বারান্দার একধারে পাকানো খবরের কাগজটা পড়ে রয়েছে। সে ব্যস্ত হল না। থাকুক আপাতত। বাসটা যাচ্ছে বারান্দার সামনে দিয়ে। সে মুখ নীচু করে দেখতে দেখতে নীচের বারান্দায় পানুকে চেয়ারে বসে কাগজ পড়তে দেখল। একটু অবাক হল পানুর চাঁদিতে টাকের আকার দেখে। মুখোমুখি একদমই বোঝা যায় না ওর চুল কতটা উঠে গেছে। বছরখানেকের মধ্যেই চোখে পড়ার মতো হবে। জলের জন্য কি? পেট গরম হলেও নাকি টাক পড়ে। বংশে টাক আছে। বাবার ছিল, কাকারও রয়েছে।
সন্দীপ লক্ষ করল, পানুর চুলেও পাক ধরেছে। মুখটা লম্বাটে, গায়ের চামড়া ঘন কফি রঙের, পাক্কা ছ’ফুট, শীর্ণ গড়ন। বুকের, কানের পাশে, রগের কাছে চুলগুলো সাদা। ওর বয়স এখন মাত্র সাঁইত্রিশ, তার থেকে প্রায় তিনবছরের ছোটো। পানু ছোটো থেকেই ঢ্যাঙা। ভালো গোলকিপার ছিল, কিন্তু অসুবিধা হত হাইটের টুর্নামেন্টে নামতে। কে বলেছিল, কোমরে শক্ত করে কষে দড়ি বাঁধলে শরীরের উপরাংশ নেমে আসে, হাইট কমে যায়। তাই শুনে একবার পেটে কাপড়ের পাড় বেঁধে, দুদিক থেকে দুজন ওকে যখন বেঁটে করবার চেষ্টায় টানতে থাকে তখন অসহ্য যন্ত্রণা সত্ত্বেও ওর মুখ দিয়ে কোনো আওয়াজ বেরোয়নি। চোখ দুটো শুধু বড়ো হয়ে ছলছলিয়ে উঠেছিল। নীরবে কষ্ট সইবার ক্ষমতাটা ওর জন্মগত।
হাসিকে ভালোবেসেছিল পানু, বিয়ে করতেও চেয়েছিল। কিন্তু সুহাস সব ওলটপালট করে দেয়।
কোলের উপর কাগজ বিছানো, মাথাটা ঝোঁকানো। ঘাড়টা আরও শীর্ণ লাগছে। সন্দীপ দুঃখবোধ করল পানুর জন্য। কাকা জগন্নাথ রোজ ব্যায়াম করতেন। তাদের একদিন ছাদে ডেকে এনে দুই হাতে দুই ভাইয়ের ঘাড় ধরে ঝাঁকানি দিয়ে বলেছিলেন, ”মরদের মতো চেহারা কর, বুঝলি, গায়ে জোর কর নয়তো যবন, ম্লেচ্ছদের হাত থেকে হিন্দুদের বাঁচাবি কী করে, দেশ গড়ার জন্য কাজ করবি কী করে? এই হাতে কটা মুসলমান মেরেছি জানিস?” তারা সিঁটিয়ে গিয়ে কাকার দুই পাঞ্জার দিকে তাকিয়ে ছিল। ওরা পাড়ার লোকের কাছে গল্প শুনেছে ছেচল্লিশের দাঙ্গায় শেখবাগান বস্তির অর্ধেক মানুষকে তিনি একাই কুপিয়ে শেষ করেছিলেন। সারা উত্তর কলকাতায় ”জগা” শব্দটা তখন ছড়িয়ে গেছল ভয় আর বিভীষিকার অপর নাম হিসাবে। রাস্তা দিয়ে হাঁটলে সবাই আঙুল দিয়ে তাকে দেখাত, ফিসফাস করত। কপোÅরেশন ইলেকশনে প্রথম দাঁড়িয়ে এগারোজন প্রার্থীর মধ্যে শেষ স্থান আর বত্রিশ ভোট পেয়েছিলেন জগন্নাথ দত্ত। সন্দীপের এখনও মনে পড়ে, উঠোনে উনুন পেতে লুচি, আলুরদম, বোঁদে তৈরি হয়েছিল। ষাট-সত্তরজন ভলান্টিয়ারের অবিরাম আনাগোনা, চিৎকার। সারা বাড়িতে উত্তেজনার মধ্যে পানু তাকে ফিসফিস করে বলেছিল, ”কাকা হেরে যাবে, তুই দেখে নিস।” যবনদের হাত থেকে যাদের রক্ষা করলেন তাদের এহেন আচরণে বিমূঢ় হয়ে দিনতিনেক ঘরেই শুয়েছিলেন। এখনও প্রায় সারাদিনই একতলায় সদরদরজার বাঁদিকে তাঁর ঘরের মধ্যেই থাকেন। দরজার পাল্লা কোনো কারণে ফাঁক হয়ে গেলে তাকে দেখা যায় ইজিচেয়ারে, খোলা জানালা দিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে।
পানুটা সেদিন কী করে যে অমন ভবিষ্যদ্বাণী করে ফেলল! সন্দীপ শুধু অবিশ্বাসভরে তাকিয়ে থেকে বলেছিল, ”ছি^ঃ এমনকথা আজ বলতে নেই, কাকা শুনলে দুঃখ পাবেন।” পানু তখন তার হাতটা চেপে ধরেছিল ভয়ে।
পাতলা একটা হাসি ভেসে গেল সন্দীপের ঠোঁটের উপর দিয়ে। মাথা নীচু করে আবার দোতলার বারান্দায় তাকাল। বাসি চায়ের কাপ হাতে পানুর পাশে দাঁড়িয়ে। সাত বছরের দেবু স্কুলের ইউনিফর্ম পরে জুতোহাতে অপেক্ষা করছে। হাত বাড়িয়ে নেবার সময় পানু শুধু কাপটার দিকেই তাকাল। বাণী কী একটা বলল, পানু কাগজে চোখ রেখেই মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। ছেলেকে জুতো পরিয়ে দেবার জন্য বাণী উবু হয়ে বসল।
বাণী মোটা হয়ে গেছে। বুক আর তলপেট ঝুলে পড়েছে স্ফীত হয়ে। ঘাড়ে একদলা মাংস। হাসির বিয়ের দুবছর পর পানু বিয়ে করে। তখন বাণীর ছিপছিপে, উত্তেজক, তীক্ষ্ন শরীর ছিল। তারকেশ্বরের কাছাকাছি এক গণ্ডগ্রামে গিয়ে সন্দীপই দেখে পছন্দ করে অষ্টম শ্রেণীতে পাঠরতা পাত্রীকে। তার মনে হয়েছিল, হাসির স্মৃতি থেকে রেহাই পেতে পানুর এখন ডুবে যাওয়া দরকার ভালো শরীরের কোনো মেয়ের মধ্যে। কি যে বোকার মতো ধারণায় একসময় মাথাটা ভরা ছিল। তখনও তার নিজের বিয়ে হয়নি। পানু অবশ্য কোনোদিন অনুযোগ করেনি বাণীর নির্বাচন নিয়ে। নীরবে যন্ত্রণা বহনের ক্ষমতা ওর আছে। সন্দীপ কুঁকড়ে থাকে এই ব্যাপারটিতে।
কাকা গঙ্গাস্নানে যাচ্ছন। লুঙ্গি, গেরুয়া খদ্দরের ফতুয়া, হাতে প্লাস্টিক থলি। স্বাস্থ্যটা এখনও মজবুত। দুটো পুরোবাহু, ঘাড় এবং কাঁধের প্রস্থ তিরিশ বছর আগের মতোই রয়েছে। ওইসময়ই তিনি দুই ভাইপোকে ব্যায়ামে উৎসাহী করার চেষ্টা করেছিলেন। প্রথম ডনটি দিতে গিয়ে সন্দীপ কনুই সোজা করে আর উঠতে পারেনি। উপুড় হয়ে ছাদে শুয়ে পড়েছিল। পানু কিন্তু পরপর চারটে ডন দেয়।
”জীবনে তোর কিসসু হবে না।”
কাকা বিরক্তিভরে তাকিয়েছিলেন। ছাদ থেকে নামার সময় সিঁড়িতে সে পানুকে চড় কষিয়েছিল।
”নিশ্চয় তুই আগে ডন দেওয়া প্র্যাকটিস করেছিস।”
অস্বীকৃতি জানিয়ে পানু নীরবে মাথা নাড়ে। কিন্তু সে বিশ্বাসও করে। পানু তার কাছে কখনো মিথ্যা বলে না। ছোটো থেকেই ধর্মভীরু। সন্দীপের হঠাৎ মনে পড়ল প্রায় মাসখানেক সে কোনোরকম ব্যায়ামই করেনি। একসময় কাকার সামনে পঞ্চাশটা পর্যন্ত ডন দিয়েছে। এখন গোটা পনেরোর বেশি পারে না। পানু বোধহয় একটাও পারবে না। সন্দীপ তার কোমল দৃষ্টি পানুর মাথা ঘাড় বুক বাহুতে বুলিয়ে কাকাকে খুঁজল। লোকটি অস্বাভাবিক করুণ এবং ভারসাম্যহীন। দেশ আর দশের সেবা করার জন্য নিজে থেকেই একটা পথ বেছে নিয়ে চলতে গেছিলেন। শরীর চর্চা, অকৃতদার থাকা, নিত্য গঙ্গাস্নান ও গীতাপাঠ, নিরামিষ আহার প্রভৃতি সেই পথেরই পাথেয় ছিল। স্নান এখনও অব্যাহত, বিয়েটা করেননি, কিন্তু বাকিগুলি এখন পালন করেন কিনা সন্দীপ তা জানে না। ছোটোবেলায় সে ওঁর ঘরের দেয়ালে শ্রীকৃষ্ণের একটা রঙিন ছবি দেখেছিল। কুরুক্ষেত্রে রথের সারথি, বিমর্ষ অর্জুনের দিকে গম্ভীরভাবে তাকিয়ে। প্রতিদিন গঙ্গাস্নান থেকে ফিরে একটি বেল বা রজনীগন্ধার ছড়া ছবিতে ঝুলিয়ে দিতেন। তার নীচেই কাঠের ব্র্যাকেটে বসানো শিবাজীর ছোট্ট একটা আবক্ষ পিতল মূর্তি। গলায়ও একটা ছড়া। হয়তো এই নিত্যকর্মটি এখনও টিকে আছে।
