অতি সহজ সাদামাঠাভাবে যেন মুক্ত স্বাধীন কোনো মানুষকে জানাচ্ছে এমন ভঙ্গিতে উমা বলেছিল। আর কোনো কথা সে বলেনি। সুবলকে সে বাজার করার জন্য কিছু টাকা দিয়ে গেছে। দেয়ালে কান রেখে সুনীত শুনেছিল সুবলের কথা, ”অত কেন, পাঁচটা টাকা দিয়ে যাও।”
ঝিমুনি এসেছে সুনীতের। সন্ধ্যা থেকেই সে অবসন্ন বোধ করছে। বারকয়েক খিদের কথাটা মনে করার চেষ্টা করেছে, যদি তাতে শরীরটা চনমনে হয়ে ওঠে। কিন্তু হয়নি। তার মনে হচ্ছিল মস্তিষ্কও অবশ হয়ে আসছে। একবার কবজিতে আঙুল রেখে নাড়ির স্পন্দন দেখেছিল। অতি ধীর একটা দপদপানি তখন আঙুল বেয়ে তার চিন্তায় উঠে আসে মৃত্যু।
তখন থেকেই মাঝে মাঝে সে স্পন্দন পরীক্ষা করে গেছে। কিন্তু এখন তার মনে হচ্ছে দপদপানিটা যেন আর হচ্ছে না। ভয় পেয়ে সে বুকে হাত রাখল, জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে বুকের ওঠানামা অনুভব করল। পৃথিবীর অসাধারণ যন্ত্রটা রক্ত পাম্প করছে কি করছে না, এখন সেটাই তার বাঁচা বা মরার একমাত্র নির্দেশক। পড়া, দেখা, শোনা এবং নিজস্ব বোধ ও বুদ্ধি দিয়ে যা-কিছু আহরণ করে সে মাথার মধ্যে জমিয়ে রেখেছে তার কিছুই এখন কাজ করছে না, একমাত্র খিদের বোধটুকু ছাড়া।
সুনীত নখ দিয়ে পায়ের পাতা আঁকড়ে ধরল। নখগুলো চেপে বসাল। জ্বালা করছে কি না বুঝতে পারল না। মাথাটা পেছনের দেয়ালে ঠুকল বারকয়েক। ব্যথা করল না। এবার সে ভয় পেল। শরীরে সাড় নেই কেন?
সে হাবার বউয়ের শরীরের এক-একটি অংশ মনে করার চেষ্টা করল। স্মৃতি যেন পিছলে যাচ্ছে। কিছুতেই সে ধরে রাখতে পারছে না নরম মাংসগুলোকে, চুম্বনের স্বাদ বা গন্ধ মনে পড়ছে না, তার শরীরে কোনো সাড়া লাগছে না।
হায় পিতা, তোমাকে অনুসরণ করা আর সম্ভব হল না। সুনীত বন্ধ দরজাটা হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করল। সে নিশ্চিন্ত জেনে গেছে এইভাবেই তাকে মরতে হবে। দেহটা এইভাবেই দেওয়ালে ঠেস দিয়ে পড়ে থাকবে। তারপর পচতে শুরু করবে।
দুর্গন্ধ…সুনীত নাক কুঁচকে শুঁকল। হয়তো এটা তারই পচনের গন্ধ।
মোটর ইঞ্জিনের শব্দ গোলাপবাগান রোড দিয়ে ছুটে গেল। সুনীত উঠে দাঁড়িয়েই টলে গেল। হাঁটুতে জোর নেই, শরীর ভেঙে পড়ছে অবসন্নতায়। নিশ্চয় পুলিশের গাড়ি। এবার গাড়িটা যখন যাবে জানলায় দাঁড়িয়ে হাতছানি দিয়ে ওদের ডাকবে। চেঁচিয়ে বলবে:
”সারেন্ডার, সারেন্ডার করতে চাই।”
দরজা খুলে দেয়াল ধরে সে জানলায় এল। চশমাটা আজও চোখে নেই। কিন্তু সেই একই রকম রয়ে গেছে মাঠটা। জীবনে অজস্র ভুল আর দুর্বলতা তাকে ঠেলতে ঠেলতে এই মাঠে এনে ফেলেছিল। ঠিক কোথায় ঘটেছিল? মাঠের একটা জায়গা সে চিহ্নিত করার জন্য খুঁজতে শুরু করল। ঠিক কোথায় সে হাবাকে…
দুটো বিস্ফোরণ ঘটল সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটা রিভলবারের শব্দ। সুনীত থরথর কেঁপে উঠল। কিছু একটা ঘটছে, কাছাকাছিই। আরও দু’বার রিভলভারের শব্দ হল। এগুলো মৃত্যুর শব্দ। কেউ বা কারা এখন মৃত্যুকে উপেক্ষা করছে বা আত্মসমর্পণ করছে। যেই হোক, সুনীত ভাবল, আমার মতো পচে গলে যাওয়ার জন্য তারা অপেক্ষা করছে না।
জানলার গরাদ ধরে সে নিজেকে ঝাঁকাল। আমি বেরোব, যাই অপেক্ষা করুক, পচে মরা সম্ভব নয়। বাইরে গিয়ে বাঁচার জন্য একটা সুযোগ নেব। দৌড়তে দৌড়তে মিলিয়ে যাব। ওরা কাছাকাছিই রয়েছে, এদিকে হয়তো আসবে। আসার আগেই বেরিয়ে পড়তে হবে।
”পিণ্টু জোরে ছোট…আমি এগোচ্ছি।”
”হাঁটুর নীচে চালিয়েছে…।”
সুনীত নীচের দিকে তাকাল।
একটা ছায়ামূর্তি নিজেকে টেনে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছে। এগোতে গিয়ে চাপা আর্তনাদ করে দাঁড়িয়ে পড়ল।
সুনীত দেখতে পেল সাদা পাঁচিলের উপর উঠছে আর একটা ছায়া।
”পিণ্টু যেভাবেই হোক…আমি টেনে তুলে…”
একটা বিস্ফোরণ সুনীতের মাথার মধ্যে এবার ঘটে গেল। টুকরো টুকরো খসে পড়ছে তার স্নায়ু, হৃৎপিণ্ড, শিরা-উপশিরা।
”অপেক্ষা করো…আমি যাচ্ছি।”
সুনীত ঘর থেকে দালানে এল। সুইচটা কোথায় কে জানে। বুড়ো মানুষটাকে মাড়িয়ে জখম করতে সে চায় না। আলো জ্বলে উঠতেই সুবল ”আহ” বলে চোখ খুলল।
ওর পাশ দিয়ে সুনীত দ্রুত এগিয়ে দরজা খুলে সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করল। পিছনে সুবলের ভীত কণ্ঠস্বর সে শুনতে পাচ্ছে : ”কে, কে, কে গেল?”
আর সে নিজেকে নিয়ে বিব্রত হবে না। এইবার তার শেষ। যা-কিছু দেখাশোনা বোঝার সব নিয়েই এবার সে শেষ করবে। কিছু কি বাকি রয়ে গেল? এখন আর ভেবে লাভ নেই।
যদি রুবি…
কিন্তু কোন রুবি? অন্য কেউ হলেও একই ব্যাপার ঘটত। হাবার বউ…বেচারা। ওকে দোষ দিয়ে কী লাভ।… এক এক জায়গায় এক এক রকম মিথ্যা, বিভিন্ন ভূমিকায় অভিনয় করে যাওয়া।
যেহেতু সে ভীরু…বাবাও ভীরু, শ্বেত ভাল্লুকও।
কোলাপসিবল গেটে তালা। সুনীত পকেট থেকে চাবি বার করে খুলল।
কোথায় সে? পিণ্টু!
অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে সুনীত খুঁজল। দেয়ালের কাছাকাছি কী যেন নড়াচড়া করছে।
কোনোদিনই তার নিজের উপর আস্থা ছিল না।
কিন্তু এখন নয়। এখন…বিশুদ্ধ হওয়ার বোধ আর কি ফিরে আসবে না?…আর একবার, উমা।
টর্চের তীব্র আলো সুনীতের পিঠে এসে পড়ল। পিছনে পায়ের শব্দ, চিৎকার।
”হ্যান্ডস আপ।”
আরও কীসব গোলমাল হচ্ছে কিন্তু সে শুনতে পাচ্ছে না। দু’হাত ধীরে ধীরে তুলে সে দাঁড়িয়ে পড়ল। টর্চের আলোয় তার ছায়াটা সাদা পাঁচিলে পড়েছে। সে দেখতে পেল বিরাট একটা গাছের কাণ্ডের মতো তার দেহ তার উপর যেন দুটি শাখা আকাশের দিকে বাড়ানো।
