রুবির ছবিটা তার মনে পড়ছে। সুপরিণত একটি রেখা, এক টানে কাঁধ থেকে গোড়ালি পর্যন্ত আঁকা। তাকিয়ে থাকলে প্রগাঢ় ইচ্ছার বাষ্পে চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। চাপ চাপ বলিষ্ঠ মাংস রেখাটির তলায় ছড়িয়ে রাখা। রুবি আলাদা, এমন মৃদু কোমলতা ওর মধ্যে নেই। সুনীত নিচু হয়ে উমার দিকে হাত বাড়িয়ে কাঁধে আঙুল ছোঁয়াল। একটা ক্ষীণ কম্পন উমার শরীর দিয়ে বসে গেল, যেন এই স্পর্শ পথ কেটে ওর স্বপ্নের মধ্যে প্রবেশ করল।
কাঁধ থেকে আঙুলগুলো ধীরে ধীরে সে নিয়ে গেল ব্লাউজে। মমতা শব্দটি সুনীত বহুকাল শোনেনি, নিজেও ব্যবহার করেনি, এমনকী চিন্তায়ও। অথচ মমতাভরেই সে উমার উন্মুক্ত স্তনে হাত রাখল। নাতিউষ্ণ এবং ভারী বোধ করল সে মুঠোর মধ্যে। উমা ঈষৎ চমকে উঠল এবং মোমের আলোর ক্রমশ বিস্তারের মতো একটা চাপা স্নিগ্ধ হাসি ওর মুখে ছড়িয়ে পড়ল।
কেন যে এমন ইচ্ছা তার হল সুনীত তার কোনো ব্যাখ্যা বা অজুহাত খোঁজার চেষ্টা করল না। বিছানা থেকে উঠে সে জানলার ধারে দাঁড়াল। ফাঁকটুকু দিয়ে সে ফুটবল মাঠ, গোলাপবাগান রোড, কিছু পথিক এবং বাড়ি দেখতে পাচ্ছে। ধীর বাতাসের ছোঁয়া, রৌদ্রের এবং কোলাহলের প্রস্ফুটন অনুভব করছে। সে একটি জিনিস সম্পর্কে নিশ্চিত সারাজীবনে নিজেকে কখনও তার এত বিশুদ্ধ মনে হয়নি।
উমা আড়মোড়া ভাঙার সঙ্গে ‘উ উ উ উ’ শব্দ করতেই সুনীত ফিরে তাকাল। দু’হাত মুঠো করে মাথার উপর তুলে চোখ পিটপিট করছে।
”ক’টা বাজে,…সুবল কি এখনও চা দিয়ে…।”
সুনীত যেজন্য অপেক্ষা করছে এইবার তা ঘটতে যাচ্ছে। উমার চোখ বিস্ময়ে বড়ো হচ্ছে, মুখগহ্বর বড়ো হচ্ছে।
”না।”
সুনীত চাপা তীক্ষ্ন স্বরে চিৎকার করল, হাত তুলে। ভয়ে, উমা নিজের মুখ চেপে ধরল।
বাইরে দরজা খোলা এবং বন্ধ করার শব্দ হতেই সুনীত ছুটে গিয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে খিল দিল।
”জোরে কথা বলবে না।”
উমা ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে।
”যা কিছু বলার পরে বলব, এখন প্রশ্ন কোরো না। শোনো, আমি এখানে থাকব…তুমি ছাড়া কাকপক্ষীতেও যেন তা জানতে না পারে, সুবলও নয়। জানাজানি হলে আমি শেষ, সেই সঙ্গে তুমিও।”
”কেন?”
”আমাকে আশ্রয় দিয়ে লুকিয়ে রাখার জন্য!”
”কেন, কেন তুমি লুকোবে? তুমিই কি…।”
”হ্যাঁ, আমিই। অবাক হওয়ারই কথা, কিন্তু ওসব পরে হবে আপাতত যা বললাম মনে রেখো…কেউ টের যেন ঘুণাক্ষরেও না পায়। মনে থাকবে?”
সুনীতের উদ্বেগ উৎকণ্ঠার মধ্যে চাপা একটা হুমকি তার নিজের কানেই বাজল। এটা সে চায়নি কিন্তু বিনা প্রয়াসেই ওটা গলায় এসে গেছে। সে বুঝতে পারছে ভয় তার সঙ্গ ছাড়েনি। এতক্ষণ অনুসরণ করে এসেছে, এবার ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
উমা ঘাড় নাড়ল।
কী বুঝল ও? এবার তাকে কীভাবে গ্রহণ করবে, কীভাবে মানিয়ে নেবে এই পরিস্থিতি।
”বউদি উঠেছ? চা দোব?”
দরজায় তিন-চারটে টোকা পড়ল।
”হ্যাঁ…দাও, যাচ্ছি।”
উমার স্বর যান্ত্রিক। এখনও সে হতভম্ব ভাবটা কাটিয়ে ওঠেনি। সুনীত ট্রানজিস্টারের চাবি ঘোরাল। কোনো এক মহাপুরুষের বাণী পাঠ করা হচ্ছে। একটা শব্দের জটলা এখন দরকার যাতে তাদের কথোপকথন ডুবে যায়। সে আলনাটা টেনে ভিতরের ঘরের দরজাটা খুলতে গিয়ে ভাবল আগে জানলাগুলো খোলা দরকার।
পর্দাগুলো টেনে বিছিয়ে সে দুটো জানলা খুলল। আলোয় ভরে যাবার পর সে ভিতরের ঘরের দরজা খুলল। ভ্যাপসা গন্ধটা সইয়ে নিয়ে সে একটা ছোট্ট জানলা আছে এবং সেটিও মাঠের দিকে। জানলা খুলবে কি না, তাই সে দ্বিধায় পড়ল। বরাবরই এটা বন্ধ আছে হঠাৎ যদি কেউ খোলা দেখে তাহলে কী ভাববে? নিশ্চয় ওয়াচ রেখেছে ওরা। অস্বাভাবিক ব্যাপারটা নজরে পড়বেই।
এখন বন্ধই থাক, রাতে খুলবে। ঘরের মেঝেটায় অসম্ভব ধুলো, ভাঙাচোরা এবং আজেবাজে জিনিসগুলো একধারে সরিয়ে জায়গা করতে হবে। ভাঙা চেয়ারের উপর ছেঁড়া তোশকটা তুলতেই দুটো আরশুলা ব্যস্ত হয়ে বেরিয়ে এল। সুনীত হাত থেকে তোশকটা ফেলে দিল। আরশুলা সে সহ্য করতে পারে না। জায়গাটা পরিষ্কার করতে গেলে প্রায় সব জিনিসই বার করে রাস্তায় ফেলে দিতে হবে। কিন্তু কে বার করবে। সুবল? উমার পক্ষে এ কাজ সম্ভব নয়, ব্যাপারটা চোখে পড়ার মতো হবে। তাহলে কি এইসব জঞ্জাল, পোকামাকড় নিয়ে বাস করতে হবে?
সুনীত শোবার ঘরের দিকে তাকাল। উমা খাটে বসে রয়েছে দরজার দিকে মুখ করে। ওর পিছনে এসে কানের কাছে মুখ এনে চাপা গলায় সে বলল, ”আমি ওই ঘরটায় থাকব।”
সে ভেবেই রেখেছে কীভাবে দিন এবং রাত কাটাবে। অসহ্য লাগবে, কিন্তু দিনের পর দিন একটা ছোট্ট আবদ্ধ জায়গায় তো অধিকাংশ বউই কাটাচ্ছে, যেমন সামনের ফ্ল্যাটের কান্তির বউ। এটা অভ্যস্ত হওয়ার জিনিস। বাবা কী করে কাটিয়েছেন?
”রাতে এই খাটেই শোব, সকালে সুবল যখন বাজার যাবে তখন কলঘরে যাব…খাওয়ার ব্যাপারটা তোমাকে ম্যানেজ করতে হবে। কীভাবে করা যায় সেটা…”
উমা থরথর করে উঠে উপুড় হয়ে বালিশে মুখ চেপে ফোঁপাতে শুরু করল। সুনীত বিভ্রান্ত হয়ে কাঁধ ধরে চেষ্টা করল ওকে টেনে তোলার।
”করছ কী? সুবল যে শুনতে পাবে।”
থামল না উমা। গোঙানির মতো শব্দ করে যেতে লাগল। সুনীত ভেবে রেখেছিল, ভয় পাবে, রেগে উঠবে, ধিক্কার দেবে আর যদি কান্নাকাটি করেও তাহলে এভাবে নয়, নাটকীয়ভাবে করবে।
