সন্দেহ নেই সে ঠকিয়েছে, সবাইকে মিথ্যা কথা বলে গেছে। সকলকেই। বিভিন্ন মানুষকে বিভিন্ন ধরনের মিথ্যা। কখনই সে একই মানুষ থাকেনি, বাদল নস্করকে এক রকম, বাবাকে অন্য রকম। শেখ মঞ্জিল, রুবি, উমা প্রত্যেককে আলাদা আলাদা। যখন যেখানে তখন সেই ভূমিকায়। অফিসে চিন্ময়ের সঙ্গে শ্বেত ভাল্লুককে নিয়ে হাসাহাসি, আবার পরমুহূর্তে পঙ্কজ আচার্যের সামনে তটস্থ। আবার সে বদলে যাচ্ছে রুবির শোবার ঘরে, উমার সামনে খাবার টেবিলে।
এগুলোরই যোগফল, সে কিছুই নয়। একটা শূন্য মাত্র। তার সুনির্দিষ্ট ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, মানসিক বিন্যাস ও ভঙ্গি, যার দ্বারা বিশিষ্ট হওয়া যায়, সে-সবের কিছুই তার মধ্যে নেই। শুধু কয়েকটা প্রাকৃতিক অনুভূতি ছাড়া। আজ সকাল থেকে, গত সাতদিন ধরে, বছরের পর বছর সে খুঁজে চলেছে হয়তো নিজেকেই-এটাই হল আসল ব্যাপার।
মাঠ থেকে বিরাট এক সমবেত চিৎকার সুনীতের কানে ধাক্কা দিল। ছেলেরা ক্রিকেট খেলছে। গুণেন ভবন থেকে বেরিয়ে মাঠের ধারে গিয়ে দাঁড়াবার তীব্র একটা ইচ্ছা তার বুকের মধ্যে ফেঁপে উঠল। রাস্তার লোক, গাড়ি, বাস, দোকানের দ্বারা আবার পরিবৃত হবার প্রয়োজন সে বোধ করছে।
হাবার বউ নিশ্চয় পুলিশকে বলেনি হাবার মৃত্যুর পিছনে কী কারণ ছিল। তাহলে পুলিশ এটাকে রাজনৈতিক খুন হিসাবে গণ্য করত না। পুলিশরা অবশ্য সহজ ব্যাপারকে জটিল করে তুলতে না পারলে তৃপ্ত বোধ করে না। হাবার বউ কেন বলেনি এখন তার জানতে ইচ্ছে করছে। ও কি ভাবছে, সুনীত আবার কখনও এসে সেই রাতের মতো ঝাঁপিয়ে পড়বে? ওর চোখের ঝকঝকে সাদা অংশটা হাবা কি কখনও দেখেছে বৃষ্টির দিনে, দূর রাস্তার আলোয় সন্ধ্যার পর বা রাতে ফেরার সময় সুনীত ওকে চালাঘরটায় দেখতে পেত রান্নায় ব্যস্ত অথবা শুধু বসে আছে চটের পর্দাটা তুলে। তাকে দেখলেই ওর চোখ জ্বলজ্বল করে উঠত, পুরু ঠোঁট দুটো ফাঁক হয়ে যেত। সুনীতের মনে হত যেন তার জন্যই অপেক্ষা করে। যতক্ষণ দেখা যায় চোখ দিয়ে অনুসরণ করে যেত।
সুনীত তখন নিজেকে একটা অন্য রকম বোধ করত। যদি কোনোদিন হাবার বউকে না দেখতে পেত, সে মনে মনে দমে যেত, ছটফট করে উঠত। সে ঘুরে উলটোদিকে হাঁটত। চায়ের দোকানে কিছু সময় কাটিয়ে আবার সে গুণেন ভবনের দিকে আসত। যদি ওকে দেখতে পেত অজানা এক ধরনের উত্তেজনা বোধ করত যা উমা বা রুবির কাছ থেকে সে পেত না। ক্ষীণভাবে কৈশোর তার দেহে ফিরে আসত, কমলাকে মনে পড়ত।
সে ভয় পেয়ে গেছল নিজের এইরকম ব্যাপারটাকে আবিষ্কার করে। এটাকে সে অধঃপতন বলবে কি না ভেবে পায়নি। বউটির শরীর, চাহনি, পুরু ঠোঁট, স্তন, নিতম্ব সব মিলিয়ে তাকে নিংড়ে অবশ করে দিত। মনে হত এটা হয়তো তার মুখে ছাপ রেখে যাচ্ছে, যে-কেউই ধরে ফেলতে পারে। এক এক সময় মনে হয়েছে, কাউকে ব্যাখ্যা করে তার খুলে বলা উচিত। সবাইকে নয়, শুধু একজনের কাছে। হয়তো বাবাই একমাত্র তার সমস্যাটা বুঝতে পারত, কিন্তু তখন মনে পড়েনি। আর কখনও দেখা হবে কি না কে জানে!
আজকের এই অবস্থার সূত্রপাত কবে? শেখ মঞ্জিল তাকে কেওকেটা ভেবে ছেলের জন্য চাকরি চেয়েছে। এখন সে নিজেই দূরে কোথাও একটা চাকরি চায়। কতলোকই তো তাদের সমস্যা জানিয়ে তাকে সমাধান বাতলাতে অনুরোধ করেছে, আর এখন দুনিয়ায় এমন একজনও নেই যাকে সে ওই অনুরোধই করতে পারে। তাকে বোধহয় কেউ ঠিকঠাক বুঝতে পারেনি। নিজের দুর্বলতা, ত্রুটি, ঘাটতি সম্পর্কে সে বরাবরই সচেতন, এটাই তাকে উদ্যমী করেছে স্কুল মাস্টারি ছেড়ে চাকরিতে ঢোকায়, স্টেনোগ্রাফার থেকে ছোটোখাটো অফিসার হওয়ায়। একদিন হয়তো শ্বেত ভাল্লুকের চেয়ারেও সে বসত। অন্যদের থেকে তার মনের জোর বেশি এটাই সে ভাবত। একদমই ভুল ভাবনা।
উমা যে অনেকক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে আছে সুনীত তা বুঝতে পারেনি, নিজের ভাবনায় ডুবে থাকার জন্য। হঠাৎ চোখ পড়তেই সে অস্বস্তিতে উঠে দাঁড়াল। শূন্য, নিস্পৃহ চোখে তার স্ত্রী যেন একটা আসবাবের দিকে তাকিয়ে।
”তুমি খাটে এসে শুতে পারো।”
সুনীত বেরিয়ে এল। শোবার ঘরের দরজা ভিতর থেকে খিল দেওয়া। উমা বিছানার ধার ঘেঁষে দেয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে। ঘরের একটি জানলা খোলা। পর্দার উপরের ফাঁক দিয়ে রোদ এসে পড়েছে বিছানায় উমার পিঠ থেকে একহাত দূরে। সুনীত শীতের আমেজ শরীরে পাচ্ছে। ডান তালু বাম বাহুতে বুলোতেই কাঁটা উঠল চামড়ায়। বই আকারের ছোট্ট রোদটুকু উপভোগের জন্য সে প্রলুব্ধ হচ্ছে কিন্তু উমার এত কাছে, পিঠ ঘেঁষে শুতে কুণ্ঠা হল। সন্তর্পণে সে উমার থেকে যথাসম্ভব দূরত্ব রেখে শুল।
উমার চাহনিটাই তার কুণ্ঠার কারণ। সুনীত ড্রেসিং-টেবিল, বইয়ের র্যাক, আলনা, আলমারির উপর দিয়ে চোখ বোলাল। এ ঘরে যা কিছু কাঠের আসবাব তারই পছন্দে কেনা। এই খাটটাও। প্রায় আট বছর বয়স হল এটার। উমা চেয়েছিল রবার-ফোম বিছানার খাট। তীব্র আপত্তি এবং শিরদাঁড়ার নানাবিধ ব্যাধির ভয় দেখিয়ে সুনীত তুলোর গদির খাট কেনে।
প্রত্যেকটা আসবাবই তার জীবনের পটভূমির এক একটা অংশ। একদিন আর তা থাকবে না। উমা একার রোজগারে সংসার চালাতে হয়তো পারবে না। এগুলো একে একে বিক্রি করে দেবে। এই খাট, আলমারি, র্যাক অন্য কারুর ঘরে গিয়ে সেখানকার জগতের সঙ্গে মিশে যাবে। এগুলো সাক্ষীও বটে কিন্তু সুনীত যে ভিতরে ভিতরে বদলে গেছে, সেই বদলের সাক্ষী এরা নয়। দীর্ঘকাল ধরে গৃহসজ্জার অংশ হিসাবে ওরা অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে তাই বদল সম্পর্কে এদের কোনো সাড়া আর নেই। অনেকটা উমারই মতো।
