”বড়দার একটা চিঠি মঙ্গলবার অফিসে পেয়েছি কিন্তু এর মধ্যেই যে অবস্থা এতটা খারাপ হবে… আমি নিশ্চয় যাব, তবে আজকেই পারব কি না… তুমি কি একটু বসবে না?”
”না না, আমি এখুনি যাব।”
”তোমার নামটা কী বললে?”
”অংশুমান।”
”খুব ছোট্ট দেখেছি তোমায়। বছর বারো আগে একবার জামসেদপুর গেছলাম, তখন তোমার বয়স বোধহয় ন-দশ বছর ছিল। তোমার পরে তো এক বোন ছিল, বিয়ে হয়ে গেছে?”
”না।”
”তুমি কী করছ?”
”যাদবপুরে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছি। পিসিমা আমি এবার আসি।”
”হ্যাঁ এসো… কেউ তো আর আমার সঙ্গে সম্পর্ক রাখেনি। বড়দারই সবথেকে বেশি আপত্তি ছিল আমার বিয়েতে। বাবা বললেন, জীবনে আর আমার মুখদর্শন করবেন না, সত্যিই করেননি। ওঁর মৃত্যুর খবরটা পর্যন্ত কেউ দিল না তাই শেষ দেখাও হয়নি। দু’হপ্তার পর ছোটোবউদির চিঠিতে জানতে পেরেছিলাম। কী যে কষ্ট হয়েছিল। মাকে জামসেদপুর নিয়ে গেল বড়দা তা-ও জেনেছি ছোটোবউদির চিঠিতে…হ্যাঁ এসো। আমি নিশ্চয় যাব।”
দরজা বন্ধ হবার শব্দর পর সুনীত বেরিয়ে এল।
”কী ব্যাপার, তোমার মা-র কিছু হয়েছে নাকি?”
”বড়দার ছেলে খবর এনেছে মা-র এখন-তখন অবস্থা। আমাকে দেখতে চেয়েছে।”
”তুমি জামসেদপুর যাবে নাকি?”
”হ্যাঁ।”
”কী হবে গিয়ে।”
”মাকে শেষবারের মতো একবার দেখব না!”
”দেখে কী লাভ। এত বছর তো দ্যাখোনি, কোনো অসুবিধা হয়েছে কি? ওদেরও কোনো অসুবিধা হয়নি তোমায় না দেখে। যেমন দিন কাটছে তেমনই কাটুক না, কী দরকার যাবার।”
উমার চোখে বিরক্তি এবং ক্ষোভ লক্ষ করে সুনীত সাবধান হয়ে গেল।
”তুমি চলে গেলে আমি কিন্তু মুশকিলে পড়ব।”
”সেজন্য কি আমি মাকে দেখতে যাওয়া বন্ধ করব? তোমার কী হবে না হবে তাই বিবেচনা করে কি এখন আমায় চলতে হবে!”
”ব্যাপারটা তুমি…।”
”পুলিশ এসে জিজ্ঞাসা করেছিল কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক আছে কি না। কিন্তু আমি জানি রাজনীতি তুমি জীবনে করোনি, করতে পারবেও না। তাহলে এ-কাজ কেন করলে…কেন কেন? আমি এই ক’দিন ঘুমোতে পারিনি, খেতে পারিনি, শুধু ভেবেছি তোমার পক্ষে সম্ভব হল কী করে একটা মানুষ খুন করা।”
”আস্তে উমা, আস্তে।”
সুনীতের এখন একটাই ভয়। বোধবুদ্ধির সীমা ছাড়িয়ে উমা তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। ওর চাহনি থেকে জানোয়ারের নখ বেরিয়ে আসছে।
”পরশু রাতে বোমা পড়েছে, পুলিশের সঙ্গে পাইপগান নিয়ে লড়াই হয়েছে মাঠে, সামনের রাস্তায়। পুলিশের তাড়া খেয়ে পাশের বাড়ির পাঁচিল টপকে ওরা পালায়। সেই রাতে আমাদের ফ্ল্যাটে পুলিশ এসেছিল।”
”কেন?”
”তোমার খোঁজে। ওদের ধারণা তুমিও দলে আছো।”
শুনতে শুনতে সুনীতের মনে হল একটা সুযোগ তার সামনে এসে গেছে, এটা হাতছাড়া করা উচিত হবে না। গোলাপবাগান রোডের এক বাড়ির দেয়ালে একসময় লেখা দেখেছিল, ”খতম মানে খুন নয়, শ্রেণিঘৃণার চরম প্রকাশ মাত্র।” হাবা খুন হয়নি খতম হয়েছে, এইভাবে উমার কাছে ব্যাপারটা তুলে ধরলে সেই রাতের ঘটনার চরিত্রটাই আমূল বদলে যাবে।
”তোমার এ ধারণা কী করে হল যে আমি রাজনীতিতে যেতে পারি না, মানুষ খতম করতে পারি না?”
”পারার মতো বয়স তোমার নেই, পারার মতো মনের জোর তোমার নেই, জীবন সম্পর্কে কৌতূহল তোমার নেই, তুমি এক ধরনের ভীরু, তোমার অতৃপ্তি আমাকে নিয়ে…আমি জানি, আমি জানি রুবি কাঞ্জি সম্পর্কে অনেক কথাই জানি…তুমি খতমের রাজনীতিতে ঢুকবে, মরে গেলেও তা বিশ্বাস করব না। মানুষের মধ্যে মিশে যাওয়ার ক্ষমতা তোমার নেই, নিজেকে ছাড়া তুমি আর কিছু ভাবতে পারো না।”
সুনীতের মাথার মধ্যে একটা রাগ এবার দপদপ করে উঠল। রুবি সম্পর্কে অনেক কথা কে বলল উমাকে? চিন্ময় ঘোষ হয়তো। নিশ্চয় কারও কাছ থেকে তার নিরুদ্দেশের খবর শুনে এখানে এসেছিল সহানুভূতি বা সাহায্য দেবার ছলে। হয়তো তখন কুটকুট করে লাগিয়েছে।…ব্যাটা ছুঁচো। এখন প্রসঙ্গটা এড়িয়ে যাওয়া দরকার।
”জামা-প্যান্ট বার করে দাও, এগুলো বদলাতে হবে, গন্ধ ছাড়ছে।”
উমা নিজেকে সামলে নিয়েছে, কথার জের টেনে কথা বাড়াল না।
আলমারি খুলে বলল, ”যা যা দরকার বার করে নাও।”
একটি প্যান্ট এবং নীল টেরিলিন গেঞ্জি টেনে নিয়ে সুনীত ইতস্তত করল হাতকাটা সোয়েটারটাও বার করবে কি না। স্নান করে শীত-শীত লাগছে।
”তুমি কি মাকে দেখতে যাচ্ছ?…না না অন্য কিছু নয়। এইভাবে একা আমি থাকব, বুঝতেই পারছ কী ধরনের অসুবিধে হবে।”
”আমি কী করতে পারি বলো। তুমি যে এভাবে আসবে, আমার ধারণারই বাইরে। কিন্তু মাকে তো দেখতে যেতেই হবে, বোধহয় আর বাঁচবে না, প্রায় পঁচাত্তর হল।”
”আজই তো যাচ্ছ না।”
”হাতে টাকা নেই, নইলে যেতাম। কাল মাইনের দিন, অফিসে গিয়ে টাকাটা নিয়ে ওখান থেকে স্টেশন চলে যাব।”
সুনীতের মনে পড়ল তার মাইনের তারিখ দিন পাঁচেক পর। কিন্তু সে আনতে যেতে পারবে না।
”কিছু খাবারের ব্যবস্থা করে যেতে পারবে? বিস্কুট বা চিঁড়েমুড়কি বা ওই ধরনের কিছু আর-”
কলিংবেলের শব্দ হল। সুনীত কথাটা অর্ধসমাপ্ত রেখে পিছিয়ে গেল।
দরজার পাল্লা বন্ধ করে সে প্যান্ট-শার্ট বদলাল। এখন তার ঘুম পাচ্ছে। মেঝেটা পরিষ্কার করা হল না। বেড কভার আর একটা বালিশ যদি আনার কথাটা তার মনে থাকত। চটপট এখনও আনা যায়। শোবার ঘরে সুবল দু-তিনবারের বেশি সারাদিনে আসে না।
