”আমি যাচ্ছি।”
আজও সন্দীপ কথাটা শোনার জন্য বালিশটা বুকে আঁকড়ে চোখ বুজিয়ে অপেক্ষা করছে। অলকার যাবতীয় শব্দ রুটিনমাফিক একে একে সমাপ্ত হচ্ছে। শব্দ হয়েছে-কলঘর থেকে বেরোবার, চিরুনি রাখার, চটিতে ব্রাশ ঘষার, টেবিলে চাবির গোছা রাখার, এইবার-
”শুনেছ কি, হাসির স্বামী ফিরে এসেছে।”
প্রশ্ন নয়, বিবৃতি। সন্দীপ চোখ খুলল। বেরোতে গিয়ে যেন মনে পড়ে গেছে এমনভাবে অলকা দরজার খোলা পাল্লায় হাত রাখে। খবরটা শুধু জানানো ছাড়া কোনো কৌতূহল বা আগ্রহ তার দাঁড়ানোয় নেই।
”শুনলে কোথায়?”
”মার কাছে, কাল রাতে বললেন।”
বলরাম দত্তর প্রথম স্ত্রী দুই ছেলে সন্দীপ ও প্রদীপকে রেখে মারা যাবার পর তিনি আবার বিয়ে করেন আজ থেকে প্রায় আটাশ বছর আগে এবং শুভদীপের জন্মের দেড় বছরের মধ্যেই মারা যান। বিধবা ভারতী ও তাঁর ছেলে দোতলার অর্ধাংশ নিয়ে আলাদা রয়েছেন। স্বামীর প্রথমপক্ষের দুই ছেলেকে যেমন তিনি বরাবরই বিশেষ পছন্দ করেননি, তেমনি তারাও এই মা-র হৃদয়কে স্নেহে ও বাৎসল্যে টলমল করাতে আবেগ সঞ্চারের চেষ্টায় নিবৃত্ত থেকেছে। দু তরফের নৈকট্যের মাঝে অবিশ্বাস উদাসীনতা ও সন্দেহের একটা পর্দা ঝুলে থেকেছে সর্বদা। কিন্তু কখনোই কেউ পর্দাটা সরাবার জন্য হাত বাড়ায়নি বরং সন্তর্পণে হাত টেনেই রেখেছে আর সযত্নে তিক্ততা বিসম্বাদ এড়িয়ে গেছে। ফ্ল্যাটবাড়িতে তিন প্রতিবেশীর মতো পরস্পরের ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে ওরা বাস করছে, অন্তরঙ্গতা ও আত্মীয়তা যতটা দরকার তার বেশি নয়।
শুধু পারেননি একতলায় বাসিন্দা জগন্নাথ। সন্দীপের কাকা। বিয়ে করেননি, একটি ঘর নিয়ে থাকেন এবং এই বাড়ির অর্ধেক অংশের মালিক। দাদা বলরামের দ্বিতীয় বিবাহে তাঁর সায় ছিল না। নানান ব্যাপারেই বয়সে অন্তত ১২ বছরের ছোটো বউদির বা ভাইপো মানুর সঙ্গে তার বিবাদ হয়।
হাসির স্বামীর প্রত্যাবর্তনের খবরটা অলকা কাল রাতেই জানতে পারত। কিন্তু তাহলেই এই নিয়ে একটা আলোচনার কারণ ঘটত এবং অলকা সেটা চায়নি। ওর সব ব্যাপারে কোনো কৌতূহল নেই।
”ভালো। তোমার বোধহয় দেরি হয়ে গেছে।”
বাঁহাত তুলে অলকা ঘড়ি দেখেই বেরিয়ে গেল। সন্দীপ আড়মোড়া ভেঙে আবার বালিশটা বুকে জড়িয়ে নিল। শনিবারই হাসির সঙ্গে বিকেলে একমিনিটের জন্য দেখা হয়েছে।
ধর্মতলায় রাণী রাসমণি রোড পার হচ্ছিল হাসি। একটা মন্থর দোতলা বাসের পাশাপাশি জোরেই আসছিল মিনিবাসটা। হাসি সেটা লক্ষ্য না করে রাস্তা পার হচ্ছিল। সে মিনিবাসের মুখে পড়ে যায়। একটা ব্রেকের শব্দ ছাড়া কোনো দুর্ঘটনা হয়নি। হাসি বিব্রত বিভ্রান্ত মুখে রাস্তার মাঝে সিমেন্টের আলের উপর উঠে পড়ে। চাপা না পড়লে এসব ব্যাপারের দিকে কেউ নজর দেয় না। এবার দুধার দেখে সে বাকি অর্ধেক রাস্তাটা পার হয়। সন্দীপ ওইখান দিয়েই তখন যাচ্ছিল। সে দাঁড়িয়ে পড়ে। হাসিকে দেখে।
”এভাবে রাস্তা পার হয় কেউ, যাচ্ছিলে তো আজ। এত ব্যস্ততা কীসের?”
হাসি থতোমতো হয়ে হাসবার চেষ্টা করে। ”বাস ধরতে হবে, তাড়া আছে সানুদা।”
হাসি ব্যস্ত হয়ে দু’পা এগিয়েই ঘুরে দাঁড়িয়ে কিন্তু কিন্তু করে বলল। ”ও ফিরে এসেছে জানো?”
”কে, সুহাস!”
অকল্পনীয় ঘটনা। অনেকেরই ধারণা সম্ভবত মরে গেছে। নয়তো কানাডা কি নাইজেরিয়ায় গিয়ে বিয়ে করে ঘর সংসার করছে, অথবা ভারতেই কোথাও জেলে পচছে। সুহাস প্রায় এগারো বছর আগে নিরুদ্দেশ হয়।
”শরীর একেবারে গেছে, খুব ভালো অবস্থা নয়। তুমি এসো-না আমাদের বাড়ি।”
”সময় করাই তো শক্ত।”
”আমাদের টিফিনের সময় এসো, একটায়। তোমায় সব বলব।”
সুহাস হাসির স্বামী এবং সন্দীপের জ্যাঠার ছেলে। প্রায় সমবয়সি তারা। জ্যাঠা বহুকাল আগেই আলাদা হয়ে মুরারির দোকানের পাশের রাস্তা অনিল কুণ্ডু লেনে বাড়ি কিনে উঠে যান। ওই গলিতেই হাসিরা ভাড়া থাকত। পাড়া বলতে সন্দীপ ও প্রদীপ এখনও বোঝে অনিক কুণ্ডু লেনকেই। তাদের বাল্য ও কৈশোর ওখানেই কেটেছে গলিতে ক্যাম্বিস বল খেলে, আড্ডা দিয়ে।
মাসখানেক আগে সন্দীপ গলিতে ঢুকছিল। বাল্যবন্ধু সঞ্জিত ব্লক কংগ্রেস সম্পাদক, তারই খোঁজে গেছল যদি ওর ছেলেরা কয়েক লিটার কেরোসিন জোগাড় করে দেয়, তখন বাড়িটাকে অনেকদিন পর দেখে। প্রায় তিরিশ বছর আগে সুহাসের দিদির বিয়ের সময় যে মেরামত আর কলি হয়েছিল তারপর আর হাত পড়েনি। বাড়ির আধখানা জ্যাঠাই বিক্রি করেন মারা যাবার আগে। বাকি অংশের বাইরের দিকে পলেস্তরা সামান্যই লেগে আছে দেয়ালে, জানালার দুটো পাল্লাই ঝুলে পড়েছে কবজা থেকে, দু-তিনটে গরাদ নেই। সদরদরজায় টুকরো কাঠের তাপ্পি, চৌকাঠের জায়গাটায় গর্ত। একতলায় একখানা ঘর বিহারী কয়লাওলা পরিবারকে ভাড়া দেওয়া, উপরের দুটিতে হাসি থাকে তার বারো বছরের ছেলে বিভাসকে নিয়ে। হাসির জীবনটা কষ্টের।
সন্দীপ আড়মোড়া ভেঙে কলঘরে গেল। মিষ্টি হালকা গন্ধ ভাসছে। অলকার শখ সুগন্ধী সাবান মাখার। আর কোনো শখ কি ওর আছে? একসময় ছ-সাত জোড়া চটি ছিল, এখন মাত্র একজোড়া। প্রতি রবিবার বাজার যেত, এখন মাঝে মাঝে। কলকাতায় স্কুলের কাজ নিয়েই তো বসে থাকে সারাক্ষণ।
বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল সে। বাস আসছে। অলকা এবং তিনজন ফুটপাথ থেকে রাস্তায় নামল। সামনের বাড়ির জানলাটা বন্ধ। দোকানের বেঞ্চে একটা বাচ্চচাছেলে ঘুমোচ্ছে। মুরারি মগভরা জল তার মুখে ছুঁড়ে চিৎকার করল। সন্দীপের কানে ”হারামজাদা” শব্দটা এল। ধড়মড়িয়ে ছেলেটা উঠে বসল।
