পানুর কাছে যে যার নিজের অংশের অনুপাতে জমা দেয়। এটা পানুই ঠিক করে দিয়েছে। ইলেকট্রিক মিটার সকলেরই আলাদা।
নানান কাজে নানান ধরনের লোক এখন মানুর কাছে আসছে। ওর একটা ঘর চাই। কাকা ঘর দিতে রাজি হননি। একদিন দুপুরে মানু কোথা থেকে সাত-আটটা ছেলেকে এনে তালা ভাঙছিল। তখন কাকা তার ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। খালি গা, আটচল্লিশ ইঞ্চি ছাতি আর ষোলো ইঞ্চি বাইসেপস এবং হাতে ছিল লোহার গরাদটা।
”কি বলব বড়দা, কাকার শরীরের লোমগুলো তখন মনে হচ্ছিল খাড়া হয়ে উঠেছে, চোখ দুটো লাল”, বাণী পরে তাকে বলেছিল। ”বেড়ালে যেমন গুড়ি মেরে ন্যাজ নাড়ায় তেমনি করে পিছন দিকে ধরা হাতে লোহাটা নাড়াতে নাড়াতে খুব আস্তে বললেন, ‘হাঁটু ভেঙে দিয়ে তোর ফুটবল খেলা চিরকালের মতো ঘুচিয়ে দোব।’ তাই শুনে ঠাকুরপো ভয়ে সিঁটিয়ে তিন পা পিছিয়ে গেল। তখন যদি ওর মুখটা দেখতেন।”
মানুর সঙ্গে তার কদাচিৎ দেখা হয়, সিঁড়িতে বা সদরে। মুখোমুখি হয়ে পড়লে দুজনেই হাসার চেষ্টা করে পাশ কাটিয়ে যায়। কখনো বা কথাও হয়।
”খোঁড়াচ্ছিস কেন, ইনজুরি?”
”এই অ্যাঙ্কেলটা, কাল…”
কথাও শেষ করে না।
”এবার কোথায়, দিল্লি না বোম্বে?”
”রোভার্সে।”
সন্দীপকে বুঝে নিতে হয় বোম্বে।
মুরারির দোকানের পাশেই প্রভাতের চুল ছাঁটাইয়ের সেলুন। তার পাশেই ব্যাঙ্ক, যেখানে সন্দীপের একটা সেভিংস অ্যাকাউন্ট আছে। সকালের এই সময়টায় দুটি দোকানই ব্যস্ত থাকে।
”আসুন, কী দোব মামলেট টোস্ট।”
”শুধু চা।”
রাস্তার দিকে মুখ করে সন্দীপ বসল। পাশেই উনুনটা, মুরারির হাত যত দ্রুত চা করছে বা রুটি সেঁকছে তার থেকেও দ্রুত তার মুখ চলছে। সন্দীপের সামনে সে একটা হাতপাখা রাখল।
”সেই ভোররাত থেকে লোডশোডিং তার ওপর গরম। মানুষের মনমেজাজ ঠিক থাকে না ব্যবসাপত্তর চালানো যায়! কখন যে পাখা আসবে…টুলটা নিয়ে বাইরে বসুন না, আমি চা দিয়ে আসছি।”
”না না আমি ঠিক আছি।”
কয়েকজন খদ্দের তার দিকে তাকাল। মুরারির এত বিনীত খাতির এ অঞ্চলে দু-তিনজন মাত্র পায়। তার পাওয়ার কারণ সে মানুর দাদা, অফিসেও পায়।
”সন্দীপদা, ওর পিঠের ব্যাপারটা ঠিক হয়ে গেছে তো, কাল খেলছে তো?”
”সন্দীপবাবু একটু দেখবেন, মেম্বরশিপের জন্য দুবেলা এসে বসে থাকছে শালার ছেলেটা।”
”তুমি তো গাড়ি করে আসবে হে, ভাই তো এবার শুনলুম সত্তর হাজার পেয়েছে।”
”আপনার ভাইয়ের এই শ্রাবণেই নাকি বিয়ে?”
”তোমার সঙ্গে তোমার ভাইয়ের চেহারায় কিন্তু আকাশপাতাল তফাত, সত্যিই হ্যান্ডসাম সায়েবদের মতো দেখতে।”
সন্দীপ রাস্তাটা খুঁটিয়ে দেখল বিস্কুটের কোনো চিহ্নই নেই। মুরারি কি তুলে নিয়ে বোয়ামের মধ্যে রাখল! দুটো বয়েমে দু ধরনের বিস্কুট। বোঝা যাচ্ছে না কোনগুলো সে মানুকে দেবার জন্য নিয়ে গেছল।
”মুরারি, রাস্তায় যে বিস্কুটগুলো পড়েছিল, গেল কোথায়?”
