সুনীত মুখ ফিরিয়ে তাকাল উমার দিকে। শ্বাসপ্রশ্বাসের ছন্দ থেকে বুঝল ঘুমোয়নি। সহজে ঘুম আসার কথাও নয়। অদ্ভুত এক পরিস্থিতি ওর জীবনে হঠাৎ আজ এসে পড়েছে।
”তোমার নিশ্চয় কৌতূহল হচ্ছে জানার জন্য?”
উমার তরফ থেকে সাড়া এল না।
”পরে সব বলব, তুমি জামসেদপুর থেকে ঘুরে এসে…ক’দিন থাকবে?”
সুনীত জবাব পেল না। উমার কাছ থেকে জবাব পাবার জন্য হাত বাড়িয়েও ঠেলা দিল না। হাতটা ফিরিয়ে এনে সে কাত হয়ে চোখ বুজল এবং সঙ্গে সঙ্গেই প্রায় ঘুমিয়ে পড়ল।
গভীর রাতে উমাকে বুকের নীচে চেপে ধরে সুনীত চুমু খেতে খেতে অনুভব করল ভিজে কাগজের একটা তাল যেন সে জড়িয়ে ধরেছে। ধীরে ধীরে সে নিজেকে নামিয়ে নিল।
”কী হল তোমার?”
”কাল সকালে বাজারে যাব। তোমার জন্য যা পারি কিনে আনব…সুবলকেও ছাড়িয়ে দেব, কয়েকটা দিন যাক।”
অপ্রত্যাশিত উক্তি! শক্ত হয়ে গেল সুনীতের যাবতীয় পেশি। অপ্রতিভ হবার জ্বালাটা সইয়ে নেবার জন্য সে উঠে বসল। তখনই পরপর দুটি বিস্ফোরণ হল গোলাপবাগান রোডের উত্তর দিক থেকে।
সুনীত জানলায় গিয়ে দাঁড়াল। চশমাটা ভিতরের ঘরে রেখে এসেছে। পর্দা সরিয়ে দেখতে পেল, ফুটবল মাঠ, রাস্তা, রাস্তার আলো এবং বাড়িগুলোকে, যে ভঙ্গিতে সে দেখতে অভ্যস্ত তেমনই রয়েছে তবে ঝাপসাভাবে। দূর থেকে মোটর ইঞ্জিনের দ্রুত গমনের শব্দ ভেসে এল।
খুব কাছেই, খাটালগুলোর দিকে আবার একটা বিস্ফোরণ। সুনীতের আপাদমস্তক পেশিগুলো আবার শক্ত হয়ে আসছে। পুলুর গলাকাটার দৃশ্যটা মনে পড়ল, তখন সে এই জানলায়ই দাঁড়িয়ে হাবার বউকে লুকিয়ে দেখছিল। পুলু যখন ছটফট করতে করতে ঘাসে মুখ রগড়াচ্ছিল তখন সে জানলাটা বন্ধ করে পিছিয়ে আসে। একটা জানোয়ার…
একটা বিক্ষোভ সুনীতকে গ্রাস করছে। তার মায়া মমতা করুণা মড়মড় করে ভেঙে হিংস্র আবেগ তার মধ্যে দমকলের ঘণ্টা বাজাচ্ছে। জানলার গরাদ আঁকড়ে সে ঝুঁকে পড়ল।
দুটো ছায়া জানালার নীচ দিয়ে ছুটে গেল পাশের অর্ধসমাপ্ত বাড়ির পাঁচিলটার দিকে। সুনীত ঠিক যেখানটায় টপকে এসেছে, সেখানেই ওরা থামল। গোলাপবাগান রোডে একটা পুলিশের ভ্যান দেখতে পেল সুনীত।
”চটপট…ওরা এসে গেছে।”
সুনীত ফিসফিস করল। গরাদ ধরে সে কাঁপছে।
”টপকাও। শাবাশ। এবার দৌড়োও, দৌড়োও, মিলিয়ে যাও অন্ধকারে।”
সুনীত কাঁপতে কাঁপতে জানলার নীচে বসে পড়ল। দৃষ্টি আবছা হয়ে এসেছে, মাথার মধ্যে ঘূর্ণিঝড়। মাঠের উপর দিয়ে টর্চের রশ্মি ঘুরে বেড়াচ্ছে আনাচে-কানাচে তল্লাশ চালিয়ে। রশ্মিটা গুণেন ভবনের উপর দিয়েও ঝলসে গেল। তখন সুনীত ঘরের ভিতরে দেয়ালটা দেখতে পায়। একদমই সাদা।
সাত
প্যাকেটের ছেঁড়া কাগজগুলো পায়ের কাছে ছড়ানো। দেওয়ালে ঠেস দিয়ে জোড়া হাঁটুতে থুতনি রেখে সুনীত বসে। বিস্কুটের তিনটি প্যাকেট রেখে গেছল উমা। দু’দিনেই তা শেষ হয়ে গেছে। আজ নিয়ে চারদিন কাটল ওর জামসেদপুর যাওয়ার। খিদে এখন হাঙরের মতো তাকে খোবলাচ্ছে।
পাল্লার জোর দিয়ে সুতোর মতো আলোর রেখা। সুবল শোবার ঘরের আলোটা জ্বেলে রেখে গেছে। দেয়ালে কান পেতে সে রান্নাঘর থেকে কোনো সাড়াশব্দ পায়নি অনেকক্ষণ। সুবল ফ্ল্যাটের মধ্যে আছে কি না সে বুঝতে পারছে না।
তলপেটে যন্ত্রণা হচ্ছে। পাকস্থলীটা মুচড়ে উঠছে। সুনীত গত ছত্রিশ ঘণ্টা কিছু খায়নি। প্লাস্টিকের বালতিটা শূন্য আজ সকাল থেকে। জিভটা বারবার গলার ভিতরে নেমে যাচ্ছিল। ঢোঁক গিলতে এখন গলা ব্যথা করছে। মুখে আর থুথু উঠছে না। উমা নেই তাই চা হয় না। সুবলও ভোরে দুধ আনতে যায় না। সুনীত এই নরক থেকে বেরিয়ে শোবার ঘরের দরজার ওপাশে যেতে পারেনি চারদিন। রাতে সুবল দালানে ঘুমোয়।
দুর্গন্ধ জমাট হয়ে রয়েছে। ছোট্ট জানলাটা সে খুলতে পারেনি। বছরের পর বছর বন্ধ থাকায় পাল্লা দুটো এঁটে আছে। ছিটকিনির মুণ্ডিটা এতই ছোটো যে শক্ত করে ধরা যায় না। টানাটানি করে খোলার মতো জোর তার আঙুলে নেই। চারদিন সে কলঘরে বা পায়খানায় যেতে পারেনি। প্রাণপণে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাখতে গতকাল দুপুরে আর পারেনি। এই ঘরের মধ্যেই…সুবল যখন শোবার ঘরে আসবে তখন গন্ধ পাবে কি! জোড়ের ফাঁকটা ছাড়া আর কোনো রন্ধ্র নেই যেখান দিয়ে বাইরের সঙ্গে এই ঘরের সম্পর্ক রয়েছে। এই ক’দিন রাত্রে সে শোবার ঘরে বসে থেকেছে জানলার ধারে। দরজার কাছে গিয়ে দালানে উঁকি দিয়েছে। অন্ধকারে ঠিক কোন জায়গাটায় সুবল শুয়ে আছে ঠাওর করার চেষ্টা করেছে।
সাহস হয়নি ঝুঁকি নেবার। অন্ধকারে সুবলকে মাড়িয়ে ফেললে বা ও যদি জেগে থাকে আর খসখস শব্দ পায় তাহলে কী হবে?…কী হবে, কী হবে?
সুনীত ঝাঁকুনি দিয়ে হাঁটু থেকে মুখটা তুলল। দুর্গন্ধ, খিদে, তৃষ্ণা, অন্ধকার, বায়ুহীনতা। এর মাঝে আরও কতদিন তাকে যাপন করতে হবে সে জানে না। যাপন…অসমালোচিত জীবন নাকি যাপনযোগ্য হয়। কিন্তু কী সমালোচনা করব! একটা কাতর শব্দ তলপেট থেকে উঠে গলায় এসে আটকে রইল। আলোর সুতোটা ছিঁড়ে গেছে, সুবল এখন ঘরে রয়েছে।
যাবার আগে উমা বিস্কুটের প্যাকেটগুলো, এক কেজি টম্যাটো, শাঁকআলু দিয়ে বলেছিল ”হাতে টাকা নেই…দু’দিনের বেশি থাকব না, এতেই চালিয়ে নাও। সুবলকে বলেছি শোবার ঘরের দরজা সব সময় খুলে রাখতে।”
