ওপরে যাবার জন্য পা বাড়িয়েও ফিরে এল রমা। জীবনটা মস্ত বড়। এত বড় যে ভাবাই যায় না। ভাবতে গেলে ক্লান্তি আসে। এই বাড়িটার মধ্যে জীবনটাকে ঠিক দেখা যায় না। দেখার চেষ্টা করলে ক্লান্তি আসে। এতখানি সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে হবে ভাবতেই রমার পায়ে ব্যথা শুরু হল।
পাড়ার ছেলেরা দলবেঁধে চিড়িয়াখানা দেখতে যাবে। সানু চিড়িয়াখানা দেখেনি। রাত্রে বিছানায় রমার কাছে চার আনা পয়সা চাইল সে চুপিচুপি। কোন উত্তর পেল না। অকাতরে রমা ঘুমোচ্ছে।
চার
বেলা করে বাড়ি ফিরল চিনু হাতে একটা ইলিশ মাছ ঝুলিয়ে। এতখানি ভারিক্কি চালে আর কোনদিন সে পা ফেলেনি আর এত ছেলেমানুষি সুরে অনেকদিন কথা বলে নি।
-চটপট কেটে ফেল। রমাটা কোথায়? নেই! যায় সে কোন চুলোয়, ব্যাটা তো বলল উলুবেড়ের।
রমা ঘরেই ছিল, চিনু দেখতে পায়নি। মাধবী আর রমা একসঙ্গে বেরিয়ে এল।
-ওমা, এযে মস্ত বড়! কত করে নিল?
মাধবী মাছটার দিকে ঝুঁকে পড়ল। রমা দড়িটা ধরে হাতে ঝোলাল।
-একসের হবে, না?
-তোর মাথা হবে। কি রকম চওড়া দেখেছিস। ওর ডিমের ওজন হবে আধসের। ব্যাটা বলল উলুবেড়ের। আরে বাবা, আমি কি মাছ চিনি না। বরফ দেওয়া চালানি মাছ, বলে কিনা-
চিনু রমার হাত থেকে মাছটা নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে শুরু করল।
-পাঁচপোর একটু বেশি। তিন টাকা করে নিল। খুব নরম হয়নি। ঠকিনি, কি বলো?
মাধবীও দেখছিল। চিনুর প্রশ্নে মুখ দিয়ে শুধু একটা শব্দ করল।
-কাটব?
আবার একটা শব্দ করল মাধবী। রমা আঁশ বটি বার করল।
-বঁটিটার অবস্থা দেখেছ, কেমন ভেঙে ভেঙে গেছে। এতে কি অত বড় মাছ কাটা যায়। বউদিরটা আনব?
-আন।
মাছটা হাতে নিয়েই রমা বেরোচ্ছিল! মাধবী মনে করিয়ে দিতে গেল। যমুনা খেয়ে উঠে দোক্তা পোড়াতে শুরু করেছে। সারা দুপুরটাই তার লাগবে দোক্তা তৈরি করতে। খুব ব্যস্ত হয়ে রমা হাজির হল।
-কি কাণ্ড দ্যাখোতো। এই দুপুরে দাদা এক দেড়সেরী ইলিশ এনে হাজির করেছে, উলুবেড়ের ইলিশ, টাটকা খুব। তাই বাবু এক কাঁড়ি দাম দিয়ে কিনে ফেলল। এখন আমার হয়েছে জ্বালা। কোথায় একটু ঘুমোব তা’ না-দাওতো তোমার বঁটিটা।
মাছটা আঙুলের ডগা দিয়ে টিপে পরীক্ষা করল মাধবী, মুখে বিশেষ ভাবান্তর ঘটল না।
-খুব নরম?
-নাঃ।
আশ্বস্ত হয়ে চিনু জামার বোতাম খুলতে শুরু করল।
-পেলি কোত্থেকে?
-কোত্থেকে আবার, বাজার থেকে।
-তা’ নয়, বলছি পয়সা পেলি কোত্থেকে?
জামাটা ততক্ষণে চিনু মাথার উপর টেনে এনেছে। বুক পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট, কিছু খুচরো পয়সা আর ছোট্ট চটি বইটা পড়ে গেল মেঝেয়। দেখামাত্রই মুখ ঘুরিয়ে নিল মাধবী। হতভম্বের মত মাধবীর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়েই সম্বিৎ ফিরল চিনুর। আগে সে বইটা তুলে নিল।
-সেই ঘরভাড়ার দালালিটা পেয়েছিস বুঝি?
মাধবীর অস্বাভাবিক দ্রুত কথার পিছনে চিনু তাড়াতাড়ি তার উত্তরটা জুড়ে দিল।
-তোমার দেখছি এখনো মনে আছে। কবে যে বলেছিলুম।
আলনায় জামাটা টাঙিয়ে রাখার সময় চিনু মাধবীর মুখের পাশটুকু শুধু দেখতে গেল। গালের উঁচু হাড় থেকে চিবুক পর্যন্ত খোবলান গালটা, দপদপ করছে।
-আজ ন’মাস বাদে তাগাদা দিয়ে দিয়ে মাত্র তিরিশটা টাকা আদায় হল। একবার কাজ হয়ে গেলে কি আর কেউ মনে রাখে। অথচ, তখন তো প্রায় পায়ে ধরতে বাকি রেখেছিল। একটা যাহোক কিছু ঘর দেখে দাও ভাই, একমাসের ভাড়া দালালি দোব।
চিনু অপ্রয়োজনে কথাগুলো বলে থামল। মাধবীর গাল এখনো দপ দপ করছে। আগের মতই সে মুখ ঘুরিয়ে কি যেন দেখছে। কি দেখছে? টেবিল, পাঁজি, জানলা, কালীর পট, বিয়ের ছবি, বালিখসা দেয়াল? ওগুলো তো এতবছর ধরে দেখে আসছে। ওতে নতুন কি আছে! তাহলে ভাবছে কিছু। কি ভাবছে? খুব একাগ্র হয়ে ভাববার সময় মানুষ অমন অন্যমনস্ক হয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। নিশ্চয় ভাববার মত কিছু ঘটেছে। কে ঘটাল? আমি? চিনু অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করল। মাধবীকে আর বেশি ভাবতে দেওয়া উচিত নয়।
-ভদ্দরলোকের ছেলে, তুমি তো জানই কানাইবাবুর কতগুলো কাচ্ছা বাচ্ছা, ভেবেছিলুম দালালিটা নেব না। ওটা খুব বিচ্ছিরি দেখায়। তারপর মনে পড়ল পুজো তো আর ক’মাস পরেই, সানুটার একজোড়া জুতো দরকার। ছোটলোকের মত খালি পায়ে ঘোরে। তোমারো একটা গরদের শাড়ী, সেই একবার মামীমা এসেছিল গরদ পরে, তখন তুমি বলেছিলে-
কথা বন্ধ করল চিনু। জামার পকেট থেকে টাকাগুলো বার করে মাধবীর হাতে দিল।
-সব দিয়ে দিলি নাকি!
চিনু বোকার মত হেসে গামছায় ঘাড় ঘষতে লাগল।
-ঘর খোঁজার জন্য খাটাখাটুনি করতে হয়েছে। অমনি তো আর টাকা নিসনি। এতে আর বিচ্ছিরির কি আছে। সংসার তো এবার তোর ঘাড়ে এসে পড়বে। উনি বুড়ো হয়েছেন। ওনার আর কদিন। বোনের বিয়ে, ভাইকে মানুষ করা, সবই তো তোকেই করতে হবে। তারপর তুই নিজে গুছিয়ে নে, সংসার তো তোকেও করতে হবে।
খুব আস্তে, থেমে থেমে বলল মাধবী। চিনু শুনল, ঘাড়ের ময়লা ঝেড়ে ফেলতে ফেলতে। চেঁচামেচি করে চিনুর মাথায় কিছু ঢোকান যাবে না। বরং বলা যায় চিনু ইচ্ছে করেই ঢোকাবে না। যে কথায় গুরুত্ব আছে, চিনু শুধু তাই শোনে। আর গুরুতর কথা কখনো চেঁচিয়ে বলা যায় না। গেলেও এখন আর চেঁচাবার ক্ষমতা তার নেই। অবশ্য চীৎকার করার মত কিছু ঘটে নি। তবু মনের মধ্যে খুব জোর একটা চীৎকার উঠেছিল ওই ছোট্ট চটি বইটা দেখে। তার রেশ এখনো বুকের মধ্যে থরথর করছে। মনটাকে আগে সামলাতে হবে। এমন চীৎকার দিনে অনেকবার ওঠে, কিন্তু এটার সঙ্গে অন্যগুলোর তফাত আছে। অন্যগুলো আগে থাকতেই জানা, এটা হঠাৎ।
