”প্লিজ চুপ করো, তোমাকে পরে বলছি সব। আগে এদিকের ব্যাপারগুলো বুঝে নাও…”
”বউদি দরজা খোলো, কী অ্যাতক্ষণ ধরে ঘুমোচ্ছ…চা জুড়িয়ে যাচ্ছে আর…রোববার বলে কি…।”
সুবলের বিরক্ত স্বর রান্নাঘরের দিকে চলে যেতেই উমা খাট থেকে নেমে কাপড়ে চোখ মুছল।
”বেরিয়েই দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ো। সুবল কি এ ঘরে আসবে?…যাতে না আসে সেই ব্যবস্থা করো। ওকে বাজারে পাঠাও, আমি পায়খানায় যাব আর চা করে দিয়ো তখন। খিদে পাচ্ছে…কলঘরে তোয়ালে সাবান, ব্রাশ সব রেখে এসো…”
বলতে বলতে সুনীত ভিতরের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। যদি সুবল হঠাৎ শোবার ঘরে আসে!
দেয়ালটা পাতলা, ওপাশে রান্নাঘর। সুনীত দেয়ালে কান লাগিয়ে বাসনের শব্দ এমনকী কথাবার্তার চাপা আওয়াজও শুনতে পাচ্ছে। কথাগুলো বোঝা যাচ্ছে না তবে দেয়ালের কাছে এসে যখন বলছে শুনতে পাচ্ছে।
”পাঁউরুটি দুটো।…এই পরশু বললে খরচ কমাতে হবে…ডিম আনব? দুটো…”
পাল্লার জোড়ে সাদা রেখা দেখা যাচ্ছে। দুটো কাঠের মধ্যে ফাঁক। আলো আসছে। সুনীত চোখ রাখল সেই ফাঁকে। বিছানার আধখানা, শোবার ঘরের দরজা, তার পাশে হাতখানেক দেওয়াল ছাড়া আর কিছু দেখা যাচ্ছে না। সে আবার রান্নাঘরের দেওয়ালে কান চেপে ধরল। মনে হল সুবল বাসন বাজছে। ট্রানজিস্টারটা খোলাই, পুরুষগলায় রবীন্দ্রসংগীত হচ্ছে। দূর থেকে মোটরবাইকের শব্দ এল, উপরের ঘরে কেউ স্কিপিং করছে। বাইরের জগতের সঙ্গে কান দিয়েই যোগাযোগ রাখতে হবে এটা সে বুঝতে পারছে।
এখন তার খিদে পাচ্ছে। কীভাবে উমা তাকে খাওয়াবে। সারাদিনই তো সুবল থাকবে, তার নজর এড়িয়ে কী করে দু’বেলা ভাত দেবে? উমা অফিসে বেরিয়ে যাবে সাড়ে ন’টার মধ্যে, তারপর সুবল একা। এখন থেকে অবশ্য দুজন…সুবল নিশ্চয় দুপুরে বাইরের দালানে ঘুমোবে। উমা ফিরবে সন্ধ্যায়, তখন এইভাবে এই ঘুপচি জায়গাটায় দুর্গন্ধের মধ্যে আরশুলাগুলোর সঙ্গে সময় কাটাতে হবে!
কিন্তু খাব কীভাবে? খাওয়া যে এতবড়ো ব্যাপার তা, হৃদয়ঙ্গম করার মতো অবস্থায় সে কখনও পড়েনি। ”খিদে কী জিনিস তা তুমি জানো না।” সুনীত হাসল। রুবির সঙ্গে কখনও দেখা হলে বলতে হবে, জেনেছি। এইবার সে বুঝতে পারছে তার টিকে থাকার জন্য বাতাস ও জলের মতোই খাদ্য দরকার এবং সেটা সংগ্রহ করতে বিরাট অসুবিধা তার সামনে, অন্য সময় এটাকে সে হাস্যকর অসুবিধা ভাবত কিন্তু এখন নয়।
অসুবিধাটা সুবল।
সুবল না থাকলে তার অসুবিধা নেই, তাহলে ওর না থাকাটাই বাঞ্ছনীয়। সুবলকে ছাড়িয়ে দেওয়া দরকার। তার বদলে একটা ঠিকে ঝি রাখা যেতে পারে। সকালে এসে, দোকান বাজার বাসনমাজা লন্ড্রি, রেশন আনা আর কী দরকার? রান্নাটা উমা নিজে করবে। অফিসে যাওয়ার সময় বাইরের দরজায় তালা দিয়ে যাবে।
খসখস শব্দ শোবার ঘরে। সুনীত পাল্লার জোড়ে চোখ রাখল। উমা তাকিয়ে রয়েছে তার দিকে অর্থাৎ বন্ধ দরজার দিকে। সুনীত পাল্লাটা ফাঁক করল সামান্য তারপর আরও। ইশারায় জানতে চাইলে সুবল বেরিয়ে গেছে কি না। উমা মাথা হেলাল।
সুনীত বেরিয়ে এল।
”কলঘরে সব দিয়ে এসেছি।”
কথা না বলে সুনীত শোবার ঘর থেকে দালানে বেরিয়েই যেন কারুর ধাক্কা খেয়েই পিছিয়ে এসে ঘরে ঢুকল, ”দালানের পর্দা ফেলে দাও। সামনের ওরা দেখতে পায়… বরং জানালাগুলোই ভেজিয়ে দাও।”
বারান্দার দরজায় এসে সুনীত থমকে গেল। বারান্দা দিয়ে হেঁটে গেলে কেউ দেখে ফেলবেই। ছেঁড়া, ঝুলে পড়া ত্রিপল তাকে আড়াল করতে পারবে না। অসহায়ভাবে সে উমার মুখের দিকে তাকাল।
হামাগুড়ি দিয়ে তাকে চার গজ জায়গাটা পার হতে হবে। ব্যাপারটা হঠাৎ তার মনে হল লজ্জাকর, নিজের ব্যক্তিত্বকে গুঁড়িয়ে ধুলো করে ফেলা, ভাগ্যের কাছে বশ্যতা স্বীকার করা এবং এসবই নিছকই এই শরীটাকে জিইয়ে রাখার জন্য।
সুনীত উবু হয়ে হাত দুটি মেঝেয় রাখল। পিঠটাকে নামিয়ে দিল, এবং এগিয়ে গেল বারান্দার দিকে। কলঘরের কাছাকাছি এসে উঠে দাঁড়াবার আগে সে একবার মুখ ফিরিয়ে পিছনে তাকাল।
উমা অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে তার দিকে। ওর চাহনি তার হৃৎপিণ্ডটাকে একবার কচলে নিয়ে ছেড়ে দিল। নতুন জাতের কোনো জানোয়ার উমা যেন দেখছে। এবার থেকে উমাই খাওয়াবে পরাবে। সুনীত কলঘরের দরজা বন্ধ করতে করতে ভাবল, বিশ্বস্ত কুকুর হতে হবে!
একইভাবে হামাগুড়ি দিয়ে সে ফিরে এল। কিছু আলুভাজা, ফুলকপি ভাজা আর রাতে জল দিয়ে রাখা মুঠো কয়েক ঠান্ডা ভাত খাওয়ার টেবিলে রেখে উমা বসে আছে।
”আর কিছু ঘরে নেই এ ছাড়া।”
কোনো কথা না বলে সুনীত মিনিট দুয়েকের মধ্যে সেগুলো শেষ করে ফেলল।
”এখন মাসের শেষ…।”
সুনীত ঘাড় নাড়ল।
”প্লেটগুলো তাড়াতাড়ি ধুয়ে রাখো, সুবলের চোখে পড়তে পারে।”
সুনীত শোবার ঘরে ঢুকল। জামা এবং প্যান্ট বদলাতেই হবে। স্টিল আলমারির হাতল ঘোরাতে গিয়ে বুঝল চাবি দেওয়া।
”উমা শোনো।”
বলার সঙ্গে সঙ্গেই কলিংবেল বেজে উঠল। সুবল? ভিতরের ঘরের মধ্যে এসে সুনীত পাল্লা দুটো আধভেজিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
উমা কার সঙ্গে যেন কথা বলছে। কথার শব্দ ক্রমশ এগিয়ে আসছে। আস্তে আস্তে দরজা বন্ধ করে দিল সুনীত। সুবল নয়, অপরিচিত পুরুষ কণ্ঠস্বর।
”পিসিমা আমি আর বসব না, এখুনি যাব সেজোকাকার বাড়ি সেই কসবায়। যদি আগেই যেতে চান তাহলে বিকেল পাঁচটা পঁয়ত্রিশের স্টিল এক্সপ্রেসে যেতে পারেন।”
