এবার তার খিদে পাচ্ছে। ভোরে রান্না করার সময় থাকে না তাই অলকা রবিবার রাত্রে দুজনের খাবার করে। নিজে খেয়ে সন্দীপের জন্য ঢাকা দিয়ে রেখে যায়। সপ্তাহের পাঁচদিন সকালের খাওয়ার ব্যবস্থাটা নিজেকেই করতে হয়। ন’টায় বাণী উপরে আসবে ভাত নিয়ে। তার আগে দু-আড়াই ঘণ্টার জন্য পেটে সামান্য কিছু দিলেই চলে। বহুদিন সে মুরারির দোকানে একটা অমলেট আর একটা টোস্ট দিয়েই কাজ সেরেছে।
অ্যালুমিনিয়ামের বাটিতে ঢাকা রয়েছে চারখানা আটার পরোটা। প্রতিটি দু ভাঁজ করে গুছিয়ে রাখা। অলকা অবশ্য রুটিই খেয়ে গেছে, ঘিয়ের বাসি খাবার অম্বলের জন্য খায় না। চারখানার বেশিও কখনো করে না। সে জানে একটু পরেই সন্দীপ ভাত খাবে। অযথা কিছু কোনোদিনই অলকা করেনি।
পরোটার সঙ্গে রয়েছে একটুকরো পাটালি আর একটা মর্তমান কলা। চা তৈরি করে নিতে হবে। কিন্তু এখন কেরোসিন স্টোভ ধরিয়ে সেটা করার ইচ্ছে তারনেই। মুরারির চা কোনোক্রমেই খারাপ নয়।
সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় মানুদের দরজাটা খোলা দেখে সন্দীপ একপলক তাকাল। সিমেন্টের পুরনো মেঝের উপরে বসানো হয়েছে হালকা হলুদের উপর মাকড়সা জালের মতো সাদা নকশার মার্বেলাইট টালি। দেয়ালগুলোয় হালকা কমলা রঙের প্লাস্টিক পেইন্ট। ডাইনিং টেবলের পিছনে টি ভি সেট। রেকর্ড প্লেয়ার, স্টিরিয়ো। ভিতরের ঘরে সোফা আর কার্পেটের একটা কোণার অংশ দেখা যাচ্ছে। দেয়ালে মানুষ প্রমাণ মানুরই একটা ছবি, পিছনে আবছা একটা বোয়িং। রানওয়ের উপরে কোনো ভক্ত ফোটোগ্রাফার তুলে হয়তো উপহার দিয়েছে।
টেবলের পাশে দাঁড়িয়ে মা চা ছাঁকছেন। অসম্ভব চায়ের নেশা, প্রতিঘণ্টায় অন্তত একবার চাই। সন্দীপকে দরজার সামনে দিয়ে তাকিয়ে চলে যেতে দেখে হাত তুলে দাঁড়াতে ইশারা করলেন।
”ভেতরে এসো, চা খাবে?”
উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করেই, একটা কাপ টেনে নিয়ে লিকার ঢালতে লাগলেন।
”শুনেছ তো?”
সতীন পুত্রদের ‘তুমি’ বলেন। ওঁর বিয়ের সময় মানুর বয়স ছিল বারো।
সন্দীপ চেয়ারের পিঠ ধরে দাঁড়িয়ে রইল নির্বিকার মুখে। সামান্য ঔসুক্য দেখালেই অনর্গল কথার স্রোত বয়ে যাবে।
”দাঁড়িয়ে কেন!”
”বসব না তাড়া আছে, দাঁড়ি কামাতে যাচ্ছিলুম।”
আচমকাই এটা মনে পড়ে যাওয়ায় সে গালে হাত বুলোল, রোজ দাড়ি কামানোটা এক বিরক্তিকর ঝামেলা, রবিবার সে কামায় না।
”বড় বউমার কাছে শুনেছ তো…ফিরে এসেছে? খুব খারাপ অবস্থা, বাঁচা শক্ত। না ফিরলেই পারত। যাহোক করে হাসি ছেলেকে নিয়ে তবু চালিয়ে যাচ্ছিল, এখন কি আতান্তরে পড়ল বল তো? মেয়েটার তো টাকার গাছ নেই। চিনি বেশি দিইনি…ব্যাংকে হাজার দুয়েক ছিল এখনও আছে কিনা জানি না, মাইনে আর কত-শ’ পাঁচেকও নয়, বাড়িভাড়া নব্বুই। ছেলেটাকে মানুষ করে তোলার জন্যও তো খরচ আছে।”
হাসির আয়ের হিসেব মা কোথা থেকে জোগাড় করলেন? পাড়ার তিন-চারটে বাড়িতে অবশ্য নিয়মিত যাতায়াত আছে। হাসিদের বাড়ির অর্ধেকটা যারা কিনেছে তাদের কাছেও যান। খবরগুলো হয়তো এইসব সূত্র থেকেই পাওয়া।
সে কোনো জবাব না দিয়ে চায়ের কাপটা তুলে নিল। চেয়ারে বসল না। তার যে তাড়া আছে এমন একটা ব্যস্ততা মুখে ফুটিয়ে রেখে কাপে চুমুক দিল।
সন্দীপের বরাবরের বিস্ময়, এত অজস্র রকমের আর পরিমাণের খবর মা’র সংগ্রহে থাকায় কোনো একজনের সম্পর্কে উল্লেখ করলেই তার হাঁড়ির খবর পর্যন্ত বলে দেবেন। তবে যতটা জানেন তার থেকে কমই প্রকাশ করেন এবং নির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্য না থাকলে সবটা কখনোই ভাঙেন না।
”পানু কি জানে?…জানলে কী যে করবে…তবে ঠান্ডা মাথার মানুষ। এতদিনে নিশ্চয় এসব ভুলেটুলে গেছে…সংসারী হলে মানুষের রাগ শোক পড়ে যায়।”
সন্দীপ মাথা নেড়ে গেল এবং মা সেটা লক্ষ করে আর একটু গলা নামাল।
”আমার স্থির বিশ্বাস, কাজটা সুহাসেরই। পানুকে ধরিয়ে দেবার পিছনে ও ছাড়া কেউ নয়। তুমি কি বলো?…পানুকে না সরালে ও তো হাসিকে বিয়ে করতে পারত না। বেচারা।”
সন্দীপের জিজ্ঞাসু চোখের দিকে তাকিয়ে আবার বললেন: ”পানুর কথাই বলছি। কোনো কালে রাজনীতি করেনি যে, তাকে কিনা নকশাল বলে ধরিয়ে দেওয়া, পুলিশের হাতে মার খাওয়ানো, জেল খাটানো..ভাবতে পার কী জঘন্য কাজ সুহাস করেছে?”
”কিন্তু সুহাসই যে তা করেছে এর তো কোনো প্রমাণ নেই।”
”এর আবার প্রমাণ লাগে নাকি? বোঝাই তো যায়, হাসিকে বিয়ে করল পানুকে ধরিয়ে দেবার দেড়মাস পরই পথের কাঁটা সরিয়ে দিয়ে, পাড়ায়ও সবাই তাই বলে। তখন তো সুহাস লালবাজার যেত, অনেকেই তা দেখেছে। পালিয়ে গেল তো নকশালদের ভয়ে, ওকে খুন করবে বলেছিল। কেন, পিণ্টু আর দুলাল নামে যে ছেলে দুটো ধরা পড়ল বস্তিতে, সেটাও তো সুহাসেরই কাজ। ছেলে দুটো যে ওখানে আছে তা তো ওই ফোন করে জানিয়ে দিয়েছিল। পাড়ায় সে সময় বলাবলি হত, অনেকে জানতও সুহাস পুলিশের মাইনে করা চর। তখন ওর অবস্থাও তো জানি, হাসি কতদিন এসে এটা ওটা চেয়ে নিয়ে গেছে। মেয়েটার জন্য দুঃখ হয়, কেন যে অমন হতচ্ছাড়াটাকে বিয়ে করতে গেল। চেহারা সাজপোশাক, লম্বা লম্বা কথা এতেই কিনা মাথা ঘুরে গেল, হিরে ফেলে আঁচলে কাচ বাঁধল। পানুর মতো ছেলে কটা হয়? কী শান্ত, ভদ্র, সাত চড়ে রা কাড়ে না, রাগে না…ছোটো বউমা বলছিল, এখনও ওর পেটে মাঝেমাঝে যন্ত্রণা হয়, পুলিশের হাতে কম মারটা তো খায়নি…ও হল সেই ব্যথা, বউমাকে সেটা অবশ্য আর বলিনি ভয় পাবে বলে। বাবাঃ সে এক দিন গেছে বটে।”
