তার বিস্ময়ের আর অবধি রইল না।
সবাই যাচ্ছে
সবাই যাচ্ছে – মতি নন্দী – উপন্যাস
প্রতি সোমবার ভোরে সে অপেক্ষা করে কথাটা শোনার জন্য।
”আমি যাচ্ছি।”
আমি আসি বা আমি চললুম নয়। প্রায় সাত বছর ধরে, যখন থেকে অলকা বর্ধমানের খড়িসোনা বালিকা বিদ্যালয়ের হেড মিস্ট্রেসের চাকরি নিয়ে সেখানে বাস করছে এবং প্রতি শনিবার সন্ধ্যায় ফিরে সোমবার ভোরে ট্রেন ধরতে বেরোচ্ছে তখন থেকেই এই শব্দ দুটি তাকে শুনে আসতে হচ্ছে।
আধঘুম-আধজাগরণের মধ্যে সন্দীপের শিথিল মস্তিষ্ক অভ্যাসবশতই অপেক্ষা করে মাড় দেওয়া শাড়ির খসখসানি বা দ্রুত চলাফেরার কিংবা রান্নাঘরে বাসন নাড়ানাড়ির শব্দগুলোর জন্য। কোনো কোনোদিন অলকার ব্যস্ত যান্ত্রিক কণ্ঠস্বরও শুনতে পায়: ”চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।”
তখন সে চোখ মেলে। আড়মোড়া ভেঙে পাশ ফিরে উপুড় হয়ে হাত বাড়িয়ে নিচু টুলটা থেকে কাপ তুলে নেয়। কিছু দরকারি কথা সাধারণত এই সময়ই হয়।
”শাড়ি আর্জেন্ট না অর্ডিনারি?”
”আর্জেন্টের কী দরকার? শুধুমুধু বেশি পয়সা দেওয়া।”
”শনিবার কি যেতে পারবে অমিয়র ছেলের পৈতেয়?”
”যদি তাড়াতাড়ি আসি, ট্রেন বড্ড লেট করছে আজকাল।”
”কী দেওয়া যায়?”
”বইটই দিয়ো, কি খেলার কিছু।”
”বড্ড দাম। মা কিছু বলেছে কাকার ব্যাপারে?”
”চেষ্টা করেছিলেন। এসব ঝগড়া আমার ভালো লাগে না।”
”ওষুধ নিতে ভোলনি তো?”
”নিয়েছি।”
শুকনো খসখসে স্বরে দ্রুত জবাব দেয় অলকা শয়ন-স্নান-রান্নাঘরের মধ্যে ঘুরে ঘুরে কাজের সঙ্গে সঙ্গে। দিনের আলো তখনও যথেষ্ট ফুটে ওঠে না। তাই টেবিলল্যাম্পটা ঘরে জ্বালাতে হয়। একসময় বাঁ হাত তুলে ঘড়িতে চোখ রেখেই উৎকণ্ঠিত স্বরে বলে, ”আমি যাচ্ছি।”
মাসের পর মাস, ছুটির দিনগুলো বাদে, পুনরাবৃত্তি হয়ে যাচ্ছে এই ভঙ্গির, চলনের, উৎকণ্ঠার এবং এই কথার। আজও তাই।
”বই খাতা কিছু ফেলে যাচ্ছ না তো, চাবি?”
তিনতলা থেকে চটির শব্দ দোতলার কাছাকাছি নেমে গেছে। সিঁড়ি থেকে রুটিনমাফিকই উত্তর এল, ”নিয়েছি।”
অলকা কখনো কিছু ভোলে না।
প্রথম দিকে সন্দীপ বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াত। বাড়ি থেকে বেরিয়ে অলকা ডানদিকে ষাট-সত্তর মিটার দূরের বাসস্টপে দাঁড়াবে। দিনের দ্বিতীয় কি তৃতীয় বাসটি সে ধরে। ভোরের ফাঁকা রাস্তা দিয়ে মিনিট পনেরোর মধ্যে হাওড়া স্টেশন পৌঁছে যায়।
অলকার উচ্চচতা পাঁচ ফুট। ওজন আটত্রিশ কিলোগ্রাম, গত দশবছর ধরে। ওর বাঁ কাঁধের ঝোলাটা হাঁটু ছাড়িয়ে যায়। প্রতি পদক্ষেপে হাঁটুর ধাক্কায় সেটা পেন্ডুলামের মতো দোলে। গত সাত বছরে এটা দ্বিতীয় ঝোলা। প্রথমটা চুরি যায় ট্রেনে। শ্যামবাজার থেকে কলেজস্ট্রিট চষে ঠিক আগেরটির মতো হলুদের উপর খয়েরি নকশার আর একটি কিনেছে।
ওর মধ্যে কী কী জিনিস থাকে সন্দীপ ভালোভাবে আজও তা জানে না। কাচিয়ে নেওয়া শাড়ি, গায়ে মাখা সাবান বা খাতার গোছা অলকাকে ভরতে দেখেছে। একবার মুখের ক্রিম আর একটা ব্রাশিয়ারের বাক্স রাত্রে টেবলে দেখেছিল। অলকা তখন রান্নাঘরে। বাক্সে ছাপা ছবিতে বিস্ফারিত রমণীবক্ষের প্রতি কৌতূহলে সে ঝুঁকে পড়ে। তখন বাক্সের এককোণায় ”৩৪” সংখ্যাটি দেখে সে নিশ্চিন্ত হয়, জিনিসটা অলকার নয়। ওকে মুখেও কখনো কিছু মাখতে দেখেনি।
”সেক্রেটারির মেয়ের ওগুলো, কিনতে দিয়েছে।”
ঠান্ডা, আবেগহীন, বিরক্তিমাখা গলায় কথাগুলো বলার আগে অলকা নিঃশব্দে কখন ঘরে ঢুকেছিল। এসব অদরকারি জিনিসকে কেউ তার ব্যাপার হিসেবে ভাবুক এটা সে চায় না। সন্দীপ অপ্রতিভ হয়ে টেবলের কাছ থেকে সরে গেছল।
সেই প্রথমদিকে, আগ্রহের বা মমতার থেকেও কর্তব্যবোধের তাগিদ সন্দীপের মধ্যে কিছুটা প্রবলই ছিল। বারান্দায় দাঁড়িয়ে থমথমে ভারী নিবাত আবহাওয়ায় নিজেকে জারিয়ে অদ্ভুত একটা বিষণ্ণতা বোধ করেছে। তখন সে দেখেছে ফুটপাথে বাড়ির দেয়াল ঘেঁষে ঘুমোন আধল্যাংটো মানুষ আর মাথার কাছে কুণ্ডুলি পাকানো কুকুর। অত সকালেই মানুষের ব্যস্ত হাঁটা, জলের কলে বালতি পেতে গৃহিণী এবং কিশোরীর দাঁড়িয়ে থাকা আর স্নানার্থীর অধৈর্যতা। বাস স্টপের কাছে মুরারির চায়ের দোকান থেকে মন্থর তামাটে ধোঁয়ার উপরে ওঠা ও বাতাসে মিলিয়ে যাওয়া। প্রায় কুড়ি মিটার দূরে, রাস্তার ওপরে বধূটির জানলায় হেলান দিয়ে বাসি বিনুনি খুলতে খুলতে আনমনে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকা। কোনো বাড়িতে ঝিয়ের মৃদু কড়ানাড়ার শব্দ বা ডাক্তারের নির্দেশে আয়ুঃপ্রার্থীর সমান গতিতে পদচালনা-এই সব নিয়ে সে বারান্দায় কিছুদিন সকালে ছিল।
বারান্দার ধার ঘেঁষে ছাদ থেকে বৃষ্টিজলের ফাটাপাইপ নেমে গেছে। কালো শ্যাওলা মখমলের মতো পুরু হয়ে দেয়ালে, সেটা ক্রমশ প্রকাশ্য আলোয় ঘন সবুজের আভা পায় কী করে, সন্দীপ সেটাই গভীর আগ্রহে লক্ষ করেছিল। খট করে শব্দ হলে মুখ ফেরাত। রাস্তা থেকে কাগজটা পাকিয়ে সুতোবেঁধে কখন যে হঠাৎ ছুঁড়ে দেয় কাগজওলা। অদ্ভুত টিপ! তিলতলায় পানুর বারান্দায়ও তো এটা পড়তে পারে! একদিনও তো হয়নি।
সারাদিনের কোলাহল, শব্দ থেকে বিচ্যুত দিনের এই অংশটুকু অপারেশন ঘর থেকে বেরোনো রোগীর মতো আবছা ঘোর অবস্থা তার মধ্যে কিছুক্ষণের জন্য তৈরি করে। সে অলকাকে দেখার জন্য তখন বাসস্টপে তাকায়। কিন্তু তিনতলায় বারান্দার দিকে অলকা কখনোই তাকায় না। পুব থেকে বাস আসবে, মুখ সেদিকে ফিরিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। বাস স্টপে তখন যারা থাকে অভ্যাসবশত স্ত্রীলোক দেখে অলকার দিকে তাকায় এবং মুখ ফিরিয়ে নেয়। তখন সে বুকে একটা মোচড় খায়, অলকার জন্য এবং তার নিজের জন্যও। মাত্র সাঁইত্রিশ বছর বয়স অথচ দ্বিতীয়বার কেউ ওর শরীর চোখ দিয়ে চাটতে চায় না, সন্দীপ নিজেও নয়। অলকা সেটা জানে।
