প্রণবেশ তৃতীয় বোতল ধরার দিকে দ্রুত ঢক ঢক করে এগোতে লাগল। সন্দীপ তখন লক্ষ করল, চড়াইয়ের মতো উঠে যাওয়া জমিটা যেখানে অন্ধকারের মধ্যে ঢুকেছে সেখান থেকে বেরিয়ে আসছে একজোড়া নারীপুরুষ। ওরা কাছাকাছি এলে সে মেয়েটিকে চিনতে পারল। প্রায়ই সন্ধ্যায় একে কার্জন পার্কে দেখেছে।
”এই হচ্ছে রিল্যাক্সেসন।”
সন্দীপ মুখ ফিরিয়ে দেখে প্রণবেশও মেয়েটিকে লক্ষ করছে।
”তুলব?”
”না না, এসব নয়।”
”তোর চলে না বুঝি।”
প্রণবেশের চোখ ওদের অনুসরণ করে গেল অনেক দূর পর্যন্ত। কিছুদূর গিয়ে পুরুষটি রাস্তা পার হল, মেয়েটি সোজা হাঁটছে।
”তোর তো ছোট্ট ব্যবসা, যাদের কোটি কোটি টাকার কারবার তাদের অবস্থাটা কী হয় বলতো?”
”কিসসু হয় না। হয় তাদের ভারী মাইনেওলা একজিকিউটিভদের। পঞ্চাশ থেকে ষাটের মধ্যেই বেশির ভাগ টেঁসে যায়। আমার অফিসের কাজ বন্ধ, কাজ করে একটা মেয়ে, ম্যারেড, মাঝেমাঝে ওকে নিয়েই রিল্যাক্স করি।”
সন্দীপ আড়ষ্ট হয়ে আড়চোখে প্রণবেশের মুখে তাকাল। নির্বিকার, উত্তেজনাহীন এবং প্রভূত বোকামি মাখানো।
”ভালো মেয়ে, কাজের মেয়ে। একস্ট্রা কিছু নেয় না। তুই একদিন আমার অফিসে আয়, দেখাব, ছুটির পরই আয়।”
সন্দীপ কৌতূহল বোধ করছিল। এই সেই প্রণবেশ যে দমদমে একটা কলোনিতে টালির চাল দেওয়া মাটির ঘরে থাকত। কলেজ থেকে মাত্র একদিনই সে গেছল ওর সঙ্গেই। অনটন আর দারিদ্র্য লুকোবার কোনো চেষ্টা ছিল না প্রণবেশের। স্বচ্ছন্দ, ঝরঝরে ব্যবহার। ওই সময়টা সন্দীপের জীবনে শূন্য, অন্ধকার, ক্ষুব্ধ একটা অধ্যায় ছিল। বাড়িতে একমাত্র পানু ছাড়া আর কোনো সঙ্গী নেই। মানু আর তার মা অন্য মহাদেশের মানুষের মতো ছিল। তাদের আচরণ রীতি এমনকি ভাষাও তার কাছে অপরিচিত মনে হত। পানু বেশিরভাগ সময়ই থাকত হাসিদের বাড়িতে। কাকার ঘরের দরজা তো বন্ধই ছিল। সবাই আলাদা আলাদা। এই বাড়ির ঐতিহ্য, স্মৃতি বা দুঃখের মধ্য থেকে কেউ যেন উদ্ভূত নয়। তার নিজেকেও মনে হত না এই বাড়ির অংশরূপে। জীবনের এই সময়টাকে ভাবলেই তার মন বিষাদে ভরে যায়। সেই সময় নিজের ভবিষ্যতের কথা ভাবলেই বিষণ্ণ বোধ করত। শুধুই অন্ধকার। অতি সাধারণ ছাত্র, উদ্যমহীন, মাঝারি পর্যায়ের ছাড়া নিজেকে আর কিছু ভাবতে পারত না।
তখনই একদিন ইউনিয়ন নির্বাচনে ভোট চাইতে ক্লাসে এসে বক্তৃতা দিয়েছিল অলকা। শ্যামলা, রুগণ, চশমা পরা মেয়েটির বাকভঙ্গি, উচ্চচারণ, শব্দের বাছাই, প্রাঞ্জলতা, মাথা হেলিয়ে দাঁড়ানো, চাহনির ঔজ্জ্বল্য-সব মিলিয়ে এক ধরনের চটক মাখিয়ে দিয়েছিল যা তাকে বিহ্বল করে। প্রণবেশের দূর সম্পর্কে আত্মীয়া অলকা। ওই আলাপ করিয়ে দিয়েছিল। হতাশ, সঙ্গলোভী, সন্দীপই তখন আঁকড়ে ধরেছিল পরিচয়ের সুযোগটিকে।
”অলকা এখন কী করছে রে?”
”মাস্টারি; বর্ধমানের এক গ্রামে।”
”পলিটিক্স ছেড়ে দিয়েছে? লেগে থাকলে এম.এল.এ. কি মন্ত্রীও হতে পারত।”
”আমারও তাই মনে হয়।”
”সেই রকমই দেখতে না মোটাসোটা হয়েছে? সেই কলেজের পর আর দেখিনি।”
”সেই রকমই।”
প্রণবেশ ঘুরে সন্দীপের দিকে তাকাল। সে লক্ষ করল, এইভাবে শরীরটা ঘোরাতে প্রণবেশকে মেহনত করতে হল। চোখে অবাক ভাব, যেন অলকার ‘সেই রকম’ থাকাটা খুবই অন্যায় ব্যাপার।
”আর ইউ হ্যাপি?”
”কেন নয়! আনহ্যাপি হওয়াটা কি সহজ নাকি?”
”না, সেজন্য চেষ্টা করতে হয়। আমি চেষ্টা করে আনহ্যাপি। যদি তোর মতো নিজের অবস্থা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে পারতাম, অবস্থা ফেরাবার জন্য চেষ্টা যদি না করতাম তাহলে অর্ডার ধরার জন্য তোর পারচেস কনট্রোলারকে পটাতে ব্রেইনের বদমাইস সেলগুলোকে খোঁচাখুচি করার দরকারই হত না। দিব্যি এই সময়টায় গুলোদার ঘরে সাবুকে নিয়ে রিল্যাক্স করতাম।”
”সাবু কে?”
”আমার অফিসের মেয়েটা। মাঝেমাঝে ওকে নিয়ে গুলোদার ঘরে যাই, ভেরি সেফ প্লেস আর সস্তা। ওখানে গিয়ে আমি কোনো চেষ্টা করি না সাবুর সঙ্গে, আই ফিল হ্যাপি। আর একটা সেল।”
প্রণবেশ ঝুঁকে বীয়ারের বোতলের জন্য হাতড়াতে থাকে।
. সন্দীপের ঘরের মেঝেয় আয়না, আলমারি, টেবল ও খাটের মধ্যে খালি জায়গাটুকুতে প্রায় আধঘণ্টা ফ্রি হ্যান্ড ব্যায়াম করে ঘাম শুকোতে বারান্দায় গেল। মাথায় সারাক্ষণই ছিল প্রণবেশের কথাগুলো। ব্যায়াম করার সময় অন্য চিন্তা করলে কোনো ফল হয় না। তখন শুধু নিজের শরীরের কথাই ভাবা উচিত। এতক্ষণের যাবতীয় পরিশ্রমটাই বোধহয় বিফলে গেল।
বিরক্ত হয়েই সে প্রণবেশ সম্পর্কে সিদ্ধান্তে এল-ওর কাজটা করে দেবার চেষ্টা সে করবে বটে কিন্তু ওকে এড়িয়ে চলবে। ”যদি তোর মতো নিজের অবস্থা নিয়ে…” এই কথাগুলো এখনও তার অবচেতনে যে রয়ে গেছে এবং থাকবেও এটাই সাংঘাতিক। তার মতো নিরুদ্যমী লোকের পক্ষে একই অবস্থায় থাকাটাই বোধহয় ভালো।
রাস্তায় এখন ভীড় শুরু হয়েছে। যানবাহনের সংখ্যা বাড়ছে। বাতাসে ভোরের স্নিগ্ধতা বজায় থাকার সময় অতিক্রান্ত। মানুর বাচ্চচা চাকরটা থলি হাতে বেরোল। গত তিন চারদিন ওর থুতনিতে একটা প্লাস্টার সাঁটা। জুতোয় কালি দিতে ভুলে যাওয়ার এবং এক-ডাকে সাড়া না পাওয়ার অপরাধে মানু জুতো ছুঁড়ে মেরেছিল। এসব খবর বাণীর কাছ থেকে পাওয়া।
