এইসব মানুষ, যাঁরা ঠিক-বেঠিক, ভালো-মন্দ, যেমনই হোক কিছু একটা বিশ্বাস করে এবং সেই বিশ্বাস আঁকড়ে থাকে ও সেইমতো চলে, সন্দীপ তাদের সমীহ করে। এবং কাকার প্রতি সমীহ জানাতেই সে বারান্দায় ডন দিতে শুরু করল।
গুনে ষোলোটা ডন দেবার পর আর সে পারল না। বারান্দার রেলিং দুহাতে ধরে মুখ নীচু করে হাঁফাতে হাঁফাতে রেলিংয়ের ফাঁক থেকে দেখতে পেল মানু তার স্কুটারটা সদর থেকে নামিয়ে ফুটপাথে রাখছে আর স্কুল ইউনিফর্ম-পরা দেবু ছুটে তার কাছে এল। স্কুল-বাসের জন্য ছেলেটা সদরে এইসময় দাঁড়িয়ে থাকে।
মানু ঘন ঘন মাথা নেড়ে দেবুকে প্রত্যাখ্যান করতে করতে রাস্তায় স্কুটার এনে স্টার্ট দিল। বিষণ্ণ দেবু পায়ে পায়ে আবার ফিরে এল সদরে।
মানু এইসময় প্র্যাকটিশে যায়। সন্দীপ মুখ ফিরিয়ে ঘরের টেবলে রাখা টাইমপিসে সময় দেখল। অলকা এখন ট্রেনে।
প্রায় ছয় ফুট, ছিপেছিপে মানুর গায়ে সবুজ ফুলছাপ দেওয়া শার্ট। মাথার চুল কপাল থেকে কানের প্রান্ত পর্যন্ত ফিলানের মতো কপালে ঢেকে সাজিয়ে নামানো। ঘাড়ের কাছে সমান্তরাল চাঁছা। পরচুলার বিভ্রম আনে এক একসময়। মুখটিতে বালকসুলভ কমনীয়তা দিয়েছে ওর কেশসজ্জা, কিন্তু গালদুটি বসা। এখন ওর ছাব্বিশ চলছে, কলকাতার নামি ফুটবলার। এখান দিয়ে যাবার সময় বহুলোক, বিশেষত ছেলেরা এই বাড়ির দিকে তাকায়। ছবি আর হেডলাইন মানু প্রায়ই পায় কাগজগুলোয়।
স্কুটারে স্টার্ট দিয়ে মানু হাত নেড়ে দেবুকে ডেকে প্যান্টের পিছনের পকেট থেকে ব্যাগ বার করল। দেবু ছুটে এসেছে। সন্দীপ চারতলা থেকে স্পষ্ট দেখতে পেল মানু একটা দশ টাকার নোট ওর হাতে দিয়ে তর্জনী তুলে শাসানির ভঙ্গিতে কিছু একটা বলল। দেবু ফ্যালফ্যাল করে নোটটার দিকে তাকিয়ে। দশ টাকা পেয়ে যাওয়াটা ওর কাছে অকল্পনীয়, হয়তো চকোলেট কেনার জন্য পয়সা চেয়েছিল। দেবুর কাছে ওর কাকা হিরো। নিশ্চয় স্কুলে ওর প্রচণ্ড খাতির অন্য ছেলেদের কাছে যেমন তার অফিসেও অনেকের কাছে সে শুভদীপের দাদারূপে সম্ভ্রম পেয়ে থাকে।
মানুর স্কুটার মুরারির দোকানের সামনে থামল। একমুঠো বিস্কুট হাতে মুরারি যেভাবে প্রায় ছুটে এল তাতে মনে হয় এটা নিয়মিত ব্যাপার। মানু বিরক্তিভরে বিস্কুটগুলোকে দেখে যেন ধমক দিল। মুরারি কাঁচুমাচু হয়ে অপরাধীর ভঙ্গিতে বারবার কী বলছে। ওর প্রসারিত হাত থেকে মানু একটা বিস্কুট তুলে নিয়ে মুখে দিল এবং ফু ফু করে সেগুলো মুরারির মুখে থুথু সমেত ছড়িয়ে এবং একচাপড়ে হাত থেকে বিস্কুটগুলো রাস্তায় ফেলে দিয়ে সে নির্বিকার ভঙ্গিতে স্কুটার চালিয়ে চলে গেল। ব্যাপারটা যেন সহজ ও সামান্য মানুর কাছে।
সন্দীপের অদ্ভুত লাগে তার এই মত্ত ভাইটিকে। ছোটোবেলা থেকেই ওর মধ্যে ভারসাম্যের কিছুটা অভাব ছিল। গত তিন-চার বছরে ওর স্তাবক-ভক্তদের সংখ্যা বৃদ্ধিতে, হাজার হাজার নগদ কালোটাকা হাতে আসায়, খবরের কাগজে ম্যাগাজিনে নিয়মিত প্রচার পেয়ে আর দলের অপরিহার্যরূপে গণ্য হয়ে ওর মানসিকতা একটা অবুঝ শিশু-দৈত্যের মতো হয়ে গেছে। সম্ভবত ও অসুখী।
পানুর পাশের বারান্দাটা একই মাপের। দড়িতে টাঙ্গানো হ্যাঙ্গারে ঝুলছে মানুর গেঞ্জি। এককোণে দুটো টবে লঙ্কাগাছ। মা ঝাল খেতে ভালোবাসে। বাজারের লঙ্কায় আর ঝাল পাওয়া যায় না। রত্না একবার তাকে বলেছিল: ”সর্বনাশ করেছে ওই কেমিক্যাল সার, আনাজপাতির আর স্বাদই পাওয়া যায় না। উচ্ছেয় তেতো নেই, আদায় ঝাঁঝ নেই, লঙ্কায় ঝাল নেই, রসুনে গন্ধ নেই, পেঁয়াজ কাটতে আগে চোখ দিয়ে হু হু জল পড়ত…”
আজই বিকেলে রত্নার সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা, কিন্তু জায়গাটা যে কোথায় ঠিক হয়েছে সন্দীপের তা মনে পড়ছে না। মাঝে মাঝেই তার এই ধরনের বিস্মৃতি আজকাল ঘটছে। হাসির সঙ্গে পরশু দেখা হওয়ার পরই তার মনে পড়েছিল সুহাস তার একটা আলোয়ান চেয়ে নিয়ে আর ফেরত দেয়নি। ওটার রং ছিল বেলেরপানা। ঠিক কী কারণ দেখিয়ে সুহাস চেয়েছিল তা আর মনে করতে পারছে না। অলকা কাল গুঁড়োমশলা গুঁড়োসাবান কিনে রাখতে বলেছে, কিন্তু হাফ কেজি না এক কেজির বাক্স? যে-কোনোটাই কিনলে হয় বটে। কিন্তু এই কথাটা ইতিমধ্যেই সে ভুলে যাবে কেন? মস্তিষ্কের সজাগ থাকার ক্ষমতা বোধহয় কমে আসছে, শরীরেও তাই হচ্ছে।
সন্দীপ আবার কয়েকটা ডন দেবার জন্য দুহাত মেঝেয় রেখে পা দুটো যখন পিছনে ছড়িয়ে দিতে যাবে তখন দরজায় টোকার শব্দ শুনল। কলিংবেল আছে, এখন তাহলে বিদ্যুৎ নেই। এত সকালে বাইরের কেউ নিশ্চয় তাকে ডাকছে না।
”বড়দা, গোটা পঞ্চাশ টাকা দেবেন।” বাণী সেকেন্ড দুয়েক থেমে আবার বলল, ”আগাম।”
অলকা যখন থাকে না, সেই দিনগুলোয় সন্দীপের খাওয়ার দায়িত্ব বাণীর। পানু একটা বাংলা সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনে বছরখানেক আগে চাকরি পেয়েছে। তার আগে কাজ করেছিল একটা মাল পরিবহণ সংস্থায়। সেই চাকরিটা সন্দীপই সংগ্রহ করে দিয়েছিল। পানু তাকে না জানিয়েই চাকরি বদলেছে এবং মাইনে কমে যাওয়া সত্ত্বেও।
”পঞ্চাশ? মাসের এই সময়ে!”
”দেবুর স্কুলের জুতোটা একদমই গেছে, আর পরতে পারছে না। এমাসে আপনার ভাই পুরো মাইনে পায়নি।”
দুবেলার খাওয়ার জন্য সন্দীপ দুশো টাকা দেয়। অলকা বিস্মিত হয়ে বলেছিল, ”দুউউ শোওও! এত লাগে নাকি? সকালে ভাত, রাতে রুটি, মাছ তো একবেলা, এত হবে কেন?”
