একসময় পাওয়া ”জগা” নামটা এখনও বোধহয় ওকে পাগল করে। এক একসময় ওর মাথা খারাপের মতো হয়। বন্ধ ঘরের মধ্যে তিনচারদিন শুধু পায়চারি আর বিড়বিড় করেন, কিছু খান না। একটা নেপালি কুকরি আর তিনহাত লম্বা একটা লোহার রড মেঝেয় রেখে অবিরত প্রদক্ষিণ করে যান। ওই দুটি দিয়েই শেখ বাগান বস্তিকে যবনশূন্য করার ব্রতে মেতেছিলেন। দরজা খোলা না পেয়ে শৈলবালা তখন ফিরে যায়। ঘরের মধ্য থেকে আহত জন্তুর গোঙানির মতো একটা আওয়াজ ছাড়া তখন আর কিছু শোনা যায় না। জানলার খড়খড়ি তুলে সন্দীপ ব্যাপারটা প্রথম দেখেছিল স্কুলে পড়ার সময়। পানুকে তখন বলেছিল। ও বিশ্বাস করেনি।
মাস ছয় পর পানু একদিন বলে, ”কাকার উপর ভর হয়েছিল, আজ দেখলুম। কুকরিটা চুরি করে গঙ্গায় একদিন ফেলে দেব।”
”কাকাকে তোমরা যা ভাব তা কিন্তু নন।” সন্দীপ গম্ভীর করে কথাগুলো বলে লুঙ্গির কষিটা টেনে কোমরে গুঁজল। কয়েকটা ডন দিয়েই পেটটার বেড় যেন কমে গেছে।
”আমি কিছুই ভাবি না, যা কিছু মা-ই বলেন।”
”মার সঙ্গে কোনোদিনই ওর বনিবনা হয়নি। আর তুমিই বা মার সঙ্গে অত কথা বলো কেন?”
”কী করব যদি ডেকে কথা বলেন?”
”ক’দিন আগে মানু চেঁচাচ্ছিল কেন?”
”মদ খেয়ে এসেছিল। মা ওর জন্য পাত্রী খুঁজছেন। কী ভাবে যে টাকা ওড়ায় দেখলে বিশ্বাস করবেন না বড়দা, মনে হয় টাকা যেন ওর কাছে খোলামকুচি। তবে দেবুকে খুব ভালোবাসে, প্রায়ই এটা ওটা কিনে দেয়।”
বাণী চলে যাবার পর সন্দীপ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের শরীরের এক একটা খুঁত বার করতে লাগল। কোমরের দুধারে চর্বি ফেঁপে উঠেছে লুঙ্গির কিনার উপচে। ঘাড় থেকে কাঁধ বেয়ে বাহু ধরে কনুই পর্যন্ত অঞ্চলটা গোলগাল, পাঁজরের খাঁচার দুধারে চামড়া শিথিল হল দুহাত ঝুলিয়ে সামান্য ঝুঁকতেই। পা জোড়া করে কয়েকবার লাফিয়ে দেখল বুকটা থলথল করছে। চোয়ালটা চর্বি জমে দুধারে বেরিয়ে পড়েছে মুখের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে। দুই গালের বাঁধন আলগা। গলায় তিনটে ভাঁজ পড়ছে মুখটা সামান্য নামালেই। সন্দীপ তার শরীরে বাঞ্ছিত তীক্ষ্নতা বা এমন কোনো কর্কশ ডৌল খুঁজে পেল না যাকে পৌরুষোচিত বলতেই হবে।
কতকাল তাহলে ভালো করে নিজের দিকে তাকাইনি? আয়নার চেহারাটার প্রতি বিরক্তিতে সে ভ্রূ কোঁচকাল। গোবরগণেশ মার্কা হবার মতো সে এমন কিছু বেশি খায় না, ঘুমোয় না বা আলস্যে দিনও যাপন করে না। খবরের কাগজে একবার পড়েছিল, উদ্বেগ, ভয়, দুশ্চিন্তার টানাপোড়েনে মানুষ মোটা হয়।
”দেখিস নি মাড়োয়ারিদের। অত মোটা হয় কেন? ব্যবসা, ফাটকা, কালোবাজার, কালোটাকা, ইনকাম ট্যাক্স, এনফোর্সমেন্ট…এক সেকেন্ডও রিলাক্স করতে পারে না।”
প্রণবেশ ঠোঁট থেকে বীয়ারের ফেনা বাঁ তালুর উলটো পিঠ দিয়ে মুছে গ্লাসটা দুই হাঁটুতে চেপে বলেছিল, ”সিগারেট দে একটা।”
গত বুধবার আউটরাম ঘাটের কাছাকাছি রাস্তা থেকে হাত কুড়ি ভিতরে কেল্লার জমিতে গাড়ি রেখে তারা দুজন কথা বলছিল। প্রণবেশ কলেজের বন্ধু, একসঙ্গে তারা বি এস-সি পড়েছে। এখন সে ছোটো একটা কারখানা করেছে যেখানে এমন যন্ত্রাংশ তৈরি হয় যা সন্দীপের অফিস অন্য জায়গা থেকে কেনে তাদের পাম্প মেসিন, সিলিং ফ্যান ইত্যাদি উৎপাদনের জন্য। প্রণবেশ এখানে সেঁধোতে চায়। যথোপযুক্ত লোকটির সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেওয়া এবং কাজ পাইয়ে দিতে ভিতর থেকে তাকে সাহায্য করার অনুরোধ নিয়ে সে সন্দীপকে সেদিন মোটরে তুলেছিল।
মোটা হওয়ার কারণ নিয়ে প্রণবেশই কথা পেড়েছিল। নানা ধরনের ভাজাভুজি আর সিদ্ধ করা খাবার দোকানের ছেলেরা মোটরের জানলায় দাঁড়াচ্ছিল, কিছু চাই কিনা জানতে। সন্দীপ আলুচাট আনতে বলে।
”বীয়ার তার উপর আলু এবং চল্লিশ ছুঁতে যাচ্ছি। আমি খাব না, তুই খা, ছিয়াশি কে জি-তে রয়েছি, এবার ওজন কমাতে হবে।”
”কী ভাবে?”
”টেনশ্যন, স্ট্রেস এইসব থেকে বেরোতে হবে। এটাই আসল ব্যাপার। ছোটা, এক্সারসাইজ, ডায়টিং সব বাজে জিনিস। আমি তো আর বডিবিলডিং কম্পিটিশনে নামতে চাই না, ভালোভাবে দীর্ঘকাল বাঁচতে চাই। শুধু বেশি আলু খাসনি, ডায়বিটিস ধরবে!”
সন্দীপ তর্ক করতে চায়নি। প্রণবেশ বোধহয় উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল। বোতলটা মুখে দিয়ে দ্রুত শেষ করেই পায়ের কাছে পড়ে থাকা আর একটা বীয়ার তুলে নিল। ড্যাশবোর্ডে খোপে হাতড়িয়ে ছিপি খোলার চাবিটা না পেয়ে অশ্লীল কয়েকটা গালি দিল নিজেকেই। চাবিটা সন্দীপ পেল সীটের খাঁজে।
”গেলাসে ঢেলে খা।”
”একই ব্যাপার।”
সন্দীপ গেলাসটা তুলে রাখল ড্যাশ বোর্ডের উপর।
”তুই এত আস্তে আস্তে খাচ্ছিস কেন। তাড়াতাড়ি শেষ কর। আর একটা নে। যা করবি কুইক করবি, কখন মরে যাবি তা তো জানিস না।”
প্রণবেশ জানলা দিয়ে অন্ধকার কেল্লার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।
”দীর্ঘকাল বাঁচাটা, কলকাতায় বাস করে অসম্ভব। এত রকমের ঝঞ্ঝাট, এত উৎপাত। আর এসব জ্ঞানের কথা বাঞ্চোৎ পণ্ডিতরা বলে যাচ্ছে আর ছাপা হচ্ছে যে শুনলেই তুই মরে যাবি। পৃথিবীর সব থেকে পলিউটেড শহরের একটা যে কলকাতা এটা সববাই জানে। জেনে দিব্যিই আছে। কিন্তু হিসেব কষে যন্তর দিয়ে মেপে যদি তোকে বলা হয়, কলকাতায় পাঁচ হাজার কারখানা, সাড়ে সাতাশ হাজার ফার্নেস, কয়েক লক্ষ উনুন, কয়েক হাজার গাড়ি থেকে রোজ হাজার টন ধোঁয়া বেরিয়ে ভিজে বাতাসে মাখামাখি হয়ে তোর মাথার উপর দিনরাত বিছানো রয়েছে একটা কম্বলের মতো, তাহলে এটা জানার পর তুই আর সুস্থ থাকবি?”
