সন্দীপ বিরক্ত হয়েছিল। পানুর অভাব রয়েছে এই ছুতোয় সে কিছু সাহায্য করতে চায়। রাত্রে সে প্রায়ই খায় না। বাসি খাবার বাণী সকালে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। ”বড়দা রোজ রোজ বাইরে খেয়ে আসেন আর এগুলো নষ্ট হয়।” সন্দীপ জানে কিছুই নষ্ট হয় না, গরম করে নিয়ে সকালে ওরা খায়।
অলকাকে সে কড়া সুরে বলেছিল, ”আমি হিসেব কষে টাকা দিই না। পানু আমার ভাই টাকাটা তো বাইরের লোককে দিচ্ছি না।”
বাণীর শাড়ি থেকে বাসি টোকো গন্ধ আসছে। কাপড় কাচা সাবান হয়তো ফুরিয়েছে। অভাবের সঙ্গে মানিয়ে চলার অভ্যাস ওর আছে। কোনো অভিযোগ কোনোদিন করেনি। উচ্চচগ্রামে কখনো স্বর তোলেনি, কথাও কম বলে। ওর চোখ দেখলে মনে হবে সর্বদাই যেন কী একটা ভয়ের মধ্যে আছে।
”জুতোর এত দাম? আমাদের ছোটোবেলায় সাত-আট টাকায় একজোড়া জুতো হয়ে যেত। আর এখন…”
”পঞ্চাশ ঠিক নয়, কিছু কমই হবে। আমার বোনের মেয়ের মুখেভাত, একটা স্টিলের বাটি কিনব।”
সন্দীপ কাঠের আলমারিতে টাকা রাখে। চাবি দিয়ে যখন পাল্লা খুলছে, বাণী তখন প্রায় ফিসফিসিয়ে মৃদু স্বরে বলল, ”বড়দা, হাসি কেমন মেয়ে?”
সন্দীপ রীতিমতো অবাক হয়ে ওর দিকে তাকাল। এত বছর পর বাণী এই প্রসঙ্গে এল! ওর এতদিন লাগল পানুর এই ভালোবাসার ব্যাপারটা জানতে? নাকি জানতো কিন্তু মনের মধ্যেই রেখে দিয়েছিল।
”হঠাৎ একথা জিজ্ঞাসা করছ কেন?”
”এমনিই।”
”উহুঁ, এমনি এমনি নয়।”
”বলুন না কেমন মেয়ে।”
”ভালো মেয়ে, যথেষ্ট ভালো মেয়ে। ছোটোবেলা থেকেই ওকে জানি।”
”তুমি হাসিকে দেখোনি?”
”না। শুনেছি খুব সুন্দর দেখতে।”
পানুকে এখন বাঁচিয়ে কথাবার্তা চালাতে হবে। তবে ক্ষতি যা হবার তা হয়েই গেছে। বাণীর মনে সন্দেহের যে ঘুণ পোকাটি ঢুকেছে তা দাম্পত্যজীবনকে ফোঁপরা করবেই বা ইতিমধ্যে করে দিয়েছে। অবশ্য হাসি ছাড়াই যে এটা ঘটবে এমন একটা ধারণা সন্দীপের ছিল। পানুর জীবনে দরকার ছিল যে-কোনো একটি মেয়েকেই নয়, শুধুমাত্র হাসিকেই।
”ওর স্বামী নাকি পালিয়ে গেছল, আবার ফিরে এসেছে।”
”তোমায় কে বলল?”
সন্দীপ সজাগ হল। অলকা যেখান থেকে শুনেছে সম্ভবত বাণীও সেই সূত্র থেকে খবর পেয়েছে। এ-বাড়িতে দুটি বউয়ের সঙ্গে এইসব আলাপ একজনের পক্ষেই করা সম্ভব।
”মা নিশ্চয়।”
”যেই বলুক।”
সন্দীপের হঠাৎ গম্ভীর হওয়াকে অগ্রাহ্য করেই বাণী আবার বলল, ”অনেকেই নাকি ওকে বিয়ে করতে চেয়েছিল? সত্যি?”
”দারুণভাবে সত্যি।”
ব্যাপারটাকে হালকা করে দেওয়া দরকার। কী ধরনের কথা ওর কানে গেছে সন্দীপ তা আঁচ করতে পারছে।
”আমি পর্যন্ত হাসির প্রেমে পড়েছিলুম।”
বাণী ফিকে হাসল। বিশ্বাস করল না। কিন্তু সত্যিই একসময় সন্দীপের ধারণা হয়েছিল সে হাসিকে ভালোবাসে। তখনকার বয়স কুড়ি-একুশ।
লম্বা একটা খামের মধ্যে টাকা থাকে। সে বা অলকা, দুজনেরই এটা এজমালি তহবিল, দুজনেই এর থেকে টাকা খরচ করে। টাকা বার করলেই সঙ্গে সঙ্গে তারা অঙ্কটা খামে লিখে কত টাকা আর রইল সেটাও বিয়োগ দিয়ে রাখে। এজন্য খামের মধ্যে একটা ছোট্ট পেনসিল রাখা আছে।
কে কত টাকা রাখবে সেটা অলকাই ঠিক করে দেয় এবং সন্দীপ কোনো যুক্তি বা তর্কের মধ্যে না গিয়ে সঙ্গে সঙ্গে তা মেনে নেয়। সে দেয় মাইনের অর্ধেক এবং অলকা যেহেতু বাইরে থাকে তাই তার ভাগে মাইনের এক-তৃতীয়াংশ। তাইতে সাত বছর আগে মোট হয়েছিল সাড়ে ন’শো টাকা। এর থেকেই সন্দীপ দুশো টাকা দেয় বাণীকে তার খাওয়ার জন্য। প্রতিবছর দুজনেরই মাইনে বাড়ে, কিন্তু এজমালি তহবিল বাড়েনি। একই সাড়ে ন’শোই রয়ে গেছে।
খাম থেকে পঞ্চাশ টাকা বার করে সে আরও পঞ্চাশ বার করল নিজের জন্য। রত্নাকে আজ চীনে খাবার খাওয়াতে হবে কিংবা ঝাল দেওয়া পাঞ্জাবি মাংসের রান্না। ওর সঙ্গে আজ কোথায় যেন দেখা হওয়ার কথা।
খামে টাকার অঙ্কটা লিখে সে ভ্রূ কোঁচকাল। তার মাইনে আগামী সোমবার, বোধহয় অলকারও। কিন্তু শনিবারের আগে সে টাকা খামে জমা পড়বে না। যা রইল হিসেব করে দিন সাতেক চলে যাবে। মানিব্যাগেও সত্তরের মতো আছে। প্রতিমাসের শেষে এই একটা চিন্তা সন্দীপের অস্বস্তির কারণ হয়। শেষের কটাদিন কিছুতেই টাকা থাকে না। দু-চারবার ব্যাঙ্ক থেকেও তুলতে হয়েছে।
পাঁচটা নোট বাণীর হাতে দিয়ে সে মৃদু স্বরে বলল, ”হাসিকে নিয়ে অত চিন্তা করছ কেন? কিছু শুনেছ কি?”
বাণী যেন বিচলিত হল। চোখ নামিয়ে মুঠোয় আঁচলটা শক্ত করে ধরে মাথা নাড়ল।
”কী শুনব আর।”
”পানু বেরোবে কখন?”
”বারোটায়। এখন বাজার গেছে।”
”কদিন ঝালের মাছ খাইয়েছ, আর নয়। এবার কম তেল কম ঝাল।”
”কেন, গোলমাল হয়েছে নাকি?” বাণী সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল। ”আমি তো খুব বেশি তেল-ঝাল-মশলা দিয়ে রাঁধি না।”
”হয়নি, কিন্তু হতে তো পারে। সাবধান হওয়া ভালো। কাকাকে দেখছ, চিরকাল সেদ্দই খেয়ে গেলেন, কি স্বাস্থ্য রেখেছেন বল তো?”
”কাকা বিয়ে করেননি।”
বাণীর মতো সন্দীপও হালকাভাবে একই কারণে হাসল। পাড়ারই বস্তিতে পাঁচ ছেলেমেয়ে আর এক-পা কাটা স্বামী নিয়ে শৈলবালা থাকে। গত পনেরো বছর জগন্নাথের ঘরের কাজ করছে। এই বাড়ির সকলের এমনকি পাড়ারও অনেকের অনুমান ওদের দুজনের অন্য সম্পর্কও আছে। দোহারা গড়নের, বছর পঁয়তাল্লিশ বয়সের শৈলবালা এ বাড়ির কারুর সঙ্গে কথা বলে না। সন্দীপ কিন্তু বিশ্বাস করে না কাকা কখনো কোনোরকম যৌন ব্যাপারে লিপ্ত হয়েছে বা হতে পারে। বাবার মৃত্যুর পর তাদের দুই ভাইয়ের জীবনের একটা দীর্ঘসময় আড়াল থেকে কাকার সতর্ক শাসনে কেটেছে। একই বাড়িতে থেকেও খুব কম তাদের দেখা হত, এখনও কদাচিৎ দেখা হয়।
