পাল্লা ফাঁকা করে সুনীত দেখল উমা দরজাটা মাত্র ভেজিয়ে রেখেছে। বিছানার উপর ঝাঁপিয়ে সে বেডকভার ও একটি বালিশ টেনে নিয়ে ভিতরের ঘরে এল। কাঁপছে তার হাঁটু এবং হাত, তারপর সে হাসল। কিন্তু কেন যে হাসল, তা সে জানে না।
আধো-ঘুম আধো-জাগরণের মধ্যে সুনীত অনেকক্ষণ ভাসতে ভাসতে, গত পাঁচ দিনের নানান টুকরো সংলাপের এবং বিভিন্ন দৃশ্যের তরঙ্গে দুলতে শুরু করেছে। কিছু মুখ সে স্পষ্ট দেখতে পেল, যেমন বুড়ি ভিখারির, ট্যাক্সি ড্রাইভারের সহকারীর, পুলুর এবং মুখে পাইওরিয়ার গন্ধওলা লোকটির।
”…বুঝলেন সুনীতবাবু লেকের উত্তর-পশ্চিম কোণে গাছটা আছে। একবার গিয়ে দেখে আসতে হবে। মুশকিল কী জানেন, চিনতেই পারব না। কল্পতরু…বাওবাব নাকি বিশাল, কিন্তু শুনেছি এটা নাকি খুবই শিশু, আইডেন্টিফাই করতেই হয়তো পারব না।”
”যদি করতে পারেন তাহলে কল্পতরুর কাছে কী চাইবেন?”
”কী আর চাইব, টাকাপয়সা সুখশান্তি এই সবই তো দরকার…তবে বুঝলেন, লিভিংস্টোন প্রথম দর্শনেই থ হয়ে গেছল, বলেছিল বিশ্বের অষ্টম বিস্ময়। আসলে আমি চাইব অবাক হয়ে যেতে… বিরাট কিছু জীবনে তো আর দেখলুম না।”
সুনীত ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম ভাঙল দরজায় খুটখট আওয়াজে।
”কে কে?”
সুনীত ধড়মড় করে উঠে বসল।
দরজাটা খুলে গেল। উমা প্লেট হাতে দাঁড়িয়ে।
”খেয়ে নাও, সুবলকে পাঠিয়েছি দুটো কোসাভিল কিনতে। এক্ষুনি এসে পড়বে।”
উমা মেঝের উপর ভাতের প্লেট রেখে চলে যাচ্ছে, সুনীত সন্ত্রস্ত হয়ে বলল : ”জল, আমার ভীষণ জলতেষ্টা পাচ্ছে।”
”দিচ্ছি।”
”একটা বালতিতে দাও, পরেও তো তেষ্টা পাবে।”
ভাতের মধ্যে গর্ত করে ডাল। আর একটি গর্তে ডিমের ঝোল। ডিমটি আধখানা। একটা ছোট্ট কাচের বাটিতে টোম্যাটোর চাটনি। সুনীত তাকিয়ে দেখতে দেখতে অসম্ভব খিদে বোধ করল। ডাল এবং ঝোল একসঙ্গে চটকে, গোগ্রাসে খেতে শুরু করল।
একটা ছোটো প্লাস্টিকের বালতিতে জল আনল উমা, একটি কাচের গ্লাসও।
”আর নেই, ভাত?”
”দুজনের মতো মাপ করে সুবল চাল নিয়েছে, আমার ভাগ থেকে তোমাকে দিয়েছি। সেজন্যই তো সুবলকে ছুতো করে বাইরে পাঠালাম।”
”ওকে ছাড়িয়ে দাও।”
”সেকী!”
”ও থাকলে অসুবিধে হবে, বরং একবেলার জন্য একটা ঠিকে ঝি রাখো, কাজ তো সামান্যই।”
”তা হয় না। বুড়ো মানুষ হঠাৎ ছাড়িয়ে দিলে যাবে কোথায়, খাবে কী?”
”কিন্তু আমার যে অসুবিধাটা হচ্ছে সেটা কি দেখবে না!”
দুজনে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইল। ধীরে ধীরে সুনীত বুঝতে পারল, সুবল থাকবে। ওকে উমার দরকার। হয়তো তার থেকেও বেশি দরকার।
ভাতের শূন্য প্লেটের দিকে তাকিয়ে সুনীতের মনে হল, গৃহপালিত জীবকে যেভাবে খেতে দেওয়া হয় অনেকটা সেইরকমই এখন দেখাচ্ছে পরিবেশটাকে। তার পেটে এখনও প্রচুর খিদে কিন্তু সে-কথা বলতে পারল না।
”এখানে ফিরে না এলেই পারতে।”
উমার কণ্ঠে এবং চাহনিতে বিষণ্ণতা, দুঃখ। সুনীত ভেবে পাচ্ছে না কী জবাব দেবে। ও কি চায় সে চিরতরে আড়ালেই থাকুক, তার প্রয়োজন কি উমার কাছে ফুরিয়ে গেছে?
”সুবলকে ছাড়ানোটা খুবই অন্যায় হবে। তা ছাড়া এভাবে ক’দিন তুমি লুকিয়ে কাটাবে! মানুষ কি এভাবে থাকতে পারে? নিজেও তো বুঝতে পারছ এটা অসম্ভব ব্যাপার।”
”ভেবে পাচ্ছি না আমি কী করব। দূরে কোথাও চলে যেতে হবে কিন্তু কোথায় থাকব, কী খাব! চাকরি পাব না, কিছু টাকা পেলে বরং ব্যবসা করা যায়।”
সুনীত মাথা নামিয়ে রইল। উমা নীরবে প্লেটটা তুলে নিয়ে গেল। দরজাটা আর বন্ধ করল না সুনীত।
কলিংবেল বাজছে। দরজা ভেজানোর জন্য সে ব্যস্ততা বোধ করল না। সে জানে উমা শোবার ঘরে সুবলকে এখন আসতে দেবে না।
”একেবারে তিনটে ট্যাবলেট আনলুম, বারবার অত দূরে কে আর যায়।”
”ভালোই করেছ…আর শোনো কাল আমি মাকে দেখতে জামসেদপুর যাব।”
সুনীত কান চেপে ধরল দেওয়ালে। ওরা এখন রান্নাঘরে। কী বলছে ওরা বোঝা যাচ্ছে না। উমা কী ব্যবস্থা করে যাবে? বুড়ো মানুষটা বাইরে বেশি যায় না। সারাদিন তাহলে তো তাকে এই ছোটো জায়গাটাতে কাটাতে হবে, শোবার ঘরেও তখন রাত্রে ছাড়া যাওয়া যাবে না। উমাকে বলতে হবে শোবার ঘরের দরজায় যেন তালা দিয়ে না যায়। কলঘরে যাওয়া তাহলে বন্ধ হয়ে যাবে।
একমাত্র সুবল ঘুমিয়ে পড়ার পর, গভীর রাতে ছাড়া সে বেরোতে পারবে না। উমার দরকার কী মাকে দেখতে যাওয়ার? ন’বছর কোনো সম্পর্ক নেই, সেজন্য কোনোদিনই হা-হুতাশ করতে দেখিনি অথচ এখন ওকে যেতেই হবে! কেন? স্মৃতিগুলোকে ঝালিয়ে নেবার জন্য? সেইজন্যই কি সে-ও কৃষ্ণনগরে গেছল! নিজের সম্পর্কে একটা চাপা রাগ সুনীতের পা থেকে মাথায় উঠে এল। এভাবে চলা যায় না, এভাবে বাঁচা সম্ভব নয়। কোনোকিছুই আর আগের মতো অর্থ নিয়ে তার মগজে ধাক্কা দিচ্ছে না। তার অবাক লাগছে ভাবতে, এই ছ-সাতটা দিন সে এভাবে কাটাতে পারল কী করে! সবথেকে ভয়ংকর ব্যাপার। এই সন্দেহটা তার মনে জন্মাতে শুরু করেছে যে সবাই যেন ঠিকঠাক রয়েছে, এমনকী তার বাবাও। এটা তার নিজেরই দোষ।
প্রভূত পরিশ্রম করে সে সচ্ছল অবস্থায় এসেছে এবং এটাই তো তার নিজের উপর আস্থা বাড়াতে পারত কিন্তু তা হয়নি। চাকরি এবং বৈষয়িক উন্নতির দিকে যদি না যেত তাহলে হয়তো কবিতা লেখার কথাই ভাবত, দু’চারটে ভালো কবিতা লিখেও ফেলত।
