সংসার একটা সমুদ্রের মত। মানুষগুলো সব ছোট ছোট নৌকো। ঢেউয়ে টলমল করতে করতেও ঠিক ভেসে বেড়ায়। সেটা হয় মাঝির কেরামতিতে। কিন্তু হঠাৎ তুফান ওঠে, বড় বড় ঢেউ আচমকা ঝাপটা মারে, তখন ঠিকমত হাল সামলাতে না পারলেই নিশ্চিত ডুবে মরা।
মাধবী সত্যি সত্যি যেন মৃত্যুকে চোখের সামনে দেখতে পেল। যমুনার ঝকঝকে মাছকোটার বঁটি নিয়ে ঢুকল রমা। মাধবী ঘর থেকে বেরিয়ে দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল। মাছটার মৃত্যু অনেক আগেই ঘটেছে। তবুতো ওটা কাজে লাগবে! মানুষের মন যদি মরে যায়, তাহলে সেটা কি কাজে লাগবে? বঁটিটার মন নেই তবু ওটা কাজে লাগছে। কাজে লাগছে নয়, লাগান হচ্ছে। লাগাচ্ছে মানুষে। মানুষের যদি মন না থাকে বঁটিরও মন নেই। মন যদি না থাকে তাহলে এ সংসার বলে তো কিছু থাকে না।
মাধবী শিউরে উঠল মনে মনে। এ সংসারকে ভালবাসি। না হলে প্রাণপাত করে খাটছি কিসের জন্য। হঠাৎ ঢেউ আসে, আঘাত আসে। ওটাতো আসবেই। তরতর করে সুখে কার জীবনই বা কাটে! আঘাত অনেক রকমের হয়। সব কি আর একটা জীবন দেখে যেতে পারে। তবু সেই মানুষই অভিজ্ঞ, যে অনেক আঘাত পেয়েছে। সুখ কি অভিজ্ঞতা বাড়ায়? রমাটা মহা উৎসাহে এখন মাছের আঁশ ছাড়াচ্ছে। ওর জীবনে এখন এটা সুখের মুহূর্ত। মাছটা খাওয়া হয়ে যাবার পর, এই সুখ কি টিঁকে থাকবে? একদিনেই ফিকে হয়ে মুছে যাবে। আর দুঃখের মাঝে সুখের স্মৃতি, অসহ্য, অসহ্য। ফুলশয্যার কয়েকটা মাত্র ঘণ্টা, এখন মনেই পড়ে না। পড়লেও জ্বালা ধরায় মনে। কিন্তু তাই বলে কি অনন্তকাল দুঃখকেই বিয়ের কনের মতো সাজিয়ে গুজিয়ে মনের মধ্যে তুলে রাখতে হবে নাকি! এ দুঃখ না কাটিয়ে উঠলেই তো ডুবতে হবে। তার মানে মৃত্যু। মরলে সংসার দেখবে কে? এই ছোট সংসারের মানুষগুলোকে দিন থেকে রাত পর্যন্ত আমিই চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। ওদের সুখস্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থা করছি, কাল ওরা কি খাবে তার কথাও ভাবছি। মেয়ের বিয়ে, ছেলের লেখাপড়ার চিন্তা করছি। আমি যদি মরি, ওরাও বাঁচবে না। রমার এই খুশি খুশি মুখ থাকবে না। সানুর লাফালাফি বন্ধ হয়ে যাবে। চিনুই বা কার হাতে টাকা তুলে দেবে!
-না-ধুয়ে, কুটে ফেলিস নি যেন।
-জানি জানি ইলিশ কি করে কুটতে হয়।
ঘাম জমে গেছে রমার কপালে নাকে। হাঁটুতে মুখ ঘষে, মাথার কাছের আঁশগুলো নখ দিয়ে ছাড়াতে লাগল।
-মুড়োর মাছে খুব কাঁটা হয়, সরু সরু, তাই না?
-মুখ তুলে একবার তাকাল রমা। মাধবী কোন কথা বলল না। মাছ ধুয়ে কাটতে বসল রমা। দুহাতে মুড়োটাকে বাগিয়ে সে আবার তাকাল মাধবীর মুখের দিকে।
-আর একটু ছেড়ে কাট। কাল ছ্যাঁচড়া করব’খন।
মুড়োর সঙ্গে বেশ কিছুটা মাছ রেখে কাটল রমা। মাধবীর নির্দেশমত মাছকোটা শেষ হল। চান করে ঘরে ঢুকল চিনু। যমুনাকে বঁটি দিয়ে আসতে বেরিয়ে গেল রমা।
গোটা ইলিশ এ বাড়িতে হঠাৎ কখনো আসে। নয়তো কাটা-মাছ, এত বেশি দাম দিয়ে কিনে মুখের স্বাদ বদলায় এ বাড়ির লোকেরা। যমুনা পূর্ববঙ্গের মেয়ে। তার কাছ থেকে দোতলার বড় বউ ইলিশ-ভাতে রান্না শিখে একদিন গোটা-ইলিশ এনেছিল। কদিন ধরে সে শুধু ইলিশ-ভাতেই করেছিল। রান্নাটা তার ভাল লেগেছিল। ইলিশ মরশুমি মাছ। সারা বছর পাওয়া যায় না। তা’ছাড়া খুব শস্তার মাছও নয়। আর, এক-টুকরো খেয়ে মন ভরে না।
মনমেজাজ ভাল থাকলে, হাতে বাড়তি কিছু পয়সা কোনরকমে জমে উঠলে, কি খাতিরের কোন অতিথি হাজির হলে কিংবা আর কোন কাজ ঘটলে, খাওয়া দাওয়ার কিছু ঘটা এ বাড়িতে হয়। মাছ দামি জিনিস, তাছাড়া সব সময় জোটেও না, আর জুটলেও সকলের পাতে পেট ভরিয়ে দেওয়া যায় না। মাছ না হলেও মাংস দেওয়া যায়। সেদিন উৎসব পড়ে যায় যে ঘরে মাংস রান্না হয়। কচি-কাঁচাগুলো ঘুর ঘুর করে উনুনের কাছে। জুলজুল করে তাকায় টগবগে হাঁড়িটার দিকে। বুক ভরে শ্বাস টেনে মিটিমিটি হাসে এ ওর দিকে তাকিয়ে। বিয়ের বয়সী মেয়েরা টুকরো টুকরো প্রশ্নে বিব্রত করে মায়েদের, কেননা মায়েরাই রান্না করে। মেয়েরা জানে, বিয়ে হবে তাদেরই মতো অবস্থার কোন ঘরে। সেখানে মাংস খাওয়ার দিন রোজ রোজ আসে না। বছরে হঠাৎ কয়েকটা জুটে যায়। তোয়াজ করে পেট ঠেসে খেয়ে নেবে সকলে, যেন অনেকদিন এই খাওয়ার আমেজটুকু মনে থাকে। বৌয়েরা যদি ভাল না রাঁধে,-পুরুষদের ধারণা কমবয়সীরাই ভাল মাংস রাঁধে-তাহলে খাওয়ার মেজাজ মাটি! তাই বৌ হবার আগে নিজেদের গরজেই মেয়েরা মাংস রাঁধা শিখে নেয়। ভাল রান্নার সঙ্গে শ্বশুরবাড়ির মন পাওয়ার যেন সম্পর্ক আছে। তাই আইবুড়ো মেয়েরা রান্নার উমেদারী করে, প্রশ্ন করে করে যতটা পারে জেনে নেয়। বছরে রোজ রোজ মাংস খাওয়ার দিন আসে না, তাই মায়েরাও ভরসা করে আনাড়ির হাতে রান্না ছেড়ে দেয় না। গলদা চিংড়ি এলেও এই একই অবস্থা ঘটে। কিন্তু ইলিশ খেতেই মজা। রান্নায় বিশেষ দড় না হলেও চলে।
-ভাতে করবে, মা?
উনুন খুঁচিয়ে ফেলা হয়েছিল। কাঠকুটো দিয়ে চিনুর জন্য দুটো মাছ ভেজে দেবার জন্য মাধবী তোড়জোড় শুরু করেছে।
-চিনুকে জিগ্যেস কর। ওতো ঝাল ভালবাসে না।
চুল আঁচড়াচ্ছিল চিনু। রমার কথায় ঝাঁঝিয়ে না বলে দিল। মুখ গোমড়া করে মাধবীর পিছনে এসে দাঁড়াল রমা।
